বাকেরগঞ্জ কালের বিবর্তনে মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথে…..

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৯:৫৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০১৮ | আপডেট: ১০:০১:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০১৮

দীন মোহাম্মাদ দীনু,বাকেরগঞ্জ

বাকেরগঞ্জ উপজেলার হারিয়ে যাচ্ছে মৃৎশিল্প যারা বাপ-দাদার এই পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন, আয় কমে যাওয়ায় তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। তৈজসপত্রের ভিড়ে আগের মতো মৃৎশিল্পের কদর নেই। শত সমস্যার মাঝেও বাপ-দাদার এই পেশা বাঁচিয়ে রাখতে উপজেলার কয়েকটি পরিবার এই কাজের সঙ্গে জড়িত। এক সময় গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে এমনকি উচ্চবিত্ত পরিবারেও নানা রকমের মৃৎশিল্প সামগ্রীর ব্যবহার ছিল। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে। বেকার হয়ে পড়ছেন এ খাতের সঙ্গে যুক্ত কয়েক লাখ শিল্পী। মৃৎশিল্পে আয় কমের কারনে বাধ্য হয়ে অনেকে অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়েছেন। উপজেলার রঙ্গশ্রী, নিয়ামতি, কলসকাঠী, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ছিল মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত। তাদের তৈরি তৈজসপত্র জেলা ছাড়িয়ে দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হতো। এক সময় ঘর-গৃহস্থলি থেকে শুরু করে রান্না-বান্নাসহ সংসারের প্রায় সব কাজেই মৃৎশিল্পের তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহার হতো। মৃৎশিল্পীদের সুনিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, থালা, বাসন-কোসন, কলসি, ঢাকনা, চারু-কলকে, পেয়ালা, পানি রাখার সরা, ঘটি-বাটি, ফুলের টব, দইয়ের মালসা, সাজের হাঁড়ি, মাটির ব্যাংক ইত্যাদির কদর ছিল সর্বত্র। শুধু তাই নয় এ শিল্পের তৈজসপত্র রাজা, জমিদার ও অভিজাত পরিবারের নিত্যদিনের ব্যবহার্য ছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সহজলভ্য ও কম দামের অ্যালুমিনিয়াম, মেলামিন, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধাতব সামগ্রীর দাপটে মৃৎশিল্পের তৈরি সামগ্রীর চাহিদা ব্যাপক হারে কমছে। দিন যতই সামনের দিকে যাচ্ছে ততই কমছে এর ব্যবহার। বর্তমানে রান্নার কাজে মাটির কোনো জিনিস ব্যবহার নেই বললেই চলে। এখন গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন উৎসব মেলায় মাটির পুতুল ও ফুলের টব ছাড়া অন্য কোনো মৃৎশিল্পের গ্রাহক নেই বললেই চলে। তাই অন্যান্য ক্ষুদ্র শিল্পের মতো হারিয়ে যেতে বসেছে এ শিল্প। মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলো ভালো নেই। এখন মাত্র কয়েক শত শিল্পী তাদের এই পৈতৃক পেশা কোনো রকম আঁকড়ে ধরে আছেন। বাজারজাতকরণের অভাবে ও উৎপাদন খরচের তুলনায় সঠিক মূল্য না পাওয়ায় লোকসান গুনছেন তারা। চরম অর্থকষ্টে কাটছে তাদের জীবন। আয় বৈষম্যের শিকার হয়ে মৃৎশিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এদের মধ্যে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়ে কৃষি, মৎস্য চাষ, রিকশা, ভ্যান নির্মাণ ও চালানোসহ বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়ে তাদের সংসার চালাচ্ছেন। উপজেলার কলসকাঠী গ্রামের মৃৎশিল্পী রুপক পাল জানান, মাটির তৈরি তৈজসপত্রের স্থান দখল করে নিয়েছে অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্র। এসবের দাম বেশি হলেও অধিক টেকসই। তাই সাধারণ মানুষ ২-৪ টাকা বেশি হলেও অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের তৈরি তৈজসপত্রই কিনে থাকেন। নিয়ামতির দীপক পাল জানান, জিনিসপত্র তৈরি করতে অনেকদূর থেকে মাটি কিনে আনতে হয়। তাছাড়া জ্বালানির দাম বেশি। কাজ করে কোনো রকম দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জোগাড় হয়। মাটির তৈরির জিনিসপত্রের চাহিদা কমে যাচ্ছে তাই আগের মতো কাজও নেই। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে মৃৎশিল্পগুলো। মৃৎশিল্পীরা জানান, সরকার বা কোনো বেসরকারি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান যদি এই মৃৎশিল্পীদের প্রতি একটু নজর দেয় এবং এই হাজার বছরের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে সেই সঙ্গে মৃৎশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারদের আর্থিক সহায়তা দেয়া হয় তাহলে এই শিল্পটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে। অন্যথায় ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প অচিরেই হারিয়ে যাবে।