ভাঙনে বিপর্যস্ত কুয়াকাটা সৈকত

প্রকাশিত: ৪:২৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০১৮ | আপডেট: ৪:২৩:অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০১৮
ভাঙনে বিপর্যস্ত কুয়াকাটা সৈকত

উত্তাল সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে সৈকতে। আর সে ঢেউয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা কুয়াকাটা সৈকত লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে। অব্যাহত ভাঙন আর বালুর ক্ষয়ে শ্রী-হীন হয়ে পড়েছে গোটা সৈকত। আর সৈকত রক্ষার উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ায় দেখা দিয়েছে শঙ্কা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে কুয়াকাটা জিরোপয়েন্ট থেকে পিচঢালা সড়ক ধরে সমুদ্র সৈকতের দিকে চলতেই চোখে পড়ে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ প্রচণ্ড শব্দে আছড়ে পড়ছে। যে দৃশ্য দূর থেকে যে কারো মনকে পুলকিত করে তুলবে। তবে সৈকতের কাছে গেলে ভাঙনের দৃশ্য দেখে হৃদয়ও ভেঙে যাবে।

সমুদ্রের ভাঙনে এরইমধ্যে ১০ ফুট পিচঢালাইয়ের রাস্তা বিলীন হয়ে গেছে। সৈকতের পূর্ব দিকে থাকা শতবর্ষী নারিকেল, মেহগনি, তাল গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির অর্ধশত গাছ উপড়ে পড়ে আছে। আবার কিছু গাছের গোড়া থেকে বালু সরে গিয়ে শিকড়-বাকর বের হয়ে আছে। সে গাছগুলো যেকোনো মুহূর্তে উপড়ে পড়তে পারে।

সৈকত ঘেঁষে অবস্থিত শতবর্ষী ফয়েজ মিয়ার নারিকেল বাগানের কাঠের ঘরসহ বহু স্থাপনা ধ্বংস ও বিলীন হয়েছে আগেই। ঝাউ বাগানেও সারি সারি গাছ পড়ে আছে সৈকতে।

সৈকতের পশ্চিম দিকে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা পাবলিক টয়লেটটি ঢেউয়ের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেটি রক্ষায় বালুর বস্তা দিয়েও কিছু করতে পারেনি কুয়াকাটা পৌর কর্তৃপক্ষ।

সৈকতের মাঝি বাড়ি পয়েন্টে বেড়িবাঁধের কিছু অংশ সমুদ্রের ঢেউয়ের তাণ্ডবে বিলীন হয়ে গেছে। সৈকত সংলগ্ন আবাসিক হোটেল কিংস এর ভবনটি সমুদ্রের ভাঙনে বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

হোটেল মালিক মো. মোস্তাফিজুর রহমান সুমন জানান, ৩০ শতাংশ জমি থেকে সমুদ্রের ভাঙনে গত বছর টিকেছিল ১৪ শতাংশ। আর এ বছরের ভাঙনে হোটেল ভবনসহ অধিকাংশ জমিই সমুদ্রের ঢেউয়ের তাণ্ডবে বিলিন হয়ে গেছে। বর্তমানে আছে মাত্র পাঁচ শতাংশ জমি। এখন আমি সর্বশান্ত।

পর্যটক বেলায়েত হোসেন জানান, কুয়াকাটা সৈকতের ঝাউ বাগান, নারিকেল বাগান এবং পশ্চিম দিকের লেম্পুচরের ম্যানগ্রোভ বনের বিভিন্ন প্রজাতির গাছ-গাছালি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কয়েকগুণ বাড়িয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এসব জায়গার বিধ্বস্ততার অবস্থা দেখে পুরোই হতাশ।

এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কুয়াকাটা সৈকত রক্ষা ও উন্নয়ন প্রকল্প তৈরি করে ২০১৭ সালের শেষের দিকে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশল কার্যালয় থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠায়। সেখান থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। যা অনুমোদন শেষে এ বছর প্রকল্পের কাজ শুরুর সম্ভাবনা ছিল। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে এ প্রকল্পের বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২১২ কোটি টাকা। প্রকল্পে গ্রীন সি ওয়ালের পাশাপাশি উত্তাল ঢেউয়ের তাণ্ডব ঠেকাতে নির্দিষ্ট অ্যালাইনমেন্ট বরাবর জিও টিউব বসানোর কথা ছিল। যার ফলে পলি জমে বিচের পরিধি আরও বাড়তো।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের জানান, ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ীভাবে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষার জন্য একটি ‘সৈকত রক্ষা প্রকল্প’প্রস্তাবনা আকারে পাঠানো হয়েছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। যা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে ফের বিস্তারিত সমীক্ষার জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব উদ্যোগে ও অর্থায়নে স্বল্প পরিসরে জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ এবং সৈকত প্রটেকশনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোতালেব শরীফ জানান, ২০০৪ সাল থেকে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি।

কুয়াকাটা পৌর মেয়র ও সি বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য আব্দুল বারেক মোল্লা জানান, পৌর সভার উদ্যোগে যা কিছু করা সম্ভব তা করা হচ্ছে। তবে পুরো সৈকত রক্ষার উদ্যোগ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় গ্রহণ করলে কুয়াকাটা এবং পর্যটকদের জন্য সুবিধাজনক হবে।

জেলা প্রশাসক ও কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি ড. মো. মাছুমুর রহমান বাংলানিউজকে জানান, কুয়াকাটা সৈকতের বেলাভূমি ঢেউয়ের তোড়ে বিলীন রোধে অন্তত দুই কিলোমিটার এলাকা জরুরি প্রটেকশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই এর কাজ শুরু হবে।

উল্লেখ্য, পর্যটকরা কুয়াকাটার প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম নৈস্বর্গিক দৃশ্য দেখার জন্য এখানে ছুটে আসেন। প্রায় ২০ কিলোমিটারের এ সৈকতের পূর্ব দিকে রয়েছে রামনাবাদ নদের মোহনা ও পশ্চিম দিকে রয়েছে আন্ধারমানিক নদের মোহনা। রামনাবাদ নদের মোহনা থেকে সূর্যোদয় আর আন্ধারমানিক নদের মোহনা থেকে সূর্যাস্তের অপরূপ সুন্দর দৃশ্য দেখতে ও উপভোগ করতে পারেন পর্যটকরা।