আকবর আলি, মুক্তিযুদ্ধ ও তসলিমা নাসরিন

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০১৮ | আপডেট: ১২:১০:পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০১৮

সায়েদুল আরেফিন : কয়েক দিনের ব্যবধানে তিনটি সংবাদ দেখে অনেকদিন আগে শোনা একটা গল্প মনে পড়ে গেলো । একবার আমাদের স্বাধীনতা পূর্ববর্তী এই বাংলায় কিছু প্রত্যন্ত এলাকায় খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল। তখন সেই এলাকার গরীব লোকদের দুইবেলা ভাত তো দুরের কথা রুটিও জুটতো না। তখনকার দিনে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষেরা রুটি খেতেন, ভাতের অভাবে। ‘মাছে ভাতের বাঙ্গালী’ ভাতের অভাবে কিছু গরীব মানুষ খুব অসহায় হয়ে পড়েছিলেন তৎকালীন প্রাকৃতিক কৃষি নির্ভর এই বাংলায়। এই কথা যখন তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের জানানো হল তখন তাঁদের কেউ একজন বলে ফেললেন যে, রুটি খেতে পায় না তো কি হয়েছে, বাঙ্গালী ভাত খাবে। কথাটা অবশ্যই উর্দুতে বলেছিলেন সেই পাকিস্তানি নেতা।

কারণ পাকিস্তানে হয়তো রুটীর চেয়ে ভাত সহজলভ্য ছিল। যা হোক পাকিস্তানি ঐ নেতার জন্য আমার করুণা হয় এই ভেবে যে দেশ পরিচালনাকারী একজন হয়েও এই বাঙ্গালীদের বেলায় ভাত আর রুটির পার্থক্য তিনি বুঝতেন না। কারণ জনগনের সাথে তাঁদের কোন যোগাযোগ ছিল না। থাকবে কীভাবে ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৭১ দালের ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানে সেনা শাসকের সংখ্যা সল্পকালীন ও দীর্ঘকালীন মিলিয়ে ছিল ৭ জন। পাকিস্তানিরা বাংলার গ্রামেও যেতেন না কারণ তখন নদীমাতৃক এই বাংলার যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অনেকটাই নৌকা নির্ভর। তাই অধঃস্তনদের দেওয়া তথ্যের উপর তাঁদের নির্ভর করেই চলতে হতো, দেশ চালাতে কথা বলতে হতো তাঁদের।

খবর-১

‘বাংলাদেশ থেকে এই মুহূর্তে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থা তুলে দেয়া উচিত’ বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান। ২০ জানুয়ারি ২০১৮ সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘দ্য প্রেজেন্ট সিভিল সার্ভিস সিস্টেম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এই মন্তব্য করেন, যা দেশের প্রায় সব মাধ্যমেই খবর বেরিয়াছে।

ড. আকবর আলি খান বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা সিস্টেম চালু হয়েছিল, কারণ তাদের অবস্থা তখন খারাপ ছিল। কিন্তু এখন মুক্তিযোদ্ধার নামে যে কোটা দেয়া হয় তা নিতান্তই অমূলক।

খবর-২

রাজশাহীর শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক এমএ সাঈদ। দেশের জন্য জীবন দিলেও স্বাধীন দেশে ভালো নেই এই শহীদের পরিবারটি। তার সন্তানদের কেউ ফুটপাতে চা বিক্রি করেন, কেউ পরিবহন শ্রমিক, কেউ পত্রিকার হকার।

বাংলাদেশ ডাক বিভাগ তাদের চতুর্থ পর্যায়ের প্রকাশনায় শহীদ এমএ সাঈদসহ ১৬ জনের নামে দুই টাকা মূল্যের ‘শহীদ বুদ্ধিজীবি স্মারক ডাকটিকিট’ বের করে। রাজশাহীতে তিনি ছিলেন ‘দৈনিক আজাদ’ ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক লোকসেবক’ এর নিজস্ব সংবাদদাতা। পরবর্তীকালে তিনি ‘দৈনিক পাকিস্তান’, ‘ডেইলি অবজারভার’, ‘পয়গাম’, ‘জেহাদ’ প্রভৃতি পত্রিকার সঙ্গের সংযুক্ত ছিলেন। পত্রিকার খবরে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধকালিন সময়ে রাজশাহীর একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক ছিলেন এমএ সাঈদ। ওই সময় গ্রেটাররোডে শুধু মাত্র দৈনিক আজাদ পত্রিকার রাজশাহীতে একটি ব্যুরো অফিস ছিলো। ওই অফিসের ব্যুরো প্রধান ছিলেন এমএ সাঈদ। আর সংগ্রাম পত্রিকায় ছিলেন আলামিন নামের একজন সাংবাদিক। পাকিস্তানের পক্ষে দালালি করতেন। আলামিনের মাধ্যমেই পাকিস্তানীরা তথ্য নিয়ে সাংবাদিক এমএ সাঈদকে আটক করে হত্যা করেছিলো। পূর্বপশ্চিম পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় তার সন্তানরা সবাই ছোট ছিলো। তাই পড়ালেখা শিখতে পারেনি। চাকরিও পায়নি।’ এমন খবর সারা দেশ জুড়ে আছে। প্রতিদিন পত্রিকা খুললেই বীর মুক্তিযোদ্ধা বা তার পরিবারের সদস্যসদের এমন অনেক খবর পাওয়া যায়।

এবার দেখে নিই চাকরীতে কোটা নিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানে কী বলা আছেঃ

সংবিধানের ২৯ (১) ও (২) অনুচ্ছেদ বলে-

১. প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে
২. কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারনে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেইক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না ।

সংবিধানের ২৮ (৪) অনুচ্ছেদ বলে-

নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রনয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না ।

২৮ (৪) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা বা তার সন্তানদের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাতারে ফেলে দিয়ে তাদের কোটা প্রদান করতে ড. আকবর আলি খান সাহেবগন রাজী নন। হয়তো উনারা ভাবছেন যে উন্নত এগিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীর (পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী নয়) সদস্যগন লেখাপড়ার সুযোগ পান না অথবা তাঁরা মুটে মজুরী, চা বিক্রি, বাস ট্রাকের হেল্পারী, পত্রিকার হকারী অনেক ভালো কাজ বলে মনে করেন। ড. আকবর আলি খান সাহেবের ভাষায় হয় দিন বদলে গেছে তাই উনি তার নাতি পুতিকে হয়তো আর লেখা পড়া না শিখিয়ে মুটে মজুরী, চা বিক্রি, বাস ট্রাকের হেল্পারী, পত্রিকার হকারী করাবেন শহীদ এমএ সাঈদ সাহেবের ছেলেদের মতো। আমরা দেখতে চাই ড. আকবর আলি খান সাহেব তার নাতি-পুতিদের পেশা নির্বাচনে কী করেন।

দেশের সাধারণ মানুষদের সাথে ড. আকবর আলি খান সাহেবদের কী সুন্দর যোগাযোগ! সাবাস! তিনি তো সেই পাকি নেতার মতো বলেছেন, এগিয়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীর সদস্যগন লেখাপড়ার সুযোগ পাবেন না এবং তাঁরা মুটে মজুরী, চা বিক্রি, বাস ট্রাকের হেল্পারী, পত্রিকার হকারী করবেন। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ড. আকবর আলি খান সাহেবের মতো অনেকেই সুযোগের সন্ধানে আছেন। তাই তো গত ৩/৪ বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা নিয়ে তাঁরা খুব অস্থির, ঠিক নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিনের হালের অবস্থার মতো।

খবর-৩

সম্প্রতি টাইমওয়াল্ড এর এক সাক্ষাতকারে সব ছেড়ে নামাজ-রোজা ধরে বদলে যেতে চাওয়ার কথা বলেছেন তসলিমা নাসরিন। অর্থাৎ উনি এতদিন যা বলেছেন তা খ্যাতি, অর্থ বা বেপরোয়া ভোগের সুযোগ পাওয়ার জন্য বলেছেন। জীবনের এই বেলা শেষের কালে তসলিমা নাসরিন আবার স্বরূপে আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন। টাইমওয়াল্ড এর সাক্ষাতকারে এক প্রশ্নের জবাবে তসলিমা নাসরিন বলেন, “মাঝেমধ্যে মনে হয় সব ছেড়ে নামাজ-রোজা করি, তাওবা করে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করি। কম্যুনিস্টরাও তো এক সময় বদলে যায়। আমার জন্ম ১২ ই রবিউল আউয়াল, মহানবীর জন্মদিনে। নানী বলেছিলেন, আমার নাতনী হবে পরহেজগার। সেই আমি হলাম বহু পুরুষভোগ্য একজন ধর্মকর্মহীন নারী। বলা তো যায় না, মানুষ আর কত দিন বাঁচে। আমার মা ছিলেন পীরের মুরীদ। আমিও হয়ত একদিন বদলে যাবো”। অর্থাৎ আসলে তসলিমা নাসরিন শুরু থেকেই আন্তরিকভাবেই আস্তিক, নাস্তিক নন। ঠিক আমাদের মহান (?) কবি সাহিত্যতিক সাংবাদিক আল মাহমুদ, ফরহাদ মাযহার সাহেবের মতো। আসলেই জীবনের শেষ বেলায় সবাইকে যখন মৃত্যু চিন্তা গ্রাস করে তখন সবাই তাঁদের মনের ভিতর লুকিয়ে রাখা চরম সত্য কথা বলে ফেলেন, নিজের অজান্তেই। এভাবেই জানা যায় কারা আস্তিক আর কারা নাস্তিক অথবা কারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আর কারা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধ মানসিকতার; যারা সুযোগের অভাবে অথবা খ্যাতি, অর্থ বা বেপরোয়া ভোগের আশায় এতদিন মুখোশ পরে ছিলেন।

সায়েদুল আরেফিন

উন্নয়ন কর্মী, কলামিস্ট

  • আমাদের সময়.কম