হাতিরঝিলের সেই অজ্ঞাত লাশের রহস্য উদঘাটন হল যেভাবে

প্রকাশিত: ১:৪৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২০ | আপডেট: ১:৪৭:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০২০

সম্প্রতি হা’তিরঝিলের লেক থেকে অজ্ঞাত এক যুবকের লা’শ উদ্ধার করে পুলিশ। মুখমণ্ডল, হাত, আ’ঙ্গুল ও শরীরের বিভিন্ন স্থা’ন বিকৃত থাকায় ফিংগার প্রিন্ট সং’গ্রহের মাধ্যমেও পরিচয় সনাক্ত করা যা’য়নি লা’শের পরিচয়।

অবশেষে ক্লু-লেস ওই হ’ত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। গ্রে’ফতার করা হয়েছে হ’ত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজন ব্যক্তিকে।

ডিসি-তেজগাঁও ডিএমপির ফেসবুক পেজে বি’স্তারিত তুলে ধরা হয়েছে সেই রহস্য ‘দঘাটনের বর্ণনা, যা পাঠকদের জন্য তু’লে ধরা হল।

গত ১২ অক্টোবর, ২০২০ সকাল ৭ ঘটিকায় হা’তিরঝিল থানাধীন হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বা’ড্ডা প্রান্তে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার হাত পা রশি দিয়ে বাধা ছিল। বেডশিট-মশারি ও পলিথিনে মোড়া’নো ছিল পুরো শরীর। মুখ’মন্ডল, হাত, আঙ্গুল ও শরীরের বিভিন্ন স্থান ছিল বি’কৃত। যে কারণে ফিংগার প্রিন্ট সংগ্রহের মাধ্যমেও তার পরিচয় সনাক্ত করা যায়নি।

হাতিরঝিল লে’কের যেস্থানে এ মৃতদেহটি ভেসে ছিল সেখান থেকে প্রায় ৫০ মিটার উত্তরে লেকের পানি ঘেষে প’ড়ে থাকা একটি ছেড়া কাগজে লেখা একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে মৃত ব্যক্তির পরিচয় স’নাক্তের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে জ’ড়িত আসামিদের গ্রে’ফতার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ।

মৃ’ত ব্যক্তির নাম আজিজুল ইসলাম মেহেদী। বয়স ২৪ বছর। তি’নি আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় চট্ট’গ্রামের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। আ’মেরিকা প্রবাসী বাবার একমাত্র ছেলে। আ’জিজুল ইসলাম মেহেদীর জন্ম চট্টগ্রাম জেলার সন্দীপের বাউরিয়া গ্রা’মে হলেও বেশ কয়েক বছর ধরে মাকে নিয়ে চট্ট’গ্রামের ফিরোজ শাহ এলাকায় থাক’তেন তিনি। লেখাপড়া শেষ করে কানা’ডায় যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। লে’খাপাড়ার পাশাপাশি পরিচিতজনদের পাসপোর্ট ও ভিসা প্র’সেসিংয়ে সহায়তা করতেন মে’হেদী।

১৩ অক্টোবর, ২০২০ তেজগাঁও শি’ল্পাঞ্চল জোনের এডিসি হাফিজ আল ফারুকের নেতৃত্বে এসি আশিক হাসান, হাতিরঝিল থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুর রশীদ, ইন্সপেক্টর মহিউদ্দিন, এসআই  আতাউল ও এএস’আই তরিকুল ইসলামের একটি টিম  রাত ০১ টা ২০ মিনিট থেকে ভোর ০৬টা ৪০ মি’নিট পর্যন্ত খিলক্ষেত থানাধীন উত্তরপাড়া এলাকা থেকে এ হ’ত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামি আহসান ও তামিম, হাতিরঝিল থানা’ধীন মহানগর আবাসিক এলাকা থেকে আ’লাউদ্দিন এবং রামপুরা এলাকা থেকে রহিমকে গ্রে’ফতার করে।

গ্রে’ফতারকৃত আহসান, আলাউদ্দিন ও রহিম আ’দালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

গ্রে’ফতারকৃত আহসান জন্ম চট্টগ্রাম জেলার সন্দীপের বাউরিয়া গ্রামে। সে নিহত আ’জিজুল ইসলামের বাল্যবন্ধু। পাঁচ বছর মালেশিয়ায় থেকে ডিসেম্বর, ২০১৯ এ বাংলাদেশে ফেরে আহসান। মার্চ, ২০২০ এ ঢা’কার গুলশান ২ এ অবস্থিত ‘দ্য গ্রোভ’ রেস্টুরেন্টে মাসিক ৬৫,০০০ টাকা বেতনে এক্সিকি’উটিভ শেফ হিসেবে যোগদান করে আহসান। তবে করোনায় রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়ে আহসান। ত’খন সে তার স্ত্রীর আত্মীয় এ হত্যা’ণ্ডে জড়িত অপর আসামি আলাউদ্দিনের কাছে কিছু টাকা ধার চায়।

আলাউদ্দিন পেশায় ‘ড্রাইভার হলেও পাসপোর্ট অফিসে দালালী ও পরিবহন পুলের পুরাতন গাড়ি ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল। আলাউদ্দিন আহসানকে টাকা ধার না দিয়ে পাসপো’র্ট সংক্রান্ত কাজ (না’মের বানান সংশোধন, জন্ম তারিখ সংশোধন, বয়স বাড়ানো ক’মানো) দিতে বলে। এ কাজে যে টাকা পাওয়া যাবে তা দু’জনে ভাগ করে নেবে।

আহসান বাল্যব’ন্ধু আজিজুল ইসলাম মেহেদীকে জানায় পাস’পোর্টে সমস্যা সংক্রান্ত কোনও কাজ থাকলে সে সমাধান করে দিতে পারবে।

চট্টগ্রামের তিনটি ‘পাসপোর্টের নাম ও বয়স সংশোধনের জন্য ১২ আগস্ট,’ ২০২০ এ ঢাকা’য় আহসানের কাছে আসে মেহেদী। মেহেদী আলাউদ্দিনকে এ বিষয়টি’ জানালে আলাউদ্দিন তার গাড়িতে আহসান ও মেহেদীকে মহান’গর আবাসিক এলাকায় অবস্থিত তার বাসায় নিয়ে যায়। দুই সপ্তাহে’র মধ্যে পাসপোর্ট তিনটির নাম ও বয়স সংশোধন করে দেওয়ার বিনিময়ে আলাউদ্দিনকে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ও আহসানকে ১ লাখ টা’কা দেয় মেহেদী।

আগারগাঁও পাসপো’র্ট অফিসে কর্মরত উচ্চমান সহকারী পদমর্যাদার এক ব্যক্তিকে আর্থিক সুবি’ধা প্রদানের মাধ্যমে  পাসপোর্টে নাম ও বয়স সংশোধনের কাজ করতো আলাউদ্দিন। পাসপোর্ট তিনটি সংশোধনের জন্য পাসপোর্ট অফিসের সেই ব্যক্তিকে দিলেও নি’র্ধারিত’ সময়ের মধ্যে ‘সে কাজ কতে দিতে পারেনি। আহ’সান ও আলাউদ্দিনকে এজন্য চাপ দেয় মেহেদী। পরবর্তীতে আহসান ও আ’লাউদ্দিন মেহেদীর কাছে এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নেয়। এই সময়েও পাসপোর্ট সংশোধনের কাজ করতে ব্যর্থ হওয়ায় আলাউদ্দিন ও আহসানের কাছে পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত চায় মেহেদী।

আহসান ও আলাউদ্দিন পাস’পোর্ট ও টাকা ফেরত না দিয়ে সময় ক্ষেপণ করতে থাকে। একপর্যায়ে মেহেদী এ দুজনকে জানায় পাসপোর্ট ও টাকা ফেরত না দিলে ঢাকায় এসে তাদের অ’ফিসে অভিযোগ করবে। চাকরি হা’রানোর ভয়ে আহসান ও আলাউদ্দিন মেহেদীকে হ’ত্যা করার পরিকল্পনা করে। এ পরিকল্পনার অংশ হি’সেবে আহসান ও আলাউদ্দিন পাসপোর্ট নেওয়ার জন্য মেহেদীকে ১০ অক্টোবর, ২০২০ এ ঢাকায় আসতে বলে।

১০ অক্টোবর, ২০২০ রাত ১১টা ১০ মিনিটে চট্টগ্রা’ম থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছে মেহেদী। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা মোতাবেক আহসান মেহেদীকে খিলক্ষেত উত্তরপাড়ায় অবস্থিত তার ভাড়া বাসায় নিয়ে যায়। খাবারের সা’থে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয় মেহেদীকে। রা’ত আনুমানিক ০১টা ৩০ মিনিটে ঘুমন্ত মেহেদীকে শ্বাস’রুদ্ধ করে হত্যা করে মেহেদীর হাত, পা রশি দিয়ে শক্ত করে বেধে বে’ডশিট, মশারি ও পলিথিনে মুড়িয়ে ফেলে মো’বাইল ফোনে আলাউদ্দিনকে হত্যার পর ‘বিষয়টি কনফার্ম করে আহসান।

উল্লে’খ্য ৮ অক্টোবর, ২০২০ এ আলা’উদ্দিন পেশাগত কাজে সিলেটে যায়। নিজেকে সন্দেহের বাইরে রাখতে ঢাকার বাইরে অবস্থাকালীন সময়ে মেহেদীকে হত্যার পরিকল্পনা করে আহসানের মাধ্যমে মে’হেদীকে ঢাকায় আসতে বলে আলাউদ্দিন।

আহসানের পাশের রুমের ভাড়াটিয়া তামিম (‘দ্য গ্রোভ’ রেস্টুরেন্টে ক’র্মরত কলিগ) আকস্মিকভাবে আহসানের রুমে ঢুকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানতে পারে। আহ’সানের অনুরোধের প্রেক্ষিতে তামি’ম জানায় বিষয়টি সে কাউকে বলবে না এবং লাশটি সুবিধাজনক স্থানে ফেলে ‘দিতে’ আহসানকে ‘সহায়তা করবে।

লাশ সরিয়ে ফেলার’ জন্য ভোর চা’রটার দিকে আলাউদ্দিন খিলক্ষে’ত উত্তরপাড়ায় আহসানের বাসায় গাড়ি পাঠায়। আহসান ও তামিম ড্রাইভারকে গাড়িতে বসতে বলে নিজেরাই মালামাল গাড়িতে তুলবে জানা’লে ড্রাইভার তাদের মালামাল গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। পাশাপাশি ফজরের নামাজ শেষ হও’য়ায় লোক সমাগম বেড়ে যাওয়া’য় গাড়ি ছেড়ে দেয় আহসান।

লাশ বিছানার নিচে রেখে দুপুর ১২টার দিকে ‘দ্য গ্রোভ’ রেস্টুরেন্টে ডিউটিতে যায় আহসান ও তামিম। কাজ শেষে দু’জন একসাথে বাসায় ফে’রে। রাত একটার দিকে আলাউ’দ্দিনের নির্দেশে ড্রাইভার রহিম আলাউদ্দিনের নেওয়া মাইক্রোবাসটি চালিয়ে লাশ ফেলে দেওয়ার জন্য খিলক্ষেত উত্তরপাড়ায় আ’হসানের বাসায় যায়।

আহসান ও তামি’ম বিছানা, মশারি, বেডশীট ও পলিথিনে মোড়ানো মেহেদীর লাশটি মাইক্রোবাসে উঠিয়ে ড্রাইভার রহিমকে সায়েদাবাদে যেতে বলে। পথে তামিম নেমে’ যায়। আহসান মাইক্রো’তে লাশটি নিয়ে হাতিরঝিল এলাকায় প্রবেশ করে। হাতিরঝিল লেকের মেরুল-বাড্ডা প্রা’ন্তে লোকজনবিহীন ও অন্ধকার’চ্ছন্ন দেখে ড্রাইভার রহিম গাড়ি থামিয়ে দরজা খুলে দেয়। আহসান লাশটি গাড়ি থেকে পানিতে ফেলে দেয়।

গ্রেফতারকৃত আসামিদের কাছে তিনটি পাসপোর্ট, চ’ট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার জন্য ব্যবহৃত মেহেদীর বাস টিকিট জব্দ করা হয়েছে। পাশা’পাশি যে মাইক্রোবাসটি ব্যবহার করে মে’হেদীর লাশ হাতির’ঝিলে ফেলে দেওয়া হয়েছে, সেই মাইক্রোবাসটিও জব্দ করা হয়েছে।’

এ বিষ’য়ে তেজগাঁও ‘বিভাগের ‘উপ-পুলিশ কমিশনার মোহা’ম্মদ হারুন অর রশীদ বিপিএম (বার), পিপিএম (বার) জানান- ‘এটি একটি ক্লু-লেস হ’ত্যাকাণ্ড। ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে লাশের পরিচ’য় যাতে সনাক্ত করা না যায় সেজন্য’ হাতের’ আঙ্গুল বি’কৃতকরণের পাশাপাশি মুখমণ্ডলও বিকৃত ‘করে খুনিরা। যেখা’নে লাশ ফেলেছিল সেখান থেকে ৫০ মিটার দূরে পা’ওয়া একটি ছেড়া কাগজে লেখা একটি মো’বাইল নম্বরের সূত্র ধরে লাশের পরিচয় সনাক্তকরণের পা’শাপাশি হত্যাকাণ্ডে জড়ি’ত চারজন আসামিকে গ্রেফতার ও সব আলামত উদ্ধার ক’রতে সক্ষম হয়েছি আমরা। পুলিশি ত’দন্তের উৎকর্ষতার প্রমাণ এ’ই মামলাটি’।