বিদ্যুতের দাম না কমালে আদালতে যাবে ক্যাব

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৮, ২০১৮ | আপডেট: ৭:৩০:পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ৮, ২০১৮

ডেস্ক রিপোর্ট : আগামী ১০ দিনের মধ্যে বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির আদেশ বাতিল কিংবা দাম কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। নয়তো কমিশনের আদেশের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেবে সংগঠনটি, প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে যাবে। রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গতকাল রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ক্যাব এ ঘোষণা দেয়।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাবের ওপর গণশুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। এরপর ২৩ নভেম্বর বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেয়। গত ১ ডিসেম্বর থেকে তাদের ঘোষিত নতুন সেই মূল্য কার্যকর হয়েছে।

ক্যাবের গতকালের সংবাদ সম্মেলনে ৪ দফা বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়। এগুলো হলো এক. মূল্যবৃদ্ধির আদেশ বাতিল; দুই. ক্যাবের ১৫ দফা সুপারিশ বাস্তবায়ন; তিন. বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং বোর্ড সদস্য পদ থেকে বিদ্যৎ বিভাগের সাবেক ও বর্তমান সব কর্মকর্তাকে অবমুক্ত করা এবং চার. বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি অনুসন্ধানে ভোক্তা প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন ও অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ।

সংবাদ সম্মেলনে ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় গ্রাহক পর্যায়ে মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাবটি ন্যায্য ও যৌক্তিক হতে হয়। তা যদি না হয় অথবা ভোক্তার জন্য যদি মূল্যহার বৃদ্ধি অসহনীয় হয়, তবে মূল্যহার অপরিবর্তিত রাখার আদেশ হতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারকে ঘাটতি পূরণে ভর্তুকি বা অনুদান দিতে হয়। সরকারকে এই অনুদানের জন্য বিইআরসি থেকে প্রস্তাবও করা হয়নি। এমনকি বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি পূরণে সরকার অনুদান দেয় না, ঋণ দেয়। ঋণের বোঝা ভোক্তাদের ওপরই থাকে। সেটি সুদসহ বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, এমন ভর্তুকি-অনুদানে ভোক্তাদের আপত্তি রয়েছে। অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধির দায় ভোক্তারা নেবেন না। শুনানিতে প্রমাণিত হয়েছে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নয় বরং কমানো প্রয়োজন। সব মিলিয়ে বিদ্যুতের মূল্যহার বৃদ্ধির আদেশ গণশুনানিভিত্তিক নয় বরং অগ্রহণযোগ্য। এটি একান্তই বিইআরসির ইচ্ছামাফিক ও এখতিয়ারবহির্ভূত।

ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, দফায় দফায় বিদ্যুতের দামবৃদ্ধি হচ্ছে। এটি অযৌক্তিক এবং ভোক্তার স্বার্থবিরোধী। দামবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য-হিসাব উপেক্ষা করা হয়েছে। বিইআরসি গঠিত হয়েছে ভোক্তা ও উৎপাদকের স্বার্থরক্ষায়। কিন্তু এখন তারা ভোক্তার স্বার্থ দেখছে না। দামবৃদ্ধির আদেশ অগ্রহণযোগ্য। এটি আইনসম্মত ও ন্যায়সঙ্গত নয়। অবিলম্বে এটি বাতিল করা হোক এবং ক্যাবের প্রস্তাব অনুযায়ী দাম কমানো হোক। এ জন্য ৮-১০ দিন সময় দিলাম।

তিনি বলেন, ১০ দিনের মধ্যে দাম কমানো না হলে আইনি পদক্ষেপ নেব। প্রতিকার না পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথ থাকবে না। প্রয়োজনে উচ্চ আদালতে যেতে হবে।

এদিকে বিইআরসির চেয়ারম্যান ও সাবেক বিদ্যুৎ সচিব মনোয়ার ইসলাম বলেন, মূল্যবৃদ্ধির সমন্বয়ে বিদ্যুতের দাম শুধু বাড়েনি, কমেছেও। ৩০ লাখ গ্রাহকের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের দাম কমেছে এবং ৭০ লাখ গ্রাহকের ক্ষেত্রে দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। সব আইন-নিয়ম মেনে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। কোনো নিয়ম-হিসাব পাশ কাটানো হয়নি। এর পরও ক্যাব বা অন্য কেউ আদালতে গেলে আমরা আদালতেই এর জবাব দেব।

বিদ্যুৎ বিভাগ জানায়, বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা পৌনে তিন কোটি। বিইআরসি চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, পৌনে দুই কোটি গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল বেড়েছে।

বিদ্যুতের দামবৃদ্ধির ক্ষেত্রে উৎপাদন ও সঞ্চালন-ব্যয় বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের ব্যয়বৃদ্ধির বিবরণ দিয়ে ক্যাবের উপদেষ্টা স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার অসম ব্যবহারে ৩ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা, জ্বালানির দরপতন অসমন্বয়ে ২ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা, ভাড়া ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি পেমেন্টে ১ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা, পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যহার ঘাটতিতে ৩৩৩ কোটি টাকা, সেচ ও প্রান্তিক আবাসিক গ্রাহকদের নিকট লোকসানে বিদ্যুৎ বিক্রিতে ৩ হাজার ৪৬ কোটি টাকা, বিতরণের জনবল ও অবকাঠামোতে ১ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা অযৌক্তিকভাবে খরচ করা হয়েছে। মোট অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধি ১৩ হাজার ২২ কোটি টাকা। তিনি বলেন, ভুল নীতি ও দুর্নীতির কারণে হওয়া এই ব্যয়বৃদ্ধির পুরোটাই বহন করে ভোক্তারা। এই অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি দূর না করে বিদ্যুতের দামবৃদ্ধি প্রহসন নাকি প্রতারণা? এর বিচার চায় জনগণ। উৎপাদন ও বিতরণে কৃত্রিম ঘাটতি দেখিয়ে দামবৃদ্ধিতে আমাদের আপত্তি রয়েছে।

অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পাইকারি বিদ্যুতের রাজস্ব ঘাটতি ছিল ৫১০ কোটি টাকা। বিইআরসির আদেশে পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যহার গড়ে বাড়ানো না হলেও বিতরণ ইউটিলিটি ভেদে কমানো ও বাড়ানো হয়েছে। এতে করে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই ঘাটতি দাঁড়াবে ৩ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ-ব্যয় বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ এড়িয়ে বেশি দামের বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি পেমেন্ট অনেক বেশি হওয়া, জনবল ও উন্নয়ন-ব্যয় বেশি হওয়া এবং উৎপাদনে উদ্যোক্তা ও বিতরণের মধ্যে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা না হওয়ায় ব্যয় বাড়ে।

সূত্র : আমাদের সময়