লাগামহীন ছাত্রলীগকে থামাবে কে? এর শেষ কোথায়?

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৮:১৭ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০১৮ | আপডেট: ৮:১৭:পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০১৮
লাগামহীন ছাত্রলীগকে থামাবে কে? এর শেষ কোথায়?

শিমুল রহমান : লাগামহীন হয়ে পড়েছে ছাত্রলীগ। নেতাকর্মীদের মধ্যে বেপরোয়া আচরণ এবং ‘ডোন্ট কেয়ার’মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে। দলের গঠনতন্ত্র ফলো করছেন না দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ। নৈতিকতা মূল্যবোধসম্পন্ন নেতৃত্ব গঠন এবং গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহযোগীতায় এগিয়ে আসার পরিবর্তে ছাত্রলীগের বড় একটা অংশ সন্ত্রাসী, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ভর্তিবাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে সমালোচনায় ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এখন যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে এর শেষ কোথায়? আত্মঘাতী এই ধ্বংসের কবল থেকে ছাত্রলীগকে বাঁচাবে কে?

কে থামাবে বাংলাদেশের নেতাকর্মীদের খুনোখুনি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ধর্ষণ, শিক্ষক লাঞ্ছনা, প্রশ্ন ফাঁস ও অভ্যন্ত্মরীণ কোন্দলসহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়া বেপরোয়া অন্যতম বৃহৎ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে? কার ওপর দায়িত্ব পড়বে এ সংগঠনটি দেখভাল করার? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দলের ভেতরে বাইরে। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের ওপর ছাত্রলীগ ক্যাডারদের রড, লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলাসহ বিতর্কিত একাধিক ঘটনা এ ইসু্যটিকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ছাত্রলীগের অভিভাবক সংগঠন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরাও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন।

দলীয় সূত্র জানায়, এত দিন ধরে ‘বিশৃঙ্খল’ ছাত্রলীগকে দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল সংগঠনটির সাবেক সভাপতি ওবায়দুল কাদেরের ওপর। তবে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পর সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের ভালোমন্দ দেখাশোনার ভার কারও ওপর ন্যস্ত্ম হয়নি। আর এ ‘সুযোগে’ ছাত্রলীগের বেপরোয়া নেতাকর্মীরা একের পর এক ‘অঘটন’ ঘটিয়ে যাচ্ছে। খুনোখুনি, অস্ত্রের মহড়া, ছাত্রী নির্যাতনসহ নানা অভিযোগের তীর এখন ছাত্রলীগের দিকে।

তবে সংগঠনটির দাবি, ছাত্রলীগ বেপরোয়া নয়- বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতার জন্য এসব ঘটনা ঘটছে। সারাদেশে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। যাদের হাতে ‘অপকর্মগুলো’ ঘটছে তারা নামধারী ছাত্রলীগ। কোনো অন্যায় কাজের সঙ্গে সংগঠনের কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে তাকে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে।

সংগঠনের এ টালমাটাল অবস্থায় কয়েক দফায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগ নেতাদের ‘ঠিক’ হয়ে যেতে বলেছেন। তবে তার এ আহবানে তেমন কোনো কাজ হয়নি। বরং এ নির্দেশনার পর ছাত্রলীগের ক্যাডাররা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ছাত্রলীগ নেতাদের আয়েশি জীবন নিয়ে কথা বলা ও বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদককে নিয়েও বিভিন্ন কটূক্তিমূলক স্ট্যাটাস দেয় সংগঠনটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, বেপরোয়া ছাত্রলীগের লাগাম দ্রম্নত টেনে ধরা না গেলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে বড় খেসারত দিতে হবে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ঐতিহ্যবাহী ছাত্রলীগ একসময়ে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
বেপরোয়া ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা নিয়মিত সম্মেলন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের একক ক্ষমতায় ভারসাম্য এনে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও যে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে বিষয়টি এড়িয়ে না গিয়ে জড়িতদের দৃষ্টান্ত্মমূলক শাস্ত্মির আওতায় আনার পরামর্শ দেন। ছাত্রলীগকে আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের প্রভাবমুক্ত করা এবং শিক্ষক রাজনীতির প্রভাবে প্রভাবান্বিত হতে না দেয়ারও আহবান জানান তারা।

এছাড়া সংগঠনটিকে অতীত ঐতিহ্যে ফিরিয়ে নিতে ছাত্র নেতাদের অধ্যয়নমুখী করা, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বাইরে সংগঠনের অন্যান্য গুরম্নত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতাদের বিভিন্ন পরামর্শ গ্রহণ এবং সর্বোপরি আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে এ বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ছাত্রলীগ বেপরোয়া হতে থাকে। তাদের কর্মকা-ে বিরক্ত হয়ে ২০০৯ সালের ৩ এপ্রিল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এতে লাভ তো হয়নি, বরং এ সংগঠনের নেতাকর্মীরা আরও দুর্ধর্ষ হয়ে উঠেছে।
শুধু গত বছরে ছাত্রলীগের অভ্যন্ত্মরীণ কোন্দলে ১৫ জন নিহত হয়েছে। এর বাইরে ছাত্রলীগ কর্তৃক হতাহতের সংখ্যা সহস্রের কোঠা ছুঁয়েছে। অন্য এক হিসেবে দেখা গেছে, গত ৮ বছরে সংগঠনটির অভ্যন্ত্মরীণ কোন্দলে প্রায় ৮৫ জন নিহত হয়েছেন।

গত বছরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অসংখ্য সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রলীগ। ১৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে কক্ষ দখল করতে রাতভর তা-ব চালায় ছাত্রলীগ। এ সময় এক সাংবাদিককেও মারধর করে তারা। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক মনোনয়ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ২০টির মতো সংঘর্ষে জড়ায় ছাত্রলীগ। এসব ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পদহীন কর্মীদের তথাকথিত বহিষ্কারের মাধ্যমেই বিচার শেষ হয়।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা হল প্রশাসন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এদের শাস্ত্মি প্রদানের বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় ফৌজদারি মামলার যারা আসামি হয়েছেন তাদের সংগঠনের বিভিন্ন গুরম্নত্বপূর্ণ পদ দেয়ারও নজির রয়েছে।
গত বছরের ১৪ জুন টেন্ডার দখলকে কেন্দ্র করে রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) ছাত্রলীগের সভাপতি নাজমুল হক ও সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ দাসের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে দু’জনই রক্তাক্ত হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দু’পক্ষের মধ্যে গত বছরের শুরম্নর দিকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যার নেপথ্যে ৫১ কোটি টাকার টেন্ডার ছিল বলে ছাত্রলীগ সূত্র জানায়।

ছাত্রলীগের এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নিয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘স্বাধীনতাপূর্ব সময়ে ছাত্ররাজনীতি ছিল শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের জন্য। যে কোনো অন্যায়-অনিয়মের বিরম্নদ্ধে ছাত্র সংগঠনগুলো সোচ্চার ছিল। আর এখন ছাত্ররাজনীতি করে বিত্তবান হওয়ার জন্য। টাকা অর্জন করাই যার লক্ষ্য। অথচ আগে এগুলো ছাত্র নেতাদের মধ্যে কখনোই ছিল না। এখন তারা নিজেদের মধ্যেও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। এ দ্বন্দ্ব আদর্শের নয়, অর্থের।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এটা লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি, সত্যিকারের ছাত্র রাজনীতি নয়। এটা ছাত্রদের ব্যবহারের রাজনীতি। এটা দ-নীয় অপরাধ। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন থাকতে পারে না। অথচ সব রাজনৈতিক দলই এটা চালিয়ে যাচ্ছে, যা অবৈধ।’

সূত্র মতে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ছাত্রলীগ বেপরোয়া হতে থাকে। তাদের কর্মকা-ে বিরক্ত হয়ে ২০০৯ সালের ৩ এপ্রিল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপরও শোধরায়নি ছাত্রলীগ। বরং দিনকে দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে একের পর এক সংঘর্ষে জড়িয়েছে ছাত্রলীগ। এর বাইরে ধর্ষণ, অপহরণ, স্কুল-কলেজ পড়–য়া ছাত্রীদের তুলে নিয়ে বিয়েসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধেও জড়িয়েছে ছাত্রলীগ। কখনো কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরও চড়াও হয়েছে ছাত্রলীগ। গত ৯ বছরে ছাত্রলীগের এসব অপকর্মের দু’একটিতে মামলা হলেও অধিকাংশ ঘটনা ধামাচাপা পড়েছে। ফলে ছাত্রলীগ নিয়ে দেশজুড়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দলের নেতাকর্মী এবং সরকারও ছাত্রলীগের এসব কর্মকা-ে বিব্রত হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশালসহ বিভাগীয় শহরের মহানগর কমিটি, জেলা উপজেলা কমিটি, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ কমিটি, এমনকি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটিতেও অভ্যন্তরীণ বিরোধে জড়িয়েছে ছাত্রলীগ। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুনোখুনি থেকে শুরু করে ভাঙচুর, অস্ত্রের মহড়া দিয়ে বিভিন্ন সময়ে শিরোনাম হয়েছে ছাত্রলীগ। সংবাদ, যায়যায়দিন, নিউজবাংলাদেশ.কম, জনকণ্ঠ