ঝালকাঠিতে পুলিশ নির্যাতনে ইউপি সদস্য হত্যা মামলার তদন্তে বরিশাল রেঞ্জ এসপি

প্রকাশিত: ৩:৪১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৮ | আপডেট: ৩:৪১:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৭, ২০১৮

ঝালকাঠিতে ঘুষের দাবিতে এক ইউপি সদস্যকে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগে দায়ের কৃত মামলার তদন্তে সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন বরিশাল রেঞ্জ পুলিশ সুপার (এসপি) মোঃ হাবিবুর রহমান। শনিবার সকাল ১১ টায় শহরের আড়দ্দার পট্টিস্থ ন্যাশনাল ব্যাংক কার্যালয়ের সামনে স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে তিনি তদন্ত করেন। এসময় ঝালকাঠির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) এমএম মাহমুদ হাসান, সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু তাহের মিয়া উপস্থিত ছিলেন। ইকবাল হোসেনসহ প্রত্যক্ষদর্শীদের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
ঝালকাঠি সদর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে (১৪ অক্টোবর রোববার দুপুরে) সদর উপজেলার লেশপ্রতাপ গ্রামের নিহত ইউপি সদস্য খলিলুর রহমান মন্টুর স্ত্রী নাজমা বেগম বাদী হয়ে ঝালকাঠির জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতে এ মামলা করেন। আদালতের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ মো. ইষতিয়ারুল ইসলাম মলি­ক দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরিশালের উপ-পরিচালককে মামলাটি তদন্ত করে আগামী ২৬ নভেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। মামলায় এসআই দেলোয়ার ছাড়াও অপর সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন- সদর উপজেলার বারইগাতি গ্রামের আব্বাস তালুকদার, ইছাহাক তালুকদার, সামসুল হক তালুকদার, ইয়াসিন তালুকদার, সুলতান তালুকদার, আবদুর রহিম ওরফে রাসেল ও নূরুল হক।
মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, ইউপি সদস্য ও ৯ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি খলিলুর রহমান মন্টুর বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজির মামলা করেন বাসন্ডা ইউনিয়নের লেশপ্রতাপ গ্রামের এক ব্যবসায়ী। মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়ার কথা বলে এসআই দেলোয়ার হোসেন ইউপি সদস্য মন্টুর কাছে এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। মন্টু ২৫ হাজার টাকা এসআই দেলোয়ারকে দেন। বাকি ৭৫ হাজার টাকার জন্য মন্টুকে চাপ দেন তিনি। কিন্তু টাকা দিতে না পারায় মন্টুকে গ্রেফতারের ভয় দেখানো হয়। মামলার বাদীর কাছ থেকে বড় অংকের টাকা নেয়ার খবর পেয়ে মন্টু এসআই দেলোয়ারকে ঘুষ দেয়া ২৫ হাজার টাকা ফেরত চাইলে ক্ষিপ্ত হন দেলোয়ার। মন্টুকে ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে শহরের তরকারি পট্টির ভাড়া বাসায় দেখা করতে বলেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। মন্টু ওই বাসায় গেলে এসআই দেলোয়ার তাকে ঘরের ভেতর আটকে নির্যাতন করেন। এতে মন্টুর একটি পা ভেঙে যায় এবং মাথা ও বুকে গুরুতর আঘাত লাগে। পা ভাঙা অবস্থায়ই মন্টুকে গ্রেফতার করে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন এসআই দেলোয়ার। সপ্তাহ খানেক পরে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয় মন্টুকে। কারাগার থেকে গুরুতর অবস্থায় মন্টুকে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কারা শাখায় ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর মন্টুর নাম কাটিয়ে ঝালকাঠি কারাগারে নিয়ে আসেন এসআই দেলোয়ার। কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে মন্টুকে ২৯ সেপ্টেম্বর আবারও বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কারা শাখায় ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৩ অক্টোবর রাতে মন্টুর মৃত্যু হয়।
মামলার বাদী নিহতের স্ত্রী নাজমা বেগম অভিযোগ করেন, আমার স্বামীকে একটি মিথ্যা মামলায় গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে এসআই দেলোয়ার হোসেন এক লাখ টাকা দাবি করে ২৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। এরপরও এসআই দেলোয়ার বাকি টাকার জন্য আমার স্বামীকে তার তরকারি পট্টির ভাড়া বাসায় ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে পা ভেঙে হাসপাতালে ভর্তি করান। মিথ্যা মামলায় ঘুষের টাকা নিয়েও স্বামীকে নির্যাতনে হত্যা এবং সন্তানদের এতিম করার জন্য এসআই দেলোয়ারের বিচার দাবি করেন নিহতের স্ত্রী। বাদীর আইনজীবী আবদুর রশীদ সিকদার বলেন, ঘুষের দাবিতে মন্টুকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের কারণে মন্টুর মৃত্যু হয়েছে। ঘুষ নেয়া এবং দাবি করায় দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের (৫)২ ধারা এবং দন্ডবিধির ১০৯/১১৪/১৬১/৩০২/৩৪ ধারায় মামলা করা হয়েছে। এসআই দেলোয়ারের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগও আনা হয়েছে। এ কাজে তাকে যারা সহযোগিতা এবং প্ররোচনা দিয়েছেন তাদেরকেও আসামি করা হয়েছে।
ঝালকাঠি সদর থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) দেলোয়ার হোসেন বলেন,‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নিহত ইউপি সদস্য খলিলুর রহমান মন্টুর বিরুদ্ধে একটি চাঁদাবাজির মামলা থাকায় তাকে গ্রেফতার করতে গেলে শহরের আড়দ্দার পট্টিস্থ ন্যাশনাল ব্যাংকের সামনে রিকশা থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পা ভেঙে যায়। তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে মারা যায় খলিলুর রহমান’।