বাংলাদেশের বীমা খাতের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১২:২৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩, ২০২২ | আপডেট: ১২:২৯:অপরাহ্ণ, মার্চ ৩, ২০২২

জাতীয় বীমা দিবস আজ । এবার জাতীয় বীমা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘এ বছরের প্রতিপাদ্য বীমায় সুরক্ষিত থাকলে, এগিয়ে যাব সবাই মিলে।’ ১৯৬০ সালের ১ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পাকিস্তানের আলফা ইন্স্যুরেন্সে যোগদান করেছিলেন । গত ১৫ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক আদেশে জাতির পিতার স্মৃতি বিজড়িত ১ মার্চ-কে ‘জাতীয় বীমা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে বর্তমানে দেশের পৌনে দুই কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের বীমার আওতায় রয়েছেন । অবশ্য বাংলাদেশে বেশিরভাগ মানুষ এখোনো বীমা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন না ।
বীমা হল নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে জীবন, সম্পদ বা মালামালের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি কোন প্রতিষ্ঠানকে স্থানান্তর করা।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৭৮টি বিমা কোম্পানি কাজ করছে, যার মধ্যে লাইফ কোম্পানি ৩২টি এবং নন-লাইফ কোম্পানি ৪৬টি । জীবন বীমায় একজন ব্যক্তি নিজের বা পরিবারের কোন সদস্যের জীবন বীমা করাতে পারেন। এতে বীমাকারী ব্যক্তির মৃত্যুর পর পরিবার অথবা নমিনি করা ব্যক্তিকে বীমাকৃত অর্থের পুরোটাই প্রদান করা হবে। আর সাধারণ বীমার মধ্যে স্বাস্থ্য, বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি, যানবাহনসহ যত ধরনের বীমা হয় তার সব কিছুই পড়ে। এই ৭৮টি কোম্পানির মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন জীবনবীমা করপোরেশন এবং সাধারণ বীমা করপোরেশন এবং বিদেশি কোম্পানির মেটলাইফ আলিকোর শাখা অফিসও রয়েছে । বিদেশের সঙ্গে যৌথ মালিকানা অর্থাৎ জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি হিসেবে সম্প্রতি ভারতের এলআইসি বাংলাদেশ লিমিটেড কার্যক্রম শুরু করেছে ।

 

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর যেটুকু অংশ বিমার আওতায় এসেছে, তাতে ২০১৯ সালের শেষে দেশের জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর সম্পদের পরিমাণ ৪১ হাজার কোটি এবং লাইফ ফান্ডের আকার ৩৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে । বাংলাদেশের বিমা খাত বৈশ্বিক বা অপরাপর তুলনীয় দেশের চেয়ে অনেক ছোট ।

বর্তমানে এ খাতে অনেক দক্ষ ও মেধাবী মানুষ আসছেন। একই সাথে প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে ফিনটেক, ইন্স্যুরেন্সটেক এবং এমএফএস (মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস) অনলাইন পেমেন্ট সেবা বীমা খাতকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করছে। সমস্যা হল, অনেকে বীমাকে ভিন্নভাবে দেখেন। জীবনবিমা খাতের ৩২টি কোম্পানির গত ১০ বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সালে জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা, যা সর্বশেষ ২০১৯ সালে এসে ৪১ হাজার ৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিগুলোর সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।

২০১০ সালে জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর লাইফ ফান্ডের আকার ছিল ১৪ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সাল শেষে ৩৪ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ১০ বছরে কোম্পানিগুলোর লাইফ ফান্ডের আকার ২ দশমিক ৩৩ গুণ বেড়েছে। ২০১০ সালে জীবনবিমা খাতে মোট প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায়। ১০ বছরের ব্যবধানে জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর মোট প্রিমিয়ামের পরিমাণ বেড়েছে ১ দশমিক ৬৫ গুণ। আর সর্বশেষ এ বছরের ৩০ জুন শেষে জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত সম্পদ ৪১ হাজার ৪৮৭ কোটি এবং লাইফ ফান্ডের আকার ৩৪ হাজার ১৪১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক প্রবাসী কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক বীমা সুবিধা চালু করা হয়েছে । বর্তমানে পৃথিবীর নানা দেশে বাংলাদেশের যে কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে নানা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন তারা অনেকেই কোন রকম বীমা সুবিধা পান না। তাদের জন্যই প্রবাসী কর্মী বীমা করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একটি চুক্তি হয়েছে বলে জানাচ্ছে জীবন বীমা কর্পোরেশন। সরকারের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী বিদেশে কাজ করতে যাওয়া যে কোনো শ্রমিককে বীমার আওতায় আনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিদেশ কাজ করতে যাওয়ার আগে একজন শ্রমিককে ওয়েজ আর্নার কল্যাণ বোর্ডের কাছ থেকে যে অনুমতিপত্র নিতে হয়, সেই অনুমতিপত্র নেয়ার সময় কর্মীকে বীমা করতে হবে। বীমা না করলে সে বিদেশ যেতে পারবে না। এছাড়া বিদেশগামী শ্রমিকরা যদি আরো বড় অঙ্কের বীমা করতে চান তাহলে তারও সুযোগ আছে বলে জানান জীবন বীমা কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান। এই বীমা থাকলে দুই বছরের মধ্যে যদি প্রবাসী শ্রমিক স্বাভাবিকভাবে বা দুর্ঘটনাজনিত কারণে মারা যান, সম্পূর্ণ পঙ্গুত্ব বরণ করেন বা দুর্ঘটনার শিকার হয়ে দুই চোখ অন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তিনি দুই লাখ টাকার সম্পূর্ণ প্রিমিয়াম পাবেন। আর বর্তমানে যেসব বাংলাদেশী শ্রমিক বিদেশে রয়েছেন, তারাও চাইলে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়ে বা জীবন বীমা কর্পোরেশনের সাথে যোগাযোগ করে নিজেদের বীমা করাতে পারবেন।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বীমা খাতের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৬০- এর দশকে দীর্ঘ সময় যখন রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল সে সময় দেশের আনাচে কানাচে গিয়ে পুরো জাতিকে সংঘবদ্ধ রেখে রাজনৈতিক সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার জন্যই জাতির পিতা বীমাখাতকে কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। জাতির পিতার দেখা স্বপ্ন সোনার বাংলা বিনির্মানে বীমাখাতের দায়িত্ব তাই অনেক বেশি।

বিমা শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে এবং জনগনের সেবা নিশ্চিতকল্পে এ বছর আরও কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ গঠনের পর হতে ১০ টি বিধিমালা, ১৭ টি প্রবিধানমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া ১৮ টি বিধি ও প্রবিধানমালার খসড়া নিয়ে কার্যক্রম চলছে, যা যথাশীঘ্র গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে বীমা খাতের বিভিন্ন দিকের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ আরও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে; বিগত বছরগুলোতে বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব আনয়ন এবং কর্পোরেট কমপ্লায়েন্স আনয়ন করার জন্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত নানান উদ্যোগের মধ্যে নন-লাইফ বীমা কোম্পানির কমিশন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, লাইফ বীমা কোম্পানির কমিশন লেয়ার ৬ টা থেকে ৫ টা করা, নন-লাইফ বীমা কোম্পানির ব্যাংক হিসাব নির্ধারণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য; স্ট্যাম্প শুল্ক ফাঁকিসহ সরকারি রাজস্ব ফাঁকি রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। লাইফ ইন্স্যুরেন্সে তামাদি পলিসির হার নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। সর্বোপরি সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য Corporate Governance Guideline প্রস্তুত করা হয়েছে। বীমা খাত ডিজিটাইজেশনের অংশ হিসেবে বীমা গ্রাহক ও বীমা কারীদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি, বীমা গ্রাহকদেরকে নিয়মিত প্রিমিয়াম বিষয়ে তথ্যাদি প্রদান, গ্রাহক তথ্যভান্ডার তৈরি করার জন্য স্টেট অব দি আর্থ প্রযুক্তি সম্পন্ন Unified Messeging Platformএর মাধ্যমে, Central Data Warehouse, SMS Notification System, e- Receipt, Agent Licensing online Module, “বীমা তথ্য” Mobile App, Business Intelligence Tools সার্ভিসসমূহ চালু করা হয়েছে। বীমা খাতে আরাে উন্নত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে e-KYC, Central Tariff Rating System, Surveyor Management System + Policy Tracking System সমূহ চালুর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

একই সাথে আইডিআরএ, বিআইএ, সাধারণ বীমা ও জীবন বীমা কর্পোরেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ডিজিটাইজেশনের জন্য ৬৩২ কোটি টাকার BISDP প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে; বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রশাসনিক পর্যায়ে এতদিন ভিন্ন ভিন্ন সাংগঠনিক কাঠামাে ছিল, এতে বীমা খাতে বিশৃঙ্খলা ও বিভিন্ন জটিলতা বিদ্যমান ছিল, উক্ত জটিলতা নিরসনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া জাতীয় বীমা নীতি ২০১৪ অনুযায়ী একইরূপ সাংগঠনিক কাঠামো গত ২৫ মার্চ ২০২১ তারিখে সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একচ্যুয়ারিয়াল প্রফেশনাল তৈরির জন্য একচ্যুয়ারি বিষয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি প্রদান করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নে বীমা এজেন্টদের ৭২ ঘণ্টা এবং বীমা জরিপকারীদের ৩ দিনের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া বীমা প্রতিষ্ঠানের যে সকল কর্মকর্তা বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসােসিয়েশন থেকে পােস্ট গ্রাজুয়েশন ডিপ্লোমাধারী তাদের অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট প্রদান এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদানসহ ACII কোর্সটিতে প্রতিবছরে বীমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কমপক্ষে একজনকে মনােনীত করে এই ডিগ্রি অর্জনের ব্যয়ভার বহনের জন্যও নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।

এছাড়াও মুজিববর্ষে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত উল্লেখযোগ্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিলো বঙ্গবন্ধু শিক্ষা বীমা, “বঙ্গবন্ধু ন্যাশনাল ইনসিওরেন্স ইন্সটিটিউট আইন ২০২২” প্রণয়ন করা হয়েছে; স্বল্প প্রিমিয়াম অর্থাৎ মাত্র ১০০ টাকারও কম প্রিমিয়াম প্রদান করে ১ বছরের জন্য ২,০০,০০০/- (দুই লক্ষ) টাকার চিকিৎসা সুবিধাসহ চালু করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু সুরক্ষা বীমা”; খেলােয়াড়দের সুরক্ষায় বঙ্গবন্ধু স্পােটসম্যানস কম্প্রিহেনসিভ ইস্যুরেন্স” এবং মুজিববর্ষে জাতির পিতার জন্মদিন বুধবারে বঙ্গবন্ধু আশার আলাে-বীমা দাবী পরিশোধের প্রয়াস” অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পিতা-মাতা হারানাে এতিম এবং বিধবাদের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বীমা দাবি পরিশােধের মাধ্যমে তাদের ব্যাংক আমানত বীমা আইন ২০০০ এর সংশোধনীসহ আমানত সুরক্ষা আইন নামে নতুন একটি আইন আসছে। এ আইনটির সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে এর দ্বারা মূলত ক্ষুদ্র আমানতকারীরা উপকৃত হবে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে গেলেও তারা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য ইন্সুরেন্স তহবিল থেকে তাদের সহায়তার জন্য আইনটি করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত বাংলাদেশে এখন ব্যাংক আমানত বীমা আইন হিসেবে যেটি আছে সেখানে শুধু ‘ব্যাংক’ অন্তর্ভুক্ত ছিলো কিন্তু এ নতুন আইনে ব্যাংকের পাশাপাশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনটিতে বলা হয়েছে, “কোন বীমাকৃত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর অবসায়নের আদেশ দেয়া হলে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ওই অবসায়িত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আমানতকারীকে তার বীমাকৃত আমানতের সমপরিমাণ টাকা, যা সর্বাধিক এক লাখ টাকা বা সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সময়ে সময়ে নির্ধারিত টাকার বেশি হবেনা, তহবিল হতে প্রদান করবে”।
বীমা করার আগেই একজন গ্রাহককে কয়েকটি বিষয় খেয়াল করতে হবে।

• বীমা করার আগে সংশ্লিষ্ট বীমার শর্তাদি দেখে, জেনে এবং বুঝে নিতে হবে।
• প্রিমিয়াম জমা দেয়ার নিয়মাবলী এবং সময়সীমা পার হয়ে গেলে কী করণীয় ভালো করে জেনে নিতে হবে।
• মেয়াদ পূর্তির পর ঠিক কত টাকা এবং কতদিনের মধ্যে সে প্রতিশ্রুত অর্থ পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিতভাবে জেনে নিতে হবে।
• মেয়াদ পূর্তির পর যথাসময়ে প্রতিশ্রুত অর্থ পাওয়া না গেলে গ্রাহকের কী আইনি সুরক্ষা থাকছে সেটা জেনে নিতে হবে।

বাংলাদেশে গত ৪৭ বছরের বেশি সময় ধরে বীমা চালু রয়েছে, তা সত্ত্বেও বীমা বিষয়টি নিয়েই সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি এবং পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব রয়েছে। একই সঙ্গে মেয়াদ পূর্তির পর কিংবা জীবন বীমার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যের মৃত্যুর পর বীমাকৃত অর্থ পেতে সমস্যার অভিযোগ শোনা যায়। “এক্ষেত্রে দুই পক্ষেই সমস্যা হয়, যেমন গ্রাহক হয়তো বীমা করার সময় শর্তসমূহ ঠিকমত খেয়াল করে না। হয়তো কোথাও কোন শর্ত যথাযথভাবে পূরণ হয়নি, কিন্তু সে ক্ষেত্রে গ্রাহককে কী করতে হবে সেটা তিনি জানেন না। আবার অন্যদিকে, গ্রাহককে ঠিকমত পুরো পরিস্থিতি অবহিত করে বীমা করানো কিংবা মেয়াদ শেষে যথাসময়ে প্রতিশ্রুত অর্থ বুঝিয়ে দেয়া–এসব বিষয়ে অনেক সময় কোম্পানির পক্ষ থেকে ঘাটতি দেখা যায়।” দেশে বীমা এজেন্টদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ঘাটতি এর পেছনে একটি কারণ বলে তিনি মনে করেন। “একই সঙ্গে কোন প্রতিষ্ঠান যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাহলে সেজন্য শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।”

 

আজকের বাংলাদেশ উন্নয়ন সূচকের মাপকাঠিতে প্রতিবেশী অনেক দেশ, বিশেষত ভারত ও পাকিস্তান থেকে অর্থনৈতিভাবে এগিয়ে আছে। বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের উন্নয়নের চিত্র ফুটে উঠেছে। এই উন্নয়নের ব্যাপ্তি শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্নি খাতে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে প্রায় সর্বত্র পরিলক্ষিত হলেও নানা কারনেই বীমা শিল্পটি এখনও অবহেলিত। এর মূলে রয়েছে এদেশের মানুষের অনভিজ্ঞতা এবং বীমা সম্পর্কে অসচেতনতা। ফলে উন্নত বিশ্বের তুলনায় এমনকি ভারত ও শ্রীলংকার তুলনায়ও বাংলাদেশের বীমা খাত অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

যদিও বীমা একটি আর্থিক খাত। ব্যাঙ্কগুলির মতো, বীমা পরিষেবাগুলির সমস্যাও জড়িত। অনলাইন লেনদেন পর্যন্ত, গ্রাহকের জন্য একটি বীমা পলিসি তৈরি করা এবং অর্থ প্রদান করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ এজেন্টকে গ্রাহকের কাছে গিয়ে পেমেন্ট সংগ্রহ করতে হতো। অনেক সময় গ্রাহকের অভিযোগ কোম্পানির কাছে পৌঁছায় না। বর্তমানে গ্রাহক অ্যাপ বা কার্ডের মাধ্যমে তার পেমেন্ট জমা দিতে পারেন। আপনি ঘরে বসে দেখতে পারেন কত প্রিমিয়াম এবং বোনাস জমা হয়েছে ইত্যাদি সব মিলিয়ে এক ধরনের স্বচ্ছতা তৈরি হয়েছে। এ কারণে বীমা খাত নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী। স্বাধীনতার পর একটি জীবন বীমা কর্পোরেশন এবং একটি সাধারণ বীমা কর্পোরেশন ছিল। এ ছাড়া কোনো বীমা কোম্পানি ছিল না। একই সময়ে সরকারি-বেসরকারি ১০-১৫ টি ব্যাংক ছিল। তাছাড়া ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অনেক দক্ষ লোক ছিল। বিপরীতে, বীমা খাতে যাদের অভিজ্ঞতা কম। ১৯৮৫ সালে বেসরকারীকরণ করা হলেও বীমা খাতের উন্নয়নের জন্য আমাদের কাছে জনবল ছিল না।

সে অর্থে বীমা খাতের উন্নতি হচ্ছে। যদিও আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ২০০০ সালে বেসরকারীকরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, পার্থক্য হল যে তারা বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে বিদেশী অংশীদার আনার অনুমতি দিয়েছে। ফলে তাদের প্রাইভেট কোম্পানির সঙ্গে পুরনো বিদেশি কোম্পানির অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তারা বিদেশি প্রযুক্তি ও পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে। যে কারণে আমরা তাদের সেক্টরের মতো এতটা অগ্রগতি করতে পারিনি। বিমা আইন-২০১০ এবং মূলধন ও শেয়ার ধারণ বিধিমালা-২০১৬ অনুসারে কোনো বিমা কোম্পানির পর্ষদে একই পরিবারের সদস্যরা একক কিংবা যৌথভাবে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারবেন না। অথচ এ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করছে এমনকি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিও। দেশের প্রধান জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে চার-পাঁচটি কোম্পানি রয়েছে প্রায় পুরোপুরি পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে। পারিবারিক আধিপাত্যের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো এক বা একাধিক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে পরিচালিত হচ্ছে। আবার কেউ কেউ বেনামে কোম্পানির শেয়ার ধারণ করে পারিবারিক আধিপত্য বজায় রাখছেন।

 

বীমা সম্পর্কে মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া একটি চ্যালেঞ্জ। যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের টাকা রাখে; একটি ব্যাংক, বীমা কোম্পানি বা লিজিং কোম্পানিতে? পরের বার যখন আমি এটি সম্পর্কে জানব, আমি দেখতে পাচ্ছি যে কীভাবে বীমা আমাদের জীবনকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে। এসব বিষয় যদি জনগণকে বোঝাতে পারি তাহলে এ খাতের উন্নতি হবে। উন্নত বিশ্বের নাগরিকরা গাড়ি থেকে শুরু করে বাড়ি পর্যন্ত প্রায় সবকিছুরই বীমা করে থাকে। তাদের অবসরের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা বলছি অবসর পরিকল্পনা প্রত্যেকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকে ব্যাংককে বীমা কোম্পানির সাথে একীভূত করে। ব্যাংকে রাখা টাকা ফেরত দেওয়া হয়। এদিকে, বীমা কোম্পানি গ্রাহকের আমানত ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি সুরক্ষা প্রদান করে। এক্ষেত্রে কিছু নিয়ম-কানুন আছে। যেমন, বীমা ন্যূনতম দুই বছর চালাতে হয়, অন্যথায় গ্রাহক কোন টাকা ফেরত পাবেন না, ইত্যাদি ব্যাংকের টাকা তোলা যাবে, বীমা করে না। মানুষ মনে করে টাকা জমা রেখেছি, ফেরত দিব না কেন! অনেকেই বীমার নিয়ম বোঝেন না। যেহেতু বীমা সম্পর্কে আমাদের ধারণা কম, তাই এ নিয়ে একটি সাধারণ দ্বিধা রয়েছে। বীমার নিয়ম-কানুন সঠিকভাবে মেনে চললে নিশ্চয়ই এ খাত মানুষের পারিবারিক সুরক্ষার জন্য চমৎকার সমাধান দিতে সক্ষম হবে।

তবে জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর সম্পদ, লাইফ ফান্ড ও মোট প্রিমিয়ামের পরিমাণ বাড়লেও কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের বিমা দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে গড়িমসি করে। এতে এ খাতের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। অভিজ্ঞ মহলের মতে, কোম্পানিগুলো বিমা দাবির অর্থ যাতে সময়মতো পরিশোধ করে, সে ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও কঠোর হতে হবে। চলতি বছরের জুন শেষে জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর মোট পলিসির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৫ লাখ ৬৯ হাজার ৫৮৪। এ সময়ে কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। ২০১৯ সাল শেষে মোট বিমা দাবির পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এর ৮৮ শতাংশ দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। আর এ বছরের জুন শেষে বিমা দাবির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা, যার ৪৮ দশমিক ৪২ শতাংশ নিষ্পত্তি করা হয়েছে। সঠিক সময়ে ও সঠিকভাবে বিমা দাবি পরিশোধের রেকর্ডও বেশির ভাগ কোম্পানির ভালো নয়।

 

প্রিমিয়াম সংগ্রহ করা আমাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রিমিয়াম সংগ্রহ, পুনর্বিমা, দাবি নিষ্পত্তিসহ কিছু বিষয়ে বড় দুর্নীতির অভিযোগ আছে। অনেক মালিকই মিথ্যা দাবি সাজিয়ে আগের তারিখে কাভার নোট ইস্যু এবং অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে বিমা গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করছেন। এ খাতে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য, পরিচালকদের দুর্নীতি ও নিয়ন্ত্রণহীনতার অনেক উদাহরণ রয়েছে। বিমাশিল্পে জনশক্তির মান খুবই দুর্বল এবং তাদের উন্নয়নে তেমন বিনিয়োগ কিংবা সংশ্লিষ্টদের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবনবিমা ও সাধারণ বিমা উভয় খাতের কোম্পানির পরিচালনায় ব্যাপক অনিয়ম পাওয়া গেছে। অথচ দেশের বিমা খাতের বিশেষ করে লাইফ কোম্পানিগুলোর প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবাসী শ্রমিক-রেমিট্যান্স প্রেরণকারী থেকে কৃষিজীবীসহ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী এখনো বিমার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। ২০১৯ সালে দেশের বিমা খাত নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রাইসওয়াটারহাউজকুপার্স (পিডব্লিউসি)। এ প্রতিবেদনে দেশের বিমা খাতের অবস্থা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০০৯-১৭ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছরই জিডিপির তুলনায় বিমা প্রিমিয়ামের পরিমাণ কমেছে। জিডিপির অনুপাতে প্রিমিয়ামের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানেরও নিচে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপির অনুপাতে প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল দশমিক ৫৫ শতাংশ। অথচ সমপর্যায়ের দেশের অবস্থা ও মাথাপিছু আয় বিবেচনায় এটি অতি সহজে ১ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া উচিত।

 

মানুষকে বীমা করানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদি ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে মানুষের কাছে বীমা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে গ্রাহকের সংখ্যা বাড়বে। যদি কর্পোরেট এজেন্টরা আমাদের দেশের নীতি নির্ধারকদের কাছে আসে, তাহলে ব্যাংক, লিজিং কোম্পানি, এনজিওগুলি বীমা বিক্রির একটি চ্যানেল হিসাবে কাজ করতে পারে। এতে শুধু ব্যাংকের সাথে বীমা চ্যানেলের মাধ্যমে বীমা রাজস্ব বাড়বে না, কমিশনের মাধ্যমেও তারা লাভবান হবে। এটি ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় পাওয়া যায়।
ড. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ
সহকারী অধ্যাপক ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email