মাদারীপুরে আবাসিক, পানের বরজর ও কৃষি জমিতে অবৈধভাবে গড়ে উঠছে ইটভাটা

”পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি হলেও নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা করছেনা কেউ”

প্রকাশিত: ৬:৩৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০১৮ | আপডেট: ৬:৩৫:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০১৮

সাব্বির হোসাইন আজিজ মাদারীপুর ॥ অপরিকল্পিত নগরায়ন বাড়ি-ঘর, রাস্তাা-ঘাট, মিল-কারখানা, অফিস-আদালত ও স্কুল-কলেজ নির্মাণের ফলে প্রতি বছর হ্রাস পাচ্ছে জেলার কৃষি জমি। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ভাঙ্গন ও স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণেও কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে ব্যাপকভাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, জেলার বিভিন্ন স্থানে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ইট তৈরির নামে প্রতি বছর হাজার হাজার একর জমির উপরের উর্বর মাটি পুড়ে বিনষ্ট করছে। প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে। শিবচর উপজেলার চান্দেরচর বাজারের পাশে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় শিশু শ্রম সহ পানেরবরজ, কৃষি জমি, ফল ও মেহগনী গাছের বাগান থাকার পরও প্রশাসনের চোখ ফাকি দিয়ে অবৈধভাবে ইট ভাটা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। বেশীর ভাগ লোক এলাকার প্রভাশালীদের ভয়ে কোন অভিযোগ দিচ্ছে না। অনেকেই প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। তবে প্রশাসন জানায় যদি অনুমতি ছাড়া কোন ইটভাটা নির্মান করা হয় তাহলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইটভাটাটি বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হবে।

ইটভাটা জেলার আবাদি জমির টপ সয়েল (উপরিভাগের মাটি) ব্যবহার করে আসছে। এতে ওই সব এলাকায় আবদি জমির উর্বরতাশক্তি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ অনুযায়ী কৃষি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বনভূমি, অভয়ারণ্য, জনবসতিপূর্ণ ও আবাসিক এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করলে প্রথম বারের জন্য দুই বছরের কারাদন্ড ও দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। অনুমোদন না নিয়ে ইট ভাটা স্থাপন করলে এক বছরের কারদন্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা। ইট ভাটায় কয়লার পরিবর্তে কাঠ ব্যবহার করলে তিন বছরের কারাদন্ড-এবং তিন লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় শাস্তি হতে পারে। করা নিষেধ থাকলেও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে সম্প্রতি শিবচর উপজেলায় আবাসিক এলাকায় চান্দেরচর বাজারের পাশে দুটি ইটভাটা নির্মিত হয়েছে। চান্দের চর এলাকায় হাজার হাজার লোকের বাস। পানের বরজ, কলা গাছের বাগান, মেহগনী গাছের বাগান থাকা সত্তেও ফসলি জমির ওপর ইট ভাটা চালু হওয়ায় এলাকার মানুষ চরম দুরর্ভোগ বাড়ছে। তাছাড়া এই ইটের ভাটায় একাধিক শিশুরা কাজ করছে। কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্য ক্ষতি না করে, আবাসিক এলাকা থেকে অনেক দুরে যেন ইট ভাটাগুলো করা হয় সে দিকে প্রশসানের ব্যবস্থাসহ কঠোর নজরদারি বাড়নো হয় এই দাবী সংশ্লিষ্টদের।

পানের বরজের মালিক আব্দুল লতিফ খলিফা জানান, গত বছর এই বরজ থেকে ৪২ শতাংশ জমিতে পান চাষ করে প্রায় ৩লক্ষ টাকা মুনাফা হয়েছে। কিন্ত এবার এই ইটভাটার কারনে একশ শতাংশ জমিতে পান চাষ করে মুনফাতো দুরের কথা মনে হয় লোকসানে সব হারাতে হবে। পানের বরজের পানের পাতাগুলো লাল হয়ে এমনিতেই পড়ে যাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, আমাদের কিছু করার নাই এই বাজারের বেশীর ভাগ দোকান তাদের। তারা যা করে তাই আইন। আমরা কিছু বললে আমাদের কোন না কোন ভাবে ক্ষতি হবে।

ইটভাটার কয়েকজন শিশু শ্রমিক জানায়, পেটের দায় এখানে মা, ভাইর সাথে কাজ করি। সকাল ৭টায় আসি আর কাজ শেষ না হওয়া পযন্ত থাকি। কোন দিন অনেক রাত পযন্ত থাকতে হয়। পড়াশুনা করতে মন চাইলে কি হবে। ছোট বেলায় আমার বাবা মারা গেছে।

বিএম এফ ইট ভাটার ম্যানেজার মাহমুব হাসান জানান আমাদের সকল প্রকার কাগজপত্র আছে। তবে আমার কাছে নেই, আছে আমার ইটভাটার মালিকের কাছে।

বিএমএফ ইটভাটার মালিক নুর মোম্মাহাম মুন্সীকে এব্যপারে ফোন দিলে সে ব্যস্থতা দেখিয়ে ফোন রেখে দেয়, এবং একই উপজেলার পাশের ইটভাটার মালিক সাংবাদিকদের সাথে কোন কথা না বলেই ইটভাটা ছেড়ে চলে যায়।

ফ্রেন্ডস এন্ড নেচার এর নির্বাহী পরিচালক, রাজন মাহমুদ বলেন শুধু উর্বর জমি বিনষ্ট নয়; ইটভাটা থেকে যে দূষিত গ্যাস ও তাপ নির্গত হয় তা আশে-পাশের জীবজন্তু, গাছ-পালা এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে এবং মানুষের স্বাস্থ্যহানির কারণ ঘটায়। ইট ভাটার জন্য অনেক সময় ফল গাছে কোনো ফলই ধরে না, বা ধরলেও তা অকালে ঝড়ে পড়ে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে এক সময় দেশে কৃষি জমির পরিমাণ হ্রাস পাবে । খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা ব্যাহত হবে। ইট ভাটায় কয়লার ব্যবহার বাধ্যতামূলক থাকলেও বেশি লাভের আশায় কয়লার পরিবর্তে অবৈধভাবে পুড়ানো হচ্ছে কাঠ। নিধন করা হচ্ছে বৃক্ষ। উজার করা হচ্ছে বনভূমি। এতে বিনষ্ট হচ্ছে আমাদের জীববৈচিত্র ও চিরচেনা প্রকৃতি ও পরিবেশ। তাছাড়া অনেক ইটভাটা কোন প্রকার ছাড়পত্র ছাড়াই ইটভাটা গড়ে তুলেছে। কতৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবী এই ইটভাটাগুলো দুরে কোথাও সরিরে নিয়ে পরিবেশ রক্ষা করার ভূমিকা নিবে এবং অবৈধ ইটভাটাগুলোকে বন্ধ করার ব্যবস্থা নিবে।

মাদারীপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুল গফুর, দায়সারা কথা বলেন, শিবচর উপজেলায় চান্দেরচর এলাকায় যে ইট ভাটা গড়ে উঠেছে এই খবর আমরা জানা ছিল না। এখন জানলাম যদি এরকম হয়ে থাকে তাহলে আমারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।

মাদারীপুর জেলা প্রশাসাক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, অনেকেই আমাদের অনুমতি ছাড়াই ইটভাটা নির্মান করে ফেলে। এরকম একটি ইটভাটা শিবচর উপজেলার চান্দেরচর এলাকা একটি ইটভাটা নির্মান করা হয়েছে। আমরা অভিযোগ পেয়েছি এই ইটভাটাটি আবাসিক এলাকাসহ পাশে পানের বরজ, ফলের বাগান, মেহগনী গাছের বাগান রয়েছে। যদি অনুমতি ছাড়া এই ইটভাটা নির্মান করা হয় তাহলে আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা বন্ধ করার ব্যবস্থা করবো।