বিশ্বের সকল মুসলিমদের হৃদয় জয় করেছেন জাসিন্দা

নাজমুল হক নাজমুল হক

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৩, ২০১৯ | আপডেট: ১২:২৪:পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৩, ২০১৯

নাজমুল হক, মাদারীপুর
01772327799

দিনের শুরুটা ছিল আর পাঁচটা দিনের মতোই। সপ্তাহান্তের ছুটির দিনের আগে ক্রাইস্টচার্চের বাসিন্দারা নিচ্ছিলেন ছুটি কাটানোর প্রস্তুতি। কিন্তু দিনের শেষটা হলো রক্তের সোঁদা গন্ধে। শহরে এখন ভয়ের রাজত্ব। রাতটা নিশ্চয়ই নির্ঘুম কাটবে ক্রাইস্টচার্চের, সঙ্গী থাকবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

শান্তির সূচকে বিশ্বজুড়ে সুনাম নিউজিল্যান্ডের। ২০১৮ সালে শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে দেশটি। এমন একটি দেশেই শুক্রবার দুপুরে এক মসজিদে হলো নারকীয় সন্ত্রাসী হামলা। নিহত ব্যক্তির সংখ্যা এখন পর্যন্ত ৪৯, আহত ৪৮। এর মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশিও রয়েছেন। হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আছেন অনেকে।

এদিকে নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চে আল-নুরসহ দু’টি মসজিদে ঢুকে ভয়াবহ হামলার পর প্রথমবারের মতো সরাসরি টিভি সম্প্রচারের মধ্যে দিয়ে শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করল মুসলমান নারী ও পুরুষ। সেই সাথে ২ মিনিট নিরবতাও পালন করা হয় দেশব্যাপী। নামাজে ইমামের আবেগময়ী বক্তব্যে মুখরিত হয় লাখো মানুষ। এদিকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আরডার্নসহ হাজার হাজার মানুষ সংহতি প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আহডার্ন এতো যোগ দেন।

আল-নূর মসজিদের ইমাম গামাল ফৌদা জুমার খুতবায় কাঁদতে কাঁদতে বলেছেন, আমাদের হৃদয় ভেঙ্গেছে, কিন্তু আমরা ভেঙ্গে পড়িনি। আমরা বেঁচে আছি, আমরা একসঙ্গে আছি, কেউ যেন আমাদের বিভক্ত করতে না পারে সেজন্য আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

রেডিও-টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা জুমার নামাজের খুতবায় তিনি আরো বলেন, নিহতদের পরিবারগুলোকে বলছি, আপনাদের প্রিয়জনদের মৃত্যু বৃথা যায়নি। তাদের রক্ত আশার বীজে জল সিঞ্চন করেছে।

প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তি অস্ট্রেলীয় নাগরিক এবং হামলার শিকার হতাহত ব্যক্তিরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা। যাদের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিশর, জর্ডান এবং সোমালিয়া আছে।

তাই যখন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্ন ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর বিবৃতি প্রদানের জন্য হাজির হলেন, তখন শুধু নিউজিল্যান্ডই তার বক্তব্য শুনতে উদগ্রীব ছিল তেমন নয়। সারা বিশ্বের মনোযোগ ছিল সেদিকে। অতি দ্রুত এবং স্পষ্টভাবে এই বন্দুক হামলাকে তিনি “সন্ত্রাসী হামলা” বলে বর্ণনা করেন।

বহু মানুষ মনে করেন যে, শ্বেতাঙ্গ কোনও ব্যক্তির দ্বারা এ ধরনের হামলার ক্ষেত্রে (এমনকি সেটা যদি রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রভাবেও হয়ে থাকে) কর্তৃপক্ষ এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে অনীহা বা অনিচ্ছুক মনোভাবের পরিচয় দিয়ে থাকেন।

কিন্তু মিজ আরডের্ন এর দ্বারা দ্রুত, স্পষ্টভাষায় এই ‘সন্ত্রাসী হামলা’ বলে বক্তব্য দেয়ার মাধ্যমে সে বিষয়ে তার সচেতনতা এবং বিবেচনার বিষয়টি উঠে আসে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের শোক এবং ভীতির প্রতি তার স্বীকৃতিও সেখানেই ফুরিয়ে যায়নি।

ক্রাইস্টচার্চে ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর স্বজনদের জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানান তিনি। সেসময় মাথায় কালো রং এর স্কার্ফ পরেন তিনি যা তাদের প্রতি শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ। তিনি মানুষকে একতার বন্ধনে বেঁধেছেন এবং বলেছেন, “তারা আমাদের”।

এর কয়েকদিন পরে প্রথমবারের মত পার্লামেন্টে ভাষণ দিয়েছেন তিনি , সেখানে তিনি সংক্ষিপ্ত কিন্তু দৃঢ় ভাষায় বক্তব্য রাখেন যেখানে ইসলামী কায়দায় সবাইকে সম্ভাষণ জানান – “আসসালামু আলাইকুম” বলে।

জানান ক্রাইস্টচার্চের ঘটনায় অভিযুক্তের নামও তিনি কখনো মুখে আনবেন না৷ এরই মধ্যে অস্ত্র আইন পরিবর্তন করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। এছাড়া দুই ধরনের অস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ঘটনার এক সপ্তাহ পর নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে জুমার নামাজের আগে আয়োজন করা হয় মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণসভা। আল-নুর মসজিদের বিপরীত দিকের হ্যাগলে পার্কের এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী নিজেও। সেখানে জুমার নামাজ শুরুর আগে নিহতদের স্মরণে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

এরপর জুমার খুতবা শুরুর আগে জনসাধারণের উদ্দেশে ভাষণ দেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন। এ সময় তিনি বলেন, ‘তোমাদের সঙ্গে আজ পুরো নিউজিল্যান্ড কাঁদছে। আমরা সবাই আজ এক।’

এদিকে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডের্নের প্রথম বক্তব্যের সূত্র ধরে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের পর্যবেক্ষকরা তার নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন।

ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানে সুজানে মুর লিখেছেন “মার্টিন লুথার কিং বলেছেন সত্যিকারের নেতারা ঐক্য খোঁজে না তারাই ঐক্য তৈরি করে, আরডের্ন ভিন্ন ধরনের ঐক্য তৈরি, কর্ম, অভিভাবকত্ব ও একতার প্রদর্শন করেছেন।”

“সন্ত্রাসবাদ মানুষের মাঝে ভিন্নতাকে দেখে এবং বিনাশ ঘটায়। আরডের্ন ভিন্নতা দেখেছেন এবং তাকে সম্মান করতে চাইছেন, তাকে আলিঙ্গন করছেন এবং তার সাথে যুক্ত হতে চাইছেন।”

ওয়াশিংটন পোস্টের ঈশান থারুর লিখেছেন যে, “আরডের্ন তার জাতির শোক এবং দুঃখ এবং তা নিরসনের প্রতিমুর্তি হয়ে উঠেছেন।”

এবিসি অস্ট্রেলিয়া ওয়েবসাইটে অ্যানাবেল ক্র্যাব লেখেন, “একজন নেতার জন্য ভয়াবহ বাজে খবরের মুখোমুখি হওয়ার পর… মিজ আরডের্ন এখনো পর্যন্ত কোনও ভুল পদক্ষেপ নেননি।”

গ্রেস ব্যাক এক বাক্যে ম্যারি ক্লেয়ার অস্ট্রেলিয়াতে যেটা লিখেছেন: “একজন নেতা এমনই হয়ে থাকেন”।

এই ধরনের প্রশংসা বাখ্যা কেবল বিশ্লেষকদের কাছ থেকেই আসছে তেমনটি নয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মোহাম্মদ ফয়সাল বলেছেন, মিজ আরডের্ন পাকিস্তানিদের ‘হৃদয় জয়’ করেছেন।

মার্টিন লুথার কিং এর স্মৃতি সংরক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত মার্টিন কিং সেন্টার টুইটারে লিখেছে- “নিউজিল্যান্ডে একজন নেতার ভালবাসার পূর্ণাঙ্গ প্রদর্শনী”। তার কথা আলোড়িত করেছে নিউজিল্যান্ডের শোকাহত পরিবারের মানুষদের।

নিউজিল্যান্ডে বিবিসির সংবাদদাতা হিউয়েল গ্রিফিথ বলছেন, “মিজ আরডের্ন এর বক্তব্য-‘আমরা এক, তারা আমাদের’ ক্রাইস্টচার্চের হতাহত পরিবারের মানুষদের মুখ থেকে শুনেছি।” এমনকি বিরোধী ন্যাশনাল পার্টির জুডিথ কলিন্স প্রধানমন্ত্রী “অসাধারণ” বলে পার্লামেন্টে উল্লেখ করেছেন।

[sharethis-inline-buttons]