নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে নারীরাও কম দায়ী নয়

এম. আর. প্রিন্স এম. আর. প্রিন্স

সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

প্রকাশিত: ৭:৪০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৫, ২০২০ | আপডেট: ১০:৪৫:অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৫, ২০২০

~ এম.আর.প্রিন্স ~ সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী ।

” ধর্ষণতো জোড় করলে হয় । আমি কারও মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিংবা জোড় করে মেলামেশা করিনি । সবাই স্বেচ্ছায় সবকিছু করেছে । তাহলে এটাকে আপনি ধর্ষণ বলছেন কেন ?” কথাগুলো নির্দ্বিধায় বলেছেন, বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর ইউনিয়নের নওরোজ হীরা (৫২) নামের প্রভাবশালী এক ব্যক্তি । যার বিরুদ্ধে সম্প্রতি একাধিক ধর্ষনের অভিযোগ ওঠেছে । অনুসন্ধানী রিপোর্টের জন্য তার সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি একথা বলেন । আমি বললাম, ” ইচ্ছে করলেই স্বেচ্ছায় ও নির্দ্বিধায় সবকিছু করা যায়না । দেশে আইন ও বিধিবিধান রয়েছে । সে অনুযায়ী চলতে হবে ।” ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জবাবে তিনি বলেন, ” তাহলে আমাকে একা দোষী ভাবছেন কেন ? উভয়ই অপরাধী ।ছেলেদের যদি ধর্ষক বলেন তাহলে যে সমস্ত মেয়েরা রূপ যৌবন ও শরীরের প্রলোভন দেখিয়ে ছেলেদেরকে আবেগের ফাঁদে ফেলে সঙ্গ দেয় তাদের উপাধি কি দিবেন ? ।” তার অসংলগ্ন এলোমেলো কথা বার্তায় বিব্রত হয়ে থেমে গেলাম । একটি সূত্র থেকে তার অনৈতিক কার্যকলাপের কিছু ভিডিও সংগ্রহ করলে তাতে দেখা যায় একটি কিশোরী মেয়ে একরকম বিদঘুটে চেহারার বয়স্ক লোকের সাথে অনৈতিক কাজে লিপ্ত এবং যা কিছু করেছে তা স্বেচ্ছায় ও নির্দ্বিধায় । যেমনটি দেখেছিলাম আলোচিত এক মডেল ও অভিনেত্রীর বেলায় । এরকম অসংখ্য অভিযোগের ক্ষেত্রে একই চিত্র দেখা যায় । নারীরা নেশা, অনৈতিক কার্যকলাপ, একই সময়ে একাধিক সঙ্গীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন্ করা, পরকীয়া সহ নানা অপরাধে জড়ানোর কারনে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছে অহরহ । বহু ধরনের আবেগের তীব্রতা মাঝে মাঝে উচ্ছৃঙ্খল ও অধিক মোহে আচ্ছন্ন মেয়েদের চিন্তা ও চেতনাকে ভোতা করে দেয় । অনেক ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায় নারীরাই নারীদের ঈর্ষা করে ।বউ শাশুড়ীর যুদ্ধ কথাটি প্রায়শই শুনে থাকি । ননদ-ভাবী, যা’য়ে যা’য়ে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলে নিরবে নিভৃতে । যা পরোক্ষভাবে নারী পুরুষ সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব ফেলে । অতিরিক্ত আবেগে একজন পুরুষকে ভালভাবে না জেনেই নারীরা গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলে । আবার লোভে কিংবা স্বার্থসিদ্ধির জন্যও খারাপ কিছু জেনে শুনেও সম্পর্ক গড়ে তোলে ।নারী হয়ে আরেক নারীর সংসার ভাঙ্গে ।পরবর্তীতে অসতর্কতা ও ভুলের খেসারত দিতে হয় কঠিন ভাবে । তাই নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে নারীরাও কম দায়ী নয় । নারী পুরুষ উভয়ের সকল আবেগ চেতনাকে সুন্দর ও উন্নত করতে হবে । যাতে নারীদের আত্ম সম্মান বাড়ে এবং নিজের অধিকারটা বুজতে পারে সেদিকে সচেতন হতে হবে । নারী পুরুষ উভয়ের দায়িত্ববোধ জাগ্রত এবং সমাজের সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই সকল সমস্যার সমাধান করতে পারে ।

মানব জীবন বিনাশকারী করোনা ভাইরাস আতঙ্কে কভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকে অপরাধ প্রবনতা অনেক কমে গিয়ে ছিলো । কিন্তু সাম্প্রতিক ধর্ষণ ও অমানবিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো সারা দেশে আলোড়ন ও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে । গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে এ বছর এপ্রিল থেকে আগস্টের মধ্যে ৬৩২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে । ২০১৯ সালের প্রথম চার মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছিল । সেপ্টেম্বর ২০২০ পর্যন্ত ধর্ষণের পর কমপক্ষে ২৯ জন মারা গেছে এবং পাঁচজন আত্মহত্যা করেছে । বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের (নারী ও শিশু মানবাধিকার সংগঠন) তথ্য অনুযায়ী প্রতিনিয়তই নারী ও কণ্যা শিশু ধর্ষণের পরিমান বেড়েই চলেছে এবং নির্যাতনের নির্মম ও নিষ্ঠুর ধরনকে উদ্বেগ জনক বলেছে । সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহে বোঝাই যাচ্ছে ২০২০ সালের সর্বশেষ হিসাব আরও উদ্বেগ জনক হতে পারে । পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও অবস্থা খারাপ ।রয়টার্সের তথ্যমতে, লকডাউনের প্রথম সপ্তাহেই ভারতে নারী নির্যাতন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল । পরবর্তীতে এর মাত্রা আরও বেড়ে গিয়েছে যা আমরা ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম গুলোতে দেখতে পাই ।অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের নারীরাও নির্যাতন থেকে রেহাই পাচ্ছেন না । তাই বিশ্ব ব্যাপী নারী বিষয়ক দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন অত্যাবশকীয় হয়ে উঠেছে ।

কিছু নির্বোধ, বখাটে, নেশাখোর ও বিকৃত মনমানষিকতার কাপুরুষদের অপকর্মের দুর্নাম কেন গণহারে সকল পুরুষকে নিতে হবে ? একজন আদর্শ পুরুষই মা’কে অগাধ শ্রদ্ধা, মেয়েকে অকৃত্রিম স্নেহ, স্ত্রী’কে অফুরন্ত ভালবাসা, বোনদেরকে আদর ও সকল নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে । অথচ নারীরা তাদের লেখায়, বক্তৃতায়, আলোচনায় পুরুষজাতী বলে গালি দেয় ।পুরুষই নারীকে ভালবেসে প্রেমের তাজমহল গড়েছে, দেবদাস হয়েছে । নারীদের ক্ষেত্রে পুরুষদের প্রতি এরকম ভালবাসার নিদর্শন নেই বললেই চলে । যে ভাল, সে সব ক্ষেত্রেই সবসময় ভাল, আর যে মন্দ, সে সব ক্ষেত্রেই সবসময় মন্দ । সে পুরুষ হোক কিংবা নারী ।বিভিন্ন সময়ে তথাকথিত নারী আন্দোলনের নামে নারীকে পুরুষের মুখামুখি করা হয়েছে । নারীবাদ বা পুরুষবাদ বলে নারী এবং পুরুষকে এই মুখোমুখি দাড় করানো, ভাল মন্দ বিশ্লেষণ না করে একচেটিয়া সকল পুরুষকে ‘পুরুষ জাত’ এরকমই হয় বলে তাচ্ছিল্য করা, এ ধরনের বহুবিধ কারন নারী পুরুষের মধুর সম্পর্ককে আরও ঘুন ধরাচ্ছে । প্রকৃতি প্রদত্ত পরিবারের লিডারশীপ পূরুষদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা যে প্রক্রিয়ায় করা হচ্ছে তা সাংঘর্ষিক । আবার কিছু নারীরা নিজেদেরকে পুরুষের তুলনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্বল ভেবে যৌতুক গ্রহন ও বাল্যবিবাহ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন । আবার উল্টোও দেখা যায় প্রকৃতির নিয়ম ও বাস্তবতা নামেনে কিছু নারী নিজেদেরকে পুরুষের চেয়ে শক্তিশালী ভেবে অঘটন ঘটিয়ে বসে । সমাজের সকল ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষের সম্মিলিত অবদান রয়েছে । কিন্তু ইদানিং নারীবাদের প্রধান লক্ষণ হিসেবে নারী-পুরুষের এই মুখোমুখি অবস্থানটা প্রকাশ পাচ্ছে । এই মনোভাব একধরনের সংকীর্ণ চিন্তার ফসল । নারীবাদের এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরো বেশী সহিংসতার পথ দেখাতে পারে বলে সমাজ বিজ্ঞানীদের ধারণা । ইতিমধ্যেই পুরুষ নির্যাতন বন্ধ সহ বিভিন্ন দাবীতে দেশব্যাপী মানব বন্ধন ও কর্মসূচী দিচ্ছে বিভিন্ন সংগঠন ।সম্প্রতি বাংলাদেশ মেনস রাইটস ফাউন্ডেশন ‘ নামে একটি সংগঠন বরিশাল সদর রোড টাউন হলের সামনে মানব বন্ধন করে বলেছে, ” নারীরা একচেটিয়া সকল পুরুষকে অভিযুক্ত করে যাচ্ছে । ভাল-মন্দ নারী পুরুষ উভয়ের মধ্য রয়েছে । তাই লিঙ্গ নিরেপেক্ষ আইন বাস্তবায়ন, পুরুষ নির্যাতন দমন আইন প্রণয়ন, পুরুষের বিরুদ্ধে মিথ্যা নারী নির্যাতন মামলা বন্ধ এবং সম্পর্কের অবনতি হলে পুরুষের বিরুদ্ধে নারীদের মিথ্যা ধর্ষণ মামলা বন্ধ করতে হবে ।” অভিজ্ঞ মহল মনে করেন, এভাবে উভয় উভয়ের বিরুদ্ধে গণহারে দোষারূপ না করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে সমাধান খুঁজতে হবে ।

কিছুদিন পূর্বে সিলেটে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা, হবিগঞ্জে রাতে ঘরে ঢুকে কিছু লম্পট মা ও মেয়েকে দল বেঁধে ধর্ষণ, নোয়াখালীতে একদল যুবক এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন, সামাজিক মাধ্যমে যা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়।বিবেকের তাড়নায় এ নির্মমতা কখনও মেনে নেয়া যায়না । দেশের আইন ও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিদিনই কিভাবে ধর্ষণ বর্বরতার ঘটনা ঘটছে তা সংশ্লিষ্ঠদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন । জীবন চলার পথে নারীদের হতে হবে আরও সচেতন । বরগুনায় আলোচিত রিফাত হত্যাকান্ডে সর্বশেষ মিন্নি’র ভূমিকায় আমরা অবাক হই । একজন নারী কিভাবে নিজের অপকর্মকে আড়াল করতে বাস্তব জীবনে এতো নিখুঁত অভিনয় করে । সাভারে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দিনের পর দিন এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে এক প্রবাসীর বিরুদ্ধে। এতো ঘটনা ঘটার পরও কেন নারীরা সচেতন না হয়ে প্রলোভনে পড়ছে । কিছু নারীরা স্বেচ্ছায় অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলে আবার সম্পর্কের অবনতি হলেই প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের কথা বলে । কয়েক মাস পূর্বে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু বয়সী এক স্কুল ছাত্রী মা হওয়ার সংবাদ পেয়ে তথ্য সংগ্রহে গিয়ে ঐ ছাত্রীর মুখেই জানতে পারি, ভোঁজমহল গ্রামে তারই স্কুলের প্রধান শিক্ষক কর্তৃক বার বার ধর্ষণে ঐ স্কুলের এক শিক্ষিকা সহযোগিতা করেছে । নারী হয়ে নারীর প্রতি এ অন্যায় কিভাবে মেনে নেয়া যায় ? বর্তমানে বাবা মেয়েকে, চাচা ভাতিজিকে, শিক্ষক ছাত্রীকে ধর্ষণের কথা শুনতে হয়, যা খুবই দুঃখজনক। বিদ্যালয়, প্রাইভেট, কোচিং এমনকি আপন জনদের কাছেও শিশু ও কিশোরীরা অনিরাপদ । নির্যাতন ও ধর্ষণের মূলে রয়েছে চরম নৈতিক অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতি, মাদকের নেশা, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রতিবন্ধকতা । সমাজবিজ্ঞানী, আইনজীবী ও মাঠপর্যায়ের অপরাধ তদন্তকারীরা ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন । আমাদের দেশে বর্তমানে যা ঘটছে তা পূর্বে কখনও দেখা যায়নি । যার ফলে সরকার মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে কঠোর আইন পাশ করতে বাধ্য হয়েছে । এখন দেখার বিষয় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কতটা স্বচ্ছতা , জবাবদিহিতা ও গতিশীলতা চলমান থাকে । এবং এর মাধ্যমে কতটা স্বস্তি ও শান্তিপূর্ণ সমাজে ফিরে আসা যায় । কারন অতীতে পরিস্থিতির কারনে এরকম অনেক কঠোর আইন পাশ হয়েছে কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি , স্বজনপ্রীতি , প্রভাব , আইনের অপব্যবহার সহ নানাবিধ কারনে এর সুফল পাওয়া যায়নি । দুর্বল আইনের শাসনও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে । ভবিষৎতে সুষ্ঠ ও শান্তিপ্রিয় সমাজ গঠনে সকল চেষ্টা ও কাজগুলো সততার সহিত করা প্রয়োজন ।

বর্তমান সময়ের এই অস্থিরতা ও নির্মমতার কারন, না বুঝেই অতি আধুনিকতা কিংবা সামাজিক বৈষম্যের কারনে জীবন যাপনের ভিন্নতা । সামাজিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে দাড়িয়েছে, চোখের সামনে নির্যাতন , অনৈতিক অসামাজিক কার্যকলাপ কিংবা অপরাধ প্রবনতা দেখলেও মানুষ নিরব ভূমিকা পালন করছে । সামাজিক মাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দিয়েই ভাবছে দায়িত্ব শেষ । পূর্বে নির্যাতন গুলো প্রকাশিত হতো না, এখন প্রকাশিত হচ্ছে । নানা ভাবেই প্রকাশিত হচ্ছে । অনেকগুলো টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক যে কোন ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ অতি দ্রুত অবগত হচ্ছে । সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে । তবুও থামছেনা কেন ? গভীরভাবে ভেবে সময় উপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে । এবং নতুন ভাবে পাশ হওয়া কঠোর আইন বাস্তবায়ন করতে হবে । বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীর অনেক ভূমিকা রয়েছে যা নারী নির্যাতন নিয়ে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জাতীয় পর্যায়ে একটি জরিপে উঠে এসেছে ।কিন্তু কিছু লোভী ও উচ্ছৃঙ্খল নারীদের অনৈতিক কর্মকান্ডে তা ম্লান হচ্ছে ।নারী নির্যাতন নিয়ে আরও বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছেন । প্রায় প্রত্যেকের জরিপেই দেখা যায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাল্য বিবাহ, যৌতুক, পরকিয়া, বয়সের ব্যবধান, নেশা, মতের অমিল সহ পারিবারিক নানা জটিলতার কারনে নারী-পুরুষ নির্যাতন বাড়ছেই । এবং এ নির্যাতনের ভয়াবহতা এতটাই প্রকট যে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের মমত্ববোধের মৌলিক বৈশিষ্ট্যই পাল্টে যাচ্ছে এবং সমাজ ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব বিস্তার করছে । সাম্প্রতিক হিস্রতা ও হত্যার ধরন খুবই ভয়ানক । শরীর থেকে মাথা ও হাত পা বিচ্ছিন্ন এবং শরীরটাকেও বিকৃত ভাবে টুকরো টুকরো করা হচ্ছে । আধুনিক সভ্য সমাজে এ কেমন নিষ্ঠুর বর্বরতা ? কোথায় স্বাধীনতার সুদৃঢ় চাঞ্চল্য ? যৌবনের সুদৃঢ় চেতনা আজ ভয়ংকর ভস্মীভূত, বিপর্যস্ত । এক সময় ছিলো নিজেকে সঠিক ভাবে গড়ে তোলার যৌবন দীপ্ত তারুণ্য , বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে অদম্য ছুটে চলা । কিন্তু আজ ? শিশু থেকে কৈশোরে যৌবনে সকলে কি শিখছে ? প্রতারণা, মানুষ ঠকানো ও চেতনার বানিজ্য চলছে । মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্ত চলছে ! প্রতিবাদ নেই । সারা জাতির বিবেক যেন ইয়াবা খাইয়ে ঘুম পড়িয়েছে কেউ ! ভাবনার জগৎ সুন্দর করতে না পারলে এগুলো চলতেই থাকবে । জীবন চলার পথে একজন মানুষ শেখানোর মধ্যেই সবকিছুই শিখে । তাই পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা থাকা প্রয়োজন ।

গ্রাম কিংবা শহরে প্রায়শঃই দেখি বিভৎস্য ভাবে ধর্ষণ ও নির্যাতনে স্বীকার হওয়া মেয়েদের ভবিষৎ ভাবনায় অসহায় বাবা ও মা দিকশূণ্য ভাবলেশহীন । এ রকম অসংখ্য নির্যাতিত মেয়ে ও অসহায় বাবা মা রয়েছে সমাজে । আবার অপধারীরাও রয়েছে । বিচার হীনতা থাকলেই বার বার একই ঘটনার পূর্নাবৃত্তি ঘটবে এটাই স্বাভাবিক । ধারাবাহিক নানা ভাবে নারী নির্যাতনের সংস্কৃতি পরিবর্তন না হলে এ নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব হবে না । এ ক্ষেত্রে নারীদেরও অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে । বাংলাদেশের নারীদের জীবনের মান উন্নয়ণ খুবই প্রয়োজন । শিক্ষা, আদর্শ, দায়িত্ববোধ, সতর্কতা সহ আদর্শ জীবনের গুনাবলী সমৃদ্ধ হলে নারী নির্যাতন অনেক কমে আসবে । বর্তমান সামাজিক কৃষ্টি কালচার থেকে শিক্ষানোর মধ্যেই শিশুরা খারাপ অনেক কিছুই শিখছে এবং সব ধরনের অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে । আমরা পুলিশ অফিসারের অভাবহীন পরিবারেও নিজ আপন সন্তান ঐশী’র হাতে বাবা মাকে খুন হতে দেখেছি । আবার পরকীয়া প্রেম ও নেশার ঘোরে নিজ শিশু সন্তানকে মা হয়েও খুন করার সংবাদ পাচ্ছি । সম্পর্কের যায়গাগুলো হয়ে যাচ্ছে কৃত্রিম ভাবলেশহীন । এভাবে চলতে থাকলে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন কখনই পূরণ হবে না । ভবিষৎ প্রজন্মের কথা ভেবে সকল অভিবাবকদের সন্তানদের দিকে খেয়াল রাখতে এবং সচেতন হতে হবে ।

সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, গুম, খুন, অপহরণ, মুক্তিপন দাবী সহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়ানক সংবাদ । যৌতুকের জন্য আগুনে ঝলসে দেয়া সহ নির্মম হত্যাকান্ড এই সভ্য আধুনিক সমাজে এখনও দেখতে হয় । কিছু সংবাদ গণমাধ্যম ও থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ালেও অনেক ঘটনাই নানা কারনে থেকে যায় সবকিছুর আড়ালে । এখনই ভেবে দেখা ও সমাধানে যাওয়া উচিৎ । এখনই ভেবে দেখা উচিৎ কেন অনেকেই অনেক ক্ষতির পরেও আইনের আশ্রয় নিতে অনীহা প্রকাশ করে । আইনি দুর্বলতার কারনে জামিন অযোগ্য অপরাধে অনেক ক্ষেত্রে জামিন পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা এবং পরবর্তীতে আবারও উৎসাহ নিয়ে অপরাধ করে বেড়াচ্ছে । যার ফলে অপরাধের নির্মমতা ও মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে । আবার অনেকে জানেনা কিসের জন্য কোথায় অভিযোগ করতে হয় । তাই সচেতনতা বৃদ্ধি করার নানা পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী প্রয়োজন । আমরা যে সমস্ত লোমহর্ষক ঘটনা পত্রিকায় ও টিভিতে দেখে ধিক্কার ও নিন্দা জানাই কখনো কি আমরা ভিতর থেকে সেই ঘটনাটির কারণ বিশ্লেষণ করি? ঘটনা ঘটার ভিতরকার কারনগুলো অবশ্যই খুঁজে বের করা দরকার । একটা মানুষ কেন এতো পাশবিক হয় ? এর মনস্তাত্বিক কারনগুলো কী ? কী কী কারণে একটি সংসারে অশান্তি নেমে আসে ? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে সমাধান না হলে পাশবিকতা চলতেই থাকবে । নারী-পুরুষের সম্পর্কের মধুর বন্ধনটাকে মজবুত করতে এই মনস্তাত্বিক সমাধান খুবই দরকার। নারী-পুরুষের সম্পর্ক আজ এক মানসিক নৈরাজ্যের দিকে যাচ্ছে। মুহুর্তেই ভেঙ্গে যাচ্ছে প্রেম-সংসার-জীবন । এরকম যদি চলতে থাকে তাহলে খুব শিগগিরই আমরা এক সামাজিক নৈরাজ্যের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি- এটা নিশ্চিত । এ সামাজিক সমস্যা নিরসনকল্পে নারীওপুরুষকে উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে । পরিস্থিতির কাছে মানুষ বড়ই অসহায় । বিচারহীনতা উস্কে দিচ্ছে হিংস্রতা । আমরা দেশটাকে এভাবে দেখতে চাইনা । নারী পুরুষ উভয় মিলে সুখী-সমৃদ্ধ শান্তির বাংলাদেশ গড়তে চাই । মধ্যম আয়ের দেশ, উন্নত ডিজিটাল দেশের সাথে মানুষের মন ও মনন আধুনিক, মমত্ববোধ বিবেচনা প্রসূত হওয়া চাই ।