৭১’র এই দিনে মুক্তিযুদ্ধে ঝালকাঠির প্রথম দুই শহীদ ইউনুছ মিয়া ও আবুল হোসেন

প্রকাশিত: ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ, মে ১৭, ২০১৯ | আপডেট: ১১:৪৭:পূর্বাহ্ণ, মে ১৭, ২০১৯

আজ ১৭ই মে। ১৯৭১সালের এই দিনে ঝালকাঠি জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম শহীদ হন সদর উপজেলা (তৎকালীন নলছিটি থানা)’র নথুল­¬াবাদ ইউনিয়নের বাড়ইআরা গ্রামের মেনাজ উদ্দিনের ৪র্থ পুত্র এনায়েত হোসেন (ইউনুছ মিয়া)। পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত ইউনুছ মিয়া যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন অবস্থান করছিলেন। পাক হানাদারদের রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আকস্মিক আক্রমনের সময়ে প্রাণে বেঁচে গিয়ে একটি ৩০৩ (থ্রী নট থ্রী) রাইফেল নিয়ে তিনি পালিয়ে এসেছিলেন নিজ গ্রামের বাড়ি তৎকালীন নলছিটি থানার বড়ইআরা গ্রামে। বিভিন্ন ঘোরা পথে অনেক বিপসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা থেকে বাড়ী আসতে তার সময় লেগেছিলো এক সপ্তাহ। বাড়িতে এসেই দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ ইউনুছ মিয়া নিজ এলাকায় হানাদার প্রতিরোধের চিন্তা ভাবনা করতে লাগলেন। এরই মধ্যে ভৈরব থানায় পুলিশে চাকুরীরত তার অপর এক সহোদর একটি রাইফেল ও সামন্য কিছু গুলি নিয়ে বাড়ীতে আসেন। ইউনুছ মিয়া ভাইকে নিয়ে এলাকার কিছু লোককে একত্রিত করে গোপনে ট্রেনিং’র ব্যাবস্থা করেন এবং গঠন করেন সক্রিয় একটি মুক্তিযোদ্ধা দল। যা তৎকালীন ঝালকাঠী ও নলছিটি এ দু’থানার মধ্যে সম্ভবত প্রথম মুক্তিযোদ্ধা দল।
ইতিমধ্যে হানাদারদের গঠিত তৎকালীন নলছিটি থানার তথাকথিত ‘শান্তি কমিটি’র চেয়ারম্যান আমীর গাজী ও থানার ওসি (এসআই) ইউসুফ আলী দু’জনের যোগসাজযে টালবাহানা করে ১১ই মে নলছিটির ১২ জন বিশিষ্ট ব্যাবসায়ীকে আটক করা হয়। তার একদিন পর ১২মে দিবাগত গভীর রাতে অর্থাৎ ১৩মে পুলিশ জল­¬¬াদ সিরাজ উদ্দিন (যিনি নলছিটি বন্দরে বালিয়ার বাপ নামে পরিচিত ছিলেন) আটককৃত ব্যাবসায়ীদের ‘তামাক পট্টী’ (বর্তমানে নলছিটি থানার খাল নামে পরিচিত) খালের মুখে জলা ভূমিতে জোড়া বেধে দাঁড় করিয়ে পিছন দিক থেকে গুলী করে মৃত্যু নিশ্চিত করে ফেলে রেখে যায়। ওই হতভাগ্য ১২ ব্যাবসায়ী হলেন- কৃ. মোহন নন্দী, শ্যামাকান্ত রায়, দশরথ কুন্ড, ভাষান পেদ্দার, সুকুমার বনিক (ছাত্র ছিলেন), হরিপদ রায়, কার্তিক ব্যানার্জি, অতুল চন্দ্র কুড়ি, নেপাল চন্দ্র কুড়ি, অনিল দে, কালিপদ বনিক ও ক্ষিতীশ চন্দ্র দত্ত। কিন্তু ‘রাখে আল­¬াহ মারে কে’ সেদিন এ কথার প্রমান পেয়েছেন ঐ ১২ জনের মধ্য থেকে ৩ জন ব্যাবসায়ী। ঐ নষ্ঠুর কালো রিাত্রিতে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান কালিপদ বনিক, বাম কাধে সামন্য আঘাত নিয়ে অনিল চন্দ্র দে ও পিঠ থেকে গুলি ঢুকে বুক ফুঁড়ে বের হয়ে যাওয়া অবস্থায় ক্ষিতীশ চন্দ্র দত্ত। এরা পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন।
অপরদিকে বাড়ইআরা গ্রামের তথাকতিথ শান্তি কমিটির লোকের গোপন খবরে ১৫মে রাজাকার ও নলছিটি থানা পুলিশের লোকরা ইউনুছ মিয়ার ক্যাম্প ও বাড়ীতে হামলা চালায়। তাকে না পেয়ে হানাদাররা তার বড় ভাইয়ের স্ত্রী ও এক পুত্রকে ধরে নিয়ে থানার দিকে যাওয়ার পথে ইউনুছ মিয়া জানতে পেরে প্রতি হামলা চালিয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনার পর ১৭মে গভীর রাতে ইউনুস মিয়া তার মুক্তিযোদ্ধা দল নিয়ে নলছিটি থানা আক্রমন করেন। তার সহোযোদ্ধা ছিলেন তারই সহোদর ৩ ভাই, দপদপিয়ার আঃ মান্নান হাওলাদার, কর্ণকাঠীর আবুল হোসেন, বড় প্রমহরের মফিজুর রহমান প্রমুখ। যুদ্ধ চলাকালীন রাত শেষ হয়ে যাওয়ায় পিছু হটতে বাধ্য হন মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু দলের অন্য সবাই চলে যেতে সক্ষম হলেও ওই দিন সেখানেই শহীদ হন ইউনুছ মিয়া। আক্রমনের প্রাককালে সহোদর ইসরাইল হোসেন সহ দু’ভাই ওঁৎ পেতে ছিলেন থানা ভবনের পাশের তৎকালীন নলছিটির তহশীল অফিসের সামনে খেজুর গাছের আড়ালে। হঠাৎ থানা ভবনের ভিতর থেকে গুলি এসে লাগে ইউনুছ মিয়ার মাথায়। রাত্রি শেষ হলো। নিভে গেল ইউনুছ মিয়ার জীবনের আলো।
সহযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যেদিক পারলো পালিয়ে যেতে থাকলো। কিন্তু দিনের আলো স্পষ্ট হওয়ায় এবং চারিদিক শত্র“ ঘেরা হওয়ায় ইউনুছ মিয়ার লাশটি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারলো না তারা। এরই কিছুক্ষন পরে ইউনুছ মিয়ার সহোযোদ্ধা কর্ণকাঠীর বিএ পাশ সুঠাম সুন্দর যুবক আবুল হোসেন আহত অবস্থায় নলছিটি থেকে দপদপিয়ার দিকে যাবার সময়ে পথিমধ্যে ধরা পড়েন হানাদার বাহিনীর সহযোগীতা কারীদের হাতে। এরপর তাকে তুলে দেয়া হয় পাঞ্জাবী সৈন্যদের গানবোটে। গানবোটটি তৎকালীন জেলা সদর বরিশাল যাবার পথে পাঞ্জাবী সৈন্যরা নলছিটি থানাধীন দপদপিয়ায় সুগন্ধাÑকীর্ত্তনখোলার মোহনার মিলিত স্রোতে গুলি করে ফেলে দেয় মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনকে। দ্রুত শহীদ কাফেলায় নাম লেখা হয়ে যায় আবুল হোসেন’রও। ঝালকাঠির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অবদানের সাথে প্রথমেই স্মরনীয় হয়ে সোনালী হরফে নাম লেখা হয়ে রইলো প্রথম দুই শহীদ ইউনুছ মিয়া আর আবুল হোসেন’র ।

[sharethis-inline-buttons]