পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ বানিজ্য ; ৭ জনকে আইনি নোটিশ

এম. আর. প্রিন্স এম. আর. প্রিন্স

সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

প্রকাশিত: ১১:২১ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২১ | আপডেট: ১১:২১:পূর্বাহ্ণ, জুন ১৩, ২০২১

রিপোর্ট এম.আর.প্রিন্স : পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) নিয়োগ বানিজ্যের অভিযোগে  সাতজনকে আইনি নোটিশ দেওয়া হ‌য়ে‌ছে । ত‌বে সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশীদকে নো‌টিশ দেওয়া হয়‌নি ।  বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশীদের মেয়াদকালে কোন নিয়মনীতি না মেনে বিপুল অংকের টাকা ঘুষ নিয়ে বিভিন্ন পদে  লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে- এমন অভিযোগে গত ৩০ মে  ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া অবৈধ দাবি ক‌রে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন নোটিশ দেন। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অনু‌রোধ জা‌নানো হয়েছে। এবং ১৫ জুন সকাল ১০টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে নিয়োগ বানিজ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানানোর অনুরোধ করা হয়। অন্যথায়, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির জন্য উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলেও লিগ্যাল নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে ।

নোটিশপ্রাপ্তরা হলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান, পবিপ্রবি’র উপাচার্য স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত, রেজিস্ট্রার মো. কামরুল ইসলাম ও পবিপ্রবি’র কৃষি রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহীন হোসেন এবং কৃষিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রওশন জাহান লিপি। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান ও রওশন জাহান লিপি সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী এবং লিপি অভিযুক্ত উপাচার্য হারুন-অর-রশীদের ক‌থিত মেয়ে। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে উপাচার্য হারুন-অর-রশীদের মেয়াদকালে এ দম্পতি নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে । অন্যদিকে বিভিন্ন প্রভাব বিস্তার করে ম‌নিরুজ্জামানও বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ের একা‌ধিক দা‌য়ি‌ত্বে ছি‌লেন ।

নাম প্রকাশ না করার শ‌র্তে প‌বিপ্র‌বির একা‌ধিক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক জা‌নি‌য়ে‌ছেন, অর্থের বি‌নিম‌য়ে ল্যান্ড ম্যা‌নেজ‌মেন্ট অনুষ‌দের তিন‌টি বিভা‌গে তিনজন আইনজী‌বী‌কে শিক্ষক হি‌সে‌বে নি‌য়োগ দেওয়া হ‌য়ে‌ছে। তিনজন‌কেই তিন‌টি বিভা‌গে ঘু‌রে‌ফি‌রে অংশগ্রহণকারী দেখা‌নো হ‌য়ে‌ছে। ওই নি‌য়োগ প্র‌ক্রিয়ার স‌ঙ্গে অনুষ‌দের ডিন কিংবা চেয়ারম্যানরা অংশগ্রহণ ক‌রেন‌নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের ছোট ভাই এবং রওশন জাহান লিপির দেবর মো. কামরুজ্জামান এবং শাহীন হোসেনের বড় বোন নাজমুন নাহারকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। নোটিশে এই নিয়োগ দুটি বাতিলের দাবি করা হয় । প‌বিপ্র‌বির উপাচার্য স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত লিগ্যাল নোটিশ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেন,  বিষয়টি নিয়ে  আইন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে । এ বিষয়ে অন্য নোটিশপ্রাপ্তরা গণমাধ্যমের কা‌ছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়, পবিপ্রবি’র প্রভাষক পদে চাকরি প্রার্থী ছিলেন কুষ্টিয়ার দেবাশীষ মণ্ডল। ওই পদে চাকরি দেওয়ার জন্য তার কাছে বিপুল অংকের টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছিল। অথচ বাছাই পরীক্ষার ফলে তিনি সেরা ছিলেন। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান , শাহীন হোসেন এবং রওশন জাহান লিপি  দেবাশীষের কাছে ১০ লাখ টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন। দেবাশীষ যেকোনো মূল্যে ওই চাকরি পেতে আগ্রহী ছিলেন। পরে সাক্ষাৎকার বোর্ড  তাঁর কাছে ১৫ লাখ টাকা দাবি করে । অতিরিক্ত পাঁচ লাখ টাকা সংগ্রহ করতে তাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।  দেবাশীষ সর্বোপরি ১৫ লাখ টাকা সংগ্রহ করতে না পারায় ওই চক্রটি রফিক উদ্দিন নামে আরেকজন নতুন প্রার্থীর কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে তাকে ওই পদে চাকরি দেন।

মৌখিক পরীক্ষা শেষে দেবাশীষ জানতে পারেন তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন এবং তাঁর পরিবর্তে রফিক উদ্দিন নামের একজনের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে ওই পদে চাকরি দেওয়া হয়েছে। পরে দেবাশীষ ২০১৮ সালের ১৪ মে কুষ্টিয়ায় নিজ বাড়িতে ফিরে গিয়ে আত্মহত্যা করেন। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান,শাহীন হোসেন ও রওশন জাহান লিপি  দণ্ডবিধি ৩০৬ ধারায় অপরাধ করেছেন বলে নোটিশে দাবি করা হয়। নোটিশে আরো বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দায়িত্ব ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়মকানুন অনুসরণ করা হয় কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা । কিন্তু তা করা হয়নি । এতে ওই নিয়োগে ঘুষ-বাণিজ্যসহ অনিয়ম হয়েছে । ওই পদে নিয়োগপ্রাপ্ত রফিক উদ্দিনের সিজিপিএ ছিল ৩.৬৪। অথচ  নিয়োগে দেবাশীষ মণ্ডলের সিজিপিএ ছিল ৩.৮২।  দেবাশীষের চেয়ে কম থাকা সত্বেও নিয়োগ পায় রফিক উদ্দিন ।

নোটিশে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান, পবিপ্রবি’র উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয় । এবং১৫ জুন সকাল ১০টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীকে  এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, তার স্ত্রী রওশন জাহান লিপি এবং শাহীন হোসেনের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা জানানোর অনুরোধ করা হয় । তা নাহলে, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির জন্য উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে বলে লিগ্যাল নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

Print Friendly, PDF & Email