স্থূলতার ব্যাপকতা বাড়ছে ঢাকার শিশুদের

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০১৮ | আপডেট: ১০:১৪:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১২, ২০১৮
স্থূলতার ব্যাপকতা বাড়ছে ঢাকার শিশুদের

ধানমন্ডির একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী কাজী ওমর। ফার্মগেটে ওমরদের বাড়ির পাশে খেলার মতো খোলা জায়গা অনুপস্থিত। খেলার সুযোগ নেই ছয়তলা ভবনের স্কুলটিতেও। বাইরের খেলা বলতে ক্রীড়া শিক্ষকের সঙ্গে সপ্তাহে একদিন ৪৫ মিনিট সময় কাটানো। বাকি সময় কাটে বাসায় কম্পিউটার আর মোবাইলে গেমস খেলে। কাজী ওমরের বয়স এখনো ১৪ ছোঁয়নি। কিন্তু ওজন হয়ে গেছে ৯০ কেজি। ওজন কমাতে এখন স্কুল শেষে নিয়ম করে ব্যায়ামাগারে যেতে হয় তাকে।

ফাহিম আহমেদের ফুটবল খেলার শখ। বাসার আশপাশে ও স্কুলে মাঠ না থাকায় তা খেলা হয় না। গেমস ক্লাসের অংশ হিসেবে সপ্তাহে একদিন ফুটবল খেলার সুযোগ হয় শুধু। স্কুল থেকে ফিরে বাকি সময় কাটে মোবাইলে। বয়সের তুলনায় ওজন বেড়ে গেছে ১৩ বছরের ফাহিমের। চোখে উঠেছে পুরু লেন্সের চশমা।

রাজধানীর বেশ কয়েকটি স্কুল ঘুরে দেখা গেছে, বহুতল ভবনের স্কুলগুলোয় খেলার মাঠ নেই। ইংরেজি মাধ্যমের একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া ২৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে অন্তত পাঁচজনকে দেখা যায় স্থূল। পাঁচজনের চোখে মোটা লেন্সের চশমা। স্থূল শিশু দেখা যায় অন্যান্য স্কুলেও।

মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটে গত বছরের শেষদিকে প্রকাশিত এক গবেষণায়ও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে স্থূলতার হার বাড়ছে। ১৯৭৫ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) হিসাব করে গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ছেলেশিশুদের মধ্যে স্থূলতার হার ছিল ৩ শতাংশ। ১৯৭৫ সালে যেখানে মাত্র দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ ছেলেশিশু ছিল স্থূল। আর মেয়েশিশুদের মধ্যে স্থূলতার হার ছিল ২০১৬ সালে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। যদিও চার দশক আগে মেয়েশিশুদের মধ্যে স্থূলতার হার ছিল শূন্যের কাছাকাছি।

স্থূলতার এ ব্যাপকতা শহরে, বিশেষ করে ঢাকার শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। চলতি বছর প্রকাশিত এক গবেষণার ফল বলছে, ঢাকার প্রায় ১১ শতাংশ শিশু স্থূল আর অতি ওজনের ১৩ শতাংশ। ঢাকার প্রাইমারি স্কুলগামী ৫০৪ শিশুর ওপর জরিপ চালিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) আট গবেষক। গত জুলাইয়ে এটি প্রকাশ করা হয়েছে।

ঢাকার শিশুদের মধ্যে স্থূলতার হার বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে খোলা জায়গায় খেলার সুযোগের অভাবকে বড় করে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, শিশুরা খেলাধুলা না করে শুধু বসে বসে কম্পিউটারে গেমস খেললে বা টেলিভিশন দেখলে স্থূলতা বেড়ে যায়, যাকে ‘কাউস পটেটো’ বলা হয়। বিশ্বব্যাপীই এ সমস্যা বাড়ছে। এ কারণে একটি শিশুকে কখনই সারাদিনে ১-২ ঘণ্টার বেশি কম্পিউটারের সামনে বসতে দেয়া উচিত নয়। তাকে খেলার মাঠে নিয়ে যাওয়া উচিত শারীরিক শ্রম, উচ্ছ্বাস ও মানসিক বিকাশের জন্য। একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাইলে খেলার মাঠ অপরিহার্য।

গত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক স্কুল ঘুরে কোনো খেলার মাঠ দেখা যায়নি। এমন স্কুলগুলোর একটি ধানমন্ডির কার্ডিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল। স্কুলটির প্রিন্সিপ্যাল সেবা তাসমিন হক বণিক বার্তাকে বলেন, এখনকার বেশির ভাগ স্কুল আবাসিক ভবনে গড়ে উঠছে। শিশুদের খেলার মাঠ নেই। খেলার সুযোগ না পেয়ে কম্পিউটারে আসক্ত হয়ে শিশুরা স্থূল হয়ে পড়ছে। তাদের নানা ধরনের রোগ দেখা দিচ্ছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা টুর্নামেন্টের জন্য অস্থির হয়ে থাকে। তাদের খেলার আগ্রহ আছে, কিন্তু সুযোগ নেই। পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, আবার যা আছে তা দখলে কিংবা নিরাপত্তার সমস্যা আছে। শিশুরা খেলাধুলা না করার কারণে কী বিপদ হতে পারে, তা এখন বোঝা না গেলেও ভবিষ্যতে সমাজে এর প্রভাব পড়বে।

খেলার মাঠ নেই রাজধানীর সরকারি অনেক স্কুলেও। মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের সি ব্লকে সড়কের ওপরই অবস্থিত সরকারি আইডিয়াল প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাঁচতলা ভবনটিতে আটটি শ্রেণীকক্ষ। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৩০০ হলেও কোনো মাঠ নেই। টিফিনের সময় ব্যস্ত সড়কের ওপরই খেলাধুলা করে শিক্ষার্থীরা। বাড়িতে গিয়ে সময় কাটে কম্পিউটার আর মোবাইলে গেমস খেলে।

খোলা জায়গার অভাবে শিশুদের খেলতে না পারার বিষয়টি উঠে এসেছে সেভ দ্য চিলড্রেনের এক প্রতিবেদনেও। গত মে মাসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি দেখিয়েছে, খোলা জায়গার অভাবে খেলতে পারে না ৩৬ শতাংশ শিশু। পড়াশোনার চাপের কারণে ফুটবল, ক্রিকেটের মতো খেলা থেকে দূরে থাকতে হয় প্রায় ৪৭ শতাংশ শিশুকে। আর ১২ শতাংশ শিশু নিরাপত্তার অভাবে বাইরে খেলার সুযোগ পায় না। খোলা জায়গার অভাবে ভিডিও গেমস বা কম্পিউটারে গেমস খেলে সময় কাটে রাজধানীর ৪৯ শতাংশ শিশুর। ১৭ শতাংশ শিশু বাসায় ধাঁধা খেলে।

গবেষক দলের প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালমা আক্তার বণিক বার্তাকে বলেন, গবেষণায় অংশ নেয়া অধিকাংশ শিশু বলছে, তাদের বাসার আশপাশে খোলা জায়গা মানে মাঠ, পার্ক নেই। বাইরে খেলতে না পারার কারণে তাদের মধ্যে কম্পিউটার বা মোবাইলের প্রতি আসক্তি বাড়ছে। তাদের সামাজিকীকরণ হচ্ছে না। এছাড়া ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনে অনেক অভিভাবক, শিক্ষক জানিয়েছেন, যথেষ্ট খেলাধুলা না করার কারণে শিশুদের মুটিয়ে যাওয়া ও চোখের সমস্যা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শারীরিক পরিশ্রম না করে ভিডিও গেমস খেলা শিশুদের শরীরে দৈনিক অতিরিক্ত ১৬৩ কিলোক্যালরি উদ্বৃত্ত থাকে, যা শিশুদের স্থূলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

স্থূলতা নিয়ে বেড়ে ওঠা এ শিশুরা পরবর্তী সময়ে নানা সমস্যায় ভোগে বলে জানান ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল আজিজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, খেলার সুযোগ না পেলে শিশুর দৈহিক গঠন ঠিকমতো হয় না। শিশুর শরীর স্বাভাবিকভাবে ফ্যাটি হয়ে যায় ও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়। যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবেশের সঙ্গে তারা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। দীর্ঘ পরিশ্রমের কোনো কাজও করতে পারে না। দৈহিক গঠনের পাশাপাশি তাদের মনের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়।

গবেষণায়ও দেখা গেছে, যেসব শিশু ছোটবেলায় স্থূল থাকে, ৪০ বছর বয়স পার হলেই হূদরোগ, কিডনির সমস্যাসহ নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয় তাদের।

স্থূলতার কারণে ডায়াবেটিসেও আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। ২০১৬ সালে দেশের টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোতে শিশু-কিশোরদের মধ্যে টাইপ টু ডায়াবেটিসের হার দেখতে পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, টাইপ টু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত শিশুদের ৫৮ শতাংশ স্থূল।

কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. লেলিন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, শৈশব হচ্ছে মানুষের বিকাশমান সময়। এ সময় তার মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক বিকাশ ঘটে। বিকাশের জন্য প্রয়োজন খেলাধুলা ও বিনোদন। খেলার মাঠে খেললে শিশুর রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়, পেশির বিকাশ অর্থাৎ বেড়ে ওঠা যথাযথ হয়। স্বাভাবিক মানসিক বিকাশও ঘটে।

এসব বিবেচনায় ঢাকা শহরের শিশুদের খেলার অধিকার নিশ্চিত করতে স্কুলের অবকাঠামো শিশুবান্ধব হওয়া দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নগর কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে যথাযথ ভূমিকা রয়েছে বলে জানান তারা।

ঢাকায় শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খোলা জায়গা নেই স্বীকার করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) খান মোহাম্মদ বিলাল। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, শিশুদের খেলার জায়গা নেই, এটি সত্য। যতটুকু খেলার জায়গা আছে, তারও সদ্ব্যবহার হচ্ছে না পরিবেশ ও নিরাপত্তার কারণে। দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৩১টি খেলার মাঠ ও পার্ক আছে। সেগুলোর উন্নয়নকাজ চলছে। আগামী জুলাই নাগাদ মাঠ ও পার্কগুলোর উন্নয়নকাজ শেষ হবে। সেখানে শিশু, বয়স্ক সবার জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। সেটি হয়ে গেলে যে চাহিদা আছে, তা অনেকাংশে পূরণ হবে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কিছু প্রকল্পও বাস্তবায়নের পথে আছে।