কক্সবাজার এর কোথায় কি জেনে নিই

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৬:২৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৯ | আপডেট: ১০:৫৫:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৯

কক্সবাজার বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্হিত একটি পর্যটন শহর। এটি চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত। কক্সবাজার তার নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের জন্য বিখ্যাত। এখানে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক বালুময় সমুদ্র সৈকত, যার দৈর্ঘ্য ১২২ কি.মি পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের বৃহত্তম সামুদ্রিক মৎস্য বন্দর এবং সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশান। একসময় কক্সবাজার পানোয়া নামেও পরিচিত ছিল যার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে হলুদ ফুল। এর আরো একটি প্রাচীন নাম হচ্ছে পালঙ্কি।

ইতিহাস:

নবম শতাব্দীর গোড়ার দিক থেকে ১৬১৬ সালে মুঘল অধিগ্রহণের আগে পর্যন্ত কক্সবাজার-সহ চট্টগ্রামের একটি বড় অংশ আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। মুঘল সম্রাট শাহ সুজা পাহাড়ী রাস্তা ধরে আরাকান যাওয়ার পথে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন এবং এখানেই ক্যাম্প স্থাপনের আদেশ দেন। তার যাত্রাবহরের প্রায় একহাজার পালঙ্কী কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা নামের স্থানে অবস্থান নেয়। ডুলহাজারা অর্থ হাজার পালঙ্কী। মুঘলদের পরে ত্রিপুরা এবং আরকান তার পর পর্তুগিজ এবং ব্রিটিশরা এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়।

কক্সবাজার নামটি এসেছে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স নামে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক অফিসারের নাম থেকে। কক্সবাজারের আগের নাম ছিল পালংকি। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অধ্যাদেশ, ১৭৭৩ জারি হওয়ার পর ওয়ারেন্ট হোস্টিং বাঙলার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। তখন হিরাম কক্স পালংকির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। ক্যাপ্টেন কক্স আরাকান শরণার্থী এবং স্থানীয় রাখাইনদের মধ্যে বিদ্যমান হাজার বছরেরও পুরানো সংঘাত নিরসনের চেষ্টা করেন। এবং শরণার্থীদের পুণর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করেন কিন্তু কাজ পুরোপুরি শেষ করার আগেই মারা (১৭৯৯) যান। তার পূর্নবাসন অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এর নাম দেয়া হয় কক্স সাহেবের বাজার। কক্সবাজার থানা প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৫৪ সালে এবং পৌরসভা গঠিত হয় ১৮৬৯ সালে।

হিমছড়ি পিকনিক স্পট:

সমুদ্র সৈকতের পথ ধরে ১০-১২ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে হিমছড়ি পিকনিক স্পট। এখানকার ঝর্ণা, ঝাউবন, পাহাড় আর বনানীর সৌন্দর্য্য চিত্তাকর্ষক। কক্সবাজারের সন্নিকটেই বৌদ্ধ তীর্থস্থান রামু। এখানে রয়েছে অনেকগুলো মন্দির ও প্যাগোডা। ছড়িয়ে আছে বৌদ্ধ ধর্মের নানা নিদর্শন। রামু বুদ্ধের অনেক স্মৃতিকে সযত্নে ধারণ করেছে। এখানকার রাবার চাষ প্রকল্পটি দর্শনীয়। কক্সাবাজারের বিপরীতে বঙ্গোপসাগরের বুকে একটি আকর্ষণীয় দ্বীপের নাম সোনাদিয়া। এটি অতিথি পাখিদের স্বর্গরাজ্য। শীতকালে পৃথিবীর নানা স্থান থেকে উড়ে আসে অতিথি পাখিরা। ট্রলার কিংবা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সেখানে যেতে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। সোনাদিয়া দ্বীপের আয়তন ৪৬৩ কিলোমিটার। এখানে ঝিনুক মুক্তা আর শামুকের ছড়াছড়ি। সকালে গিয়ে বিকেলেই ফিরে আসা যায় কক্সবাজার।

মহেশখালী দ্বীপ:

কক্সবাজারের উত্তর-পশ্চিমে সমুদ্র মাঝে রয়েছে মহেশখালী দ্বীপ। কক্সবাজার শহরের কস্তরীঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ট্রলার, লঞ্চ ও স্পিড বোটে মহেশখালীতে যাওয়া যায়। এই দ্বীপের ছোট পাহাড় ও অরণ্যে পাখির কলকাকলি, বন্যপ্রাণীর বিচরণ আর পাহাড়ের চূড়ায় আদিনাথ মন্দিরের শোভা দেখে মুগ্ধ হতে হয়। মহেশখালীর প্রধান আকর্ষণ এই মন্দির বঙ্গোপসাগরের মোহনার সন্নিকটে একটি পাহাড়ের উপর অবস্থিত। কয়েকশ বছর আগে তৈরি এই মন্দিরে উঠতে ৬৯টি সিঁড়ি অতিক্রম করতে হয়। এটিকে শিব মন্দিরও বলা হয়। প্রতিবছর শিবরাত্রির পর মন্দিরকে কেন্দ্র করে মেলা বসে। এই মেলা সাত-আট দিন ধরে চলে। মহেশখালীর পাহাড় আর অরণ্যে রয়েছে নানা বন্য প্রাণী। পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে এই দ্বীপ। দ্বীপের জেলেপাড়ায় গেলে দেখা যাবে শুটকি মাছের প্রাচুর্য। মহেশখালী মিষ্টি পান ও সুপারীর জন্যও বিখ্যাত। সাগরপাড়ে রয়েছে অসংখ্য শামুক ও ঝিনুক। নিকটস্থ দোকানে বিক্রি হয় ঝিনুক ও শামুকের মালা।

সেকালে টেকনাফে নলকূপ ছিল না। কারণ টেকনাফের ভূগর্ভে রয়েছে পাথরের আস্তর। মাটি খুড়লেই পাথরের পর পাথর। একালেও তাই নলকূপের সংখ্যা অনেক কম। গোটা টেকনাফে ছিল তখন একটি মাত্র পাতকুয়া আর সেটি ছিল টেকনাফ থানার আঙ্গিনায়। লোকজন সেই পাতকুয়ার পানির উপরই নির্ভরশীল ছিল। এলাকার লোক সেই পাত কুয়া থেকেই পানি সংগ্রহ করতো।

প্রেমের স্বাক্ষর মাথিনের কুপ:

টেকনাফের বড় আকর্ষণ মাথিনের কুপ। মগ রাজকন্যা মাথিন আর পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজ ভট্টাচার্য্যের বিয়োগান্ত প্রেমের স্বাক্ষর হয়ে রয়েছে এই কূপ। ধীরাজ ভট্টাচার্যের সাথে মগরাজার অপূর্ব সুন্দরী কন্যার প্রেমের কাহিনী কোনো গল্প নয়, সত্যি ঘটনা। প্রতিদিন পড়ন্ত বিকেলে বান্ধবীদের নিয়ে কুপ থেকে পানি আনতে যেত সুন্দরী মাথিন। মুখে চন্দন। মাথায় খোঁপা। পরনে থাকত নানা রঙের থামি। গলায় থাকত মালা। এ সময়ে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন যশোরের সুদর্শন যুবক ধীরাজ ভট্টাচার্য। এক সময় ধীরাজ বাবু ও মাথিনের মধ্যে গড়ে উঠে ভালোবাসার সম্পর্ক। রাজকন্যা মাথিন মগসম্প্রদায়ভুক্ত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আর ধীরাজ ভট্টাচার্য হিন্দু সম্প্রদায়ের। সম্প্রদায়গত কারণে বাঁধা থাকলেও রাজা এ বিয়েতে রাজি হন। কিন্তু ধীরাজের বাবা ঘটনা জানতে পেরে ছেলেকে জরুরি চিঠি মারফত ডেকে পাঠান। ধীরাজ যেদিন কলকাতার উদ্দেশ্যে জাহাজে পাড়ি জমান সেদিন থেকে প্রেমিকা মাথিনের প্রতীক্ষা শুরু হয়। কিন্তু ধীরাজ আর ফিরলেন না। প্রেমিক হারানোর ব্যথায় রাজকুমারী খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়ে শয্যাশায়ী হলেন। মগরাজা তার একমাত্র কন্যাকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন। কিন্তু রাজপরিবারের লোকজন শত চেষ্টা করেও মাথিনের মুখে এক ফোটা পানি পর্যন্ত দিতে পারলেন না। মাথিনের অবস্থা যখন সঙ্কটাপন্ন তখন কলকাতা থেকে ধীরাজকে আনারও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। রাজকুমারী মাথিন অনাহারে থাকতে থাকতে এক সময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। লেখক ধীরাজ ভট্টাচার্যের যখন পুলিশ ছিলাম উপন্যাসে এই ঘটনার বিবরণ আছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশ কুয়াটির পাশে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করেছে।

কক্সবাজার বিমানবন্দর:

পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি উদ্যোগে নির্মিত অনেক হোটেল, বাংলাদেশ পর্যটন কেন্দ্র নির্মিত মোটেল ছাড়াও সৈকতের নিকটেই বিশটি পাঁচতারা হোটেল রয়েছে। এছাড়া এখানে পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে ঝিনুক মার্কেট। সীমান্তপথে মিয়ানমার (পূর্ব নাম – বার্মা), থাইল্যান্ড, চীন প্রভৃতি দেশ থেকে আসা বাহারি জিনিসপত্র নিয়ে গড়ে উঠেছে বার্মিজ মার্কেট।এখানে রয়েছে দেশের একমাত্র ফিস একুরিয়াম । আরো রয়েছে প্যারাসেলিং,ওয়াটার বাইকিং,বিচ বাইকিং,কক্স কার্নিভাল সার্কাস শো,দরিয়া নগর ইকোপার্ক, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিমির্ত অসংখ্য স্থাপত্য, ফিউচার পার্ক,শিশুপার্ক,এবং অসংখ্য ফোটোসুট স্পট।এখানে আরো আছে টেকনাফ জিওলজিক্যাল পার্ক।এখানে উপভোগের জন্য রয়েছে নাইট বিচ কনসার্ট ।সমুদ্র সৈকতকে লাইটিং এর মাধ্যমে আলোকিত করার ফলে এখানে রাতের বেলায় সমুদ্র উপভোগের সুযোগও রয়েছে।এখানে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিমির্ত হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সী-একুরিয়্যাম। ক্যাবল কার এবং ডিজনি ল্যান্ড।

কক্সবাজারে বিভিন্ন উপজাতি বা নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বাস করে যা শহরটিকে করেছে আরো বৈচিত্র্যময়। এইসব উপজাতিদের মধ্যে চাকমা সম্প্রদায় প্রধান। কক্সবাজার শহর ও এর অদূরে অবস্থিত রামুতে রয়েছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে বৌদ্ধ মন্দির। কক্সবাজার শহরে যে মন্দিরটি রয়েছে তাতে বেশ কিছু দুর্লভ বৌদ্ধ মূর্তি আছে। এই মন্দির ও মূর্তিগুলো পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণই বাংলাদেশের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর স্থান হিসেবে বিখ্যাত।

লাবণী পয়েন্ট:

কক্সবাজার শহর থেকে নৈকট্যের কারণে লাবণী পয়েন্ট কক্সবাজারের প্রধান সমুদ্র সৈকত বলে বিবেচনা করা হয়। নানারকম জিনিসের পসরা সাজিয়ে সৈকত সংলগ্ন এলাকায় আছে ছোট বড় অনেক দোকান যা পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ।

হিমছড়ি:

হিমছড়ি কক্সবাজারের ১২ কি.মি. দক্ষিণে অবস্থিত। ভঙ্গুর পাহাড় আর ঝর্ণা এখানকার প্রধান আকর্ষণ। কক্সবাজার থেকে হিমছড়ি যাওয়ার পথে বামদিকে সবুজঘেরা পাহাড় আর ডানদিকে সমুদ্রের নীল জলরাশি মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সৃষ্টি করে। বর্ষার সময়ে হিমছড়ির ঝর্ণাকে অনেক বেশি জীবন্ত ও প্রাণবন্ত বলে মনে হয়। হিমছড়িতে পাহাড়ের চূড়ায় একটি রিসোর্ট আছে যেখান থেকে সাগরের দৃশ্য অপার্থিব মনে হয়।অর্থাৎ এখান থেকে সম্পূর্ণ সমুদ্র এক নজরে দেখা যায়। হিমছড়ির প্রধান আকর্ষণ এখানকার ক্রিসমাস ট্রি। সম্প্রতি হিমছড়িতে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু পর্যটন কেন্দ্র ও পিকনিক স্পট।

ইনানী সমুদ্র সৈকত:
দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত ছাড়াও কক্সবাজারে সৈকত সংলগ্ন আরও অনেক দর্শনীয় এলাকা রয়েছে যা পর্যটকদের জন্য প্রধান আকর্ষণের বিষয়। সৈকত সংলগ্ন আকর্ষণীয় এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইনানী সমুদ্র সৈকত যা কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৮ কি.মি দক্ষিণে অবস্থিত। অভাবনীয় সৌন্দর্যে ভরপুর এই সমুদ্র সৈকতটি কক্সবাজার থেকে রাস্তায় মাত্র আধঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত। পরিষ্কার পানির জন্য জায়গাটি পর্যটকদের কাছে সমুদ্রস্নানের জন্য উৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট

Print Friendly, PDF & Email