আমাদের বরিশাল জেলা কিসের জন্য বিখ্যাত

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১১:৩৬ অপরাহ্ণ, মে ১২, ২০২২ | আপডেট: ৯:৪৮:অপরাহ্ণ, মে ১৫, ২০২২

বরিশাল নামকরণ সম্পর্কে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। এক কিংবদন্তি থেকে জানা যায় যে, পূর্বে এখানে খুব বড় বড় শাল গাছ জন্মাতো, আর এই বড় শাল গাছের কারণে (বড়+শাল) বরিশাল নামের উৎপত্তি। খাল বিল জলাভূমিতে ভরা বরিশালে যাতায়াতের অসুবিধাকে মাথায় রেখে চালু হয়েছে কথা আইতে শাল যাইতে শাল, তার নাম বরিশাল।

কেউ কেউ দাবি করেন, পর্তুগীজ বেরি ও শেলির প্রেমকাহিনীর জন্য বরিশাল নামকরণ করা হয়েছে। অন্য এক কিংবদন্তি থেকে জানা যায় যে, গিরদে বন্দরে (গ্রেট বন্দর) ঢাকার নবাবদের বড় বড় লবণের গোলা ও চৌকি ছিল। ইংরেজ ও পর্তুগীজ বণিকরা বড় বড় লবণের চৌকিকে ‘বরিসল্ট’ বলতো। অথাৎ বরি (বড়)+ সল্ট(লবণ)= বরিসল্ট। আবার অনেকের ধারণা এখানকার লবণের দানাগুলো বড় বড় ছিল বলে ‘বরিসল্ট’ বলা হতো । পরবর্তিতে বরিসল্ট শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে বরিশাল নামে পরিচিতি লাভ করে।

জেলার ভৌগলিক অবস্থান:

বরিশাল জেলা ২২০ ৪২ ‘০ “উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০০ ২২’ ০” পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। ভৌগোলিক সীমানা: বরিশাল জেলার উত্তরে চাঁদপুর, মাদারীপুর এবং শরীয়তপুর জেলা; দক্ষিণে ঝালকাঠি, বরগুনা এবং পটুয়াখালী জেলা; পূর্বে লক্ষ্মীপুর জেলা ও মেঘনা নদী এবং পশ্চিমে পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও গোপালগঞ্জ জেলা।

জেলার ঐতিহ্য:

নদ-নদী, খাল-বিল, অরণ্য ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ বরিশাল গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ অঞ্চলের অন্যতম জেলা। সতত গতি পরিবর্তনশীল এখানকার নদ-নদী ক্রমাগত ভাঙন ও ভূমিগঠনের কাজ করে চলেছে। তাই এই ভাঙা-গড়ার ভিতর এখানকার মানুষ নিয়ত সংগ্রামশীল। যুগ যুগ ধরে নানা দেশের নানা জাতির লোক এসে বসতি স্থাপন করে এ জেলার জনপদগুলিকে সমৃদ্ধ করেছে।

পীর ও মাওলানাদের প্রভাব: বরিশালের গ্রামাঞ্চলে পীর এবং মাওলানাদের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। সমগ্র জেলার অধিকাংশ গ্রামের লোকেরা কোনো না কোনো পীরের ভক্ত। কোনো মনোবাসনা পূর্ণ করার জন্য অনেকেই পীরের দরবারে মানত করে থাকে।

মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান:

এ জেলার মুসলমানরা সাধারণভাবে অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। তারা সকল প্রকার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে। পবিত্র রমজান মাসে অনেকেই একমাস রোজা রাখে। আবার অবস্থাপন্ন লোকদের মধ্যে অনেকেই পবিত্র হজও পালন করে।

গ্রামাঞ্চলের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, প্রায় প্রত্যেক গ্রামেই ছোট-বড় মসজিদ আছে। মসজিদগুলোয় প্রতি শুক্রবারে গ্রামের লোকজন একত্রে সমবেত হয়ে জুমার নামাজ আদায় করে।

বরিশাল বিভাগের দর্শনীয় স্থান:

বরিশাল বিভাগে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে। বরিশালের দর্শনীয় স্থান সমূহের মধ্যে অন্যতম হল-আদম আলী হাজীর গলি, এবাদুল্লাহ মসজিদ, লন্টা বাবুর দিঘী (লাকুটিয়া), গুটিয়া মসজিদ, বিবির পুকুর পাড়, শের-ই-বাংলা জাদুঘর, মাহিলারা মঠ, সংগ্রাম কেল্লা, শরিফলের দুর্গ, দুর্গাসাগর দিঘী, মুকুন্দ দাসের কালিবাড়ী, অশ্বনীকুমার টাউনহল, জমিদার বাড়ি (মাধবপাশা)

ভাষা ও সংস্কৃতি:

বরিশাল অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি এখানকার জনজীবনের হৃদয়বৃত্তিরই অকৃত্রিম অনুভব, যার অকুণ্ঠ প্রকাশ ঘটেছে লোকসাহিত্য, লোকসঙ্গীত, লোকশিল্প আর লোকাচারের বিভিন্ন অনুষঙ্গের মাধ্যমে।

লোকসাহিত্য:

বরিশাল জেলার লোকসাহিত্যের কতিপয় উপাদান সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হলো:

ক. পুঁথি: লোকসাহিত্যের অন্যতম শাখা হিসেবে পুঁথি-সাহিত্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানকার বিখ্যাত পুঁথিসমূহের মধ্যে গুনাই বিবি, রসুলের মেরাজ গমন, ইউসুফ-জোলেখা ইত্যাদি অন্যতম।

খ. প্রবাদ-প্রবচন: বরিশাল অঞ্চলের অধিবাসীদের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পরিহাসপ্রিয়তা। আর এই বৈশিষ্ট্যের কারণে অনেক সময়ে তারা অভিজ্ঞতাজাত জ্ঞানকে প্রবাদ-প্রবচনের মাধ্যমে ব্যঙ্গার্থে প্রকাশ করে থাকে। বরিশাল অঞ্চলে ব্যবহৃত এ ধরনের কতিপয় প্রবাদ-প্রবচনের হলো:

পোলা নষ্ট হাডে, ঝি নষ্ট ঘাডে

দরবারে ঠাঁই নাই, বাড়ি আইয়া মাগ কিলাই

গ. সিমিস্যা/শোলক: আবহমানকাল থেকে ধাঁ-ধাঁ বুদ্ধির খেলা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে আছে। বরিশালের গ্রামাঞ্চলের সর্বত্র এই ধাঁ-ধাঁকে সিমিস্যা বা শোলক বলা হয়। এখানে কয়েকটি শোলক উত্তরসহ উল্লেখ করা হলো:

আল্লার কি কুদরত, লাঠির মধ্যে শরবত (আখ)

এক হাত গাছটা, ফল ধরে পাঁচটা (হাত)

লোকশিল্প:

এখানকার লোকশিল্পের অন্যতম কয়েকটি ধারার পরিচয় দেওয়া হলো:

ক. হোগলা: বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলে হোগলার ব্যবহার অত্যন্ত জনপ্রিয়। পাটি বা চাদরের বিকল্প হিসেবে হোগলা নির্মিত আচ্ছাদনের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে এখানকার সর্বত্র।

খ. কাঁথা: গ্রামীণ মহিলাদের দ্বারা ব্যবহারিক প্রয়োজনে পুরোনো ও ব্যবহৃত শাড়ি বা ধুতিতে নানাবিধ সেলাইয়ের মাধ্যমে কাঁথার উদ্ভব। বরিশাল অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের কাঁথা তৈরি করা হয়ে থাকে।

গ. মৃৎশিল্প: বরিশালের সর্বত্র প্রাচীনকাল থেকেই মাটি নির্মিত বাসন, হাঁড়ি-পাতিল, কলসি, ছাইদানি, ধূপদানি ইত্যাদির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

ঘ. শাঁখা: ঐতিহ্যবাহী শাঁখাশিল্পের উৎপত্তি ঠিক কী ভাবে হয়েছিলো তা জানা না গেলেও এর ব্যবহার যে আদিকাল থেকে হয়ে আসছে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। হিন্দু সম্প্রদায়ের মেয়েরাই প্রধানত শাঁখা শিল্পের মূল পৃষ্ঠপোষ

বরিশালের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব:

বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর -মুক্তিযোদ্ধা (বীরশ্রেষ্ঠ);
অশ্বিনীকুমার দত্ত – সমাজসেবক;
জীবনানন্দ দাশ – কবি;
আবদুর রহমান বিশ্বাস – সাবেক রাষ্ট্রপতি ;
শওকত হোসেন হিরন – সাবেক মেয়র;
শের-ই বাংলা এ.কে.ফজলুল হক- রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব
সুফিয়া কামাল-কবি
কামিনী রায়-কবি
নির্মলকুমার রায়চৌধুরী, চিকিৎসক ও সমাজসেবী

Print Friendly, PDF & Email