সহযোগিতামূলক সংস্কৃতি চালু করার অঙ্গীকার (ভিডিও)

জনগণের মুখোমুখি

প্রকাশিত: ২:১৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৩, ২০১৮ | আপডেট: ১:১৯:পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০১৮

বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৬ মেয়র প্রার্থীকে জনগণের মুখোমুখি করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। আমন্ত্রিত থাকলেও এতে যোগ দেননি আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ।

নগরীর সদর রোড অশ্বিনী কুমার হলে গতকাল সকালে জনগনের মুখোমুখিতে যোগ দিয়ে মেয়র নির্বাচিত হলে উন্নয়ন বরাদ্দের শতভাগ বাস্তবায়নসহ দলীয়করন ও স্বজনপ্রীতি পরিহার করে পারস্পরিক সহযোগিতামুলক সংস্কৃতি চালু করাসহ নানা বিষয়ে লিখিত অঙ্গীকার করেছেন ৬ মেয়র প্রার্থী। নির্বাচিত হলে বরিশাল মহানগরকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক এবং নাগরিকবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার আশার কথাও শুনিয়েছেন মেয়র প্রার্থীরা।

জনগণের প্রশ্নোত্তর পর্ব, সংক্ষিপ্ত কথামালা আর প্রতিদ্ব›িদ্ব মেয়র পদ প্রার্থীদের বক্তব্যে প্রাণবন্ত এ অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে হাত উঁচিয়ে জনগনের যে কোন রায় মেনে নেয়ার ও নির্বাচনী পরিবেশ ঠিক রাখার অঙ্গীকার করেন তারা। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাধারণ মানুষও সৎ, যোগ্য ও জনকল্যাণে নিবেদিত প্রার্থীকে ভোট দেয়ার শপথ নেন।

অনুষ্ঠানে আওয়ামীলীগ মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মেয়র প্রার্থী মোঃ মজিবর রহমান সরওয়ার (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টি মেয়র প্রার্থী মোঃ ইকবাল হোসেন তাপস (লাঙল), বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মেয়র প্রার্থী মনীষা চক্রবর্ত্তী (মই), কমিউনিস্ট পার্টি মেয়র প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ (কাস্তে), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মেয়র প্রার্থী ওবাইদুর রহমান মাহবুব (পাখা) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী বশির আহম্মদ ঝুনু সহ স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানূষ উপস্থিত ছিলেন।

বরিশাল মহানগর সুজনের সভাপতি অধ্যাপক শাহ্ সাজেদার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সুজনের জেলা কমিটির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আক্কাস হোসেন, কমিটির সাধারণ সম্পাদক রঞ্জিত কুমার দত্ত , মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দিলীপ সরকার।

পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

এসময় মেয়র প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে নিজ নিজ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রাত্যাশা ব্যক্ত করেন।

বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার নগরীকে সন্ত্রাসমুক্ত করা, সিটির অসমাপ্ত কাজ শেষ করাসহ জনকল্যাণে কাজ করার প্রতিশ্রæতি দেন।

জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস তার বক্তব্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের ওয়াদা চান জনগণের কাছে।

অন্যদিকে, নির্বাচিত হলে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয় দিয়ে সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালনাসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা পরিশোধের প্রতিশ্রæতি দেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা ওবাইদুর রহমান মাহবুব।

এছাড়াও জনতার মুখোমুখি অনুষ্ঠানে কমিউনিস্ট পার্টির অ্যাডভোকেট এ কে আজাদ, বাসদের ডা. মনীষা চক্রবর্তী এবং জাতীয় পার্টির বিদ্রোহী প্রার্থী বশির আহম্মেদ ঝুনু ভোটারদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেন।

অনুষ্ঠানে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার জনতার প্রশ্নের জবাবে বলেন, ভোটে অংশগ্রহন করেছি, যা নিয়ে মানুষের মাঝে সংশয়, শঙ্কা রয়েছ।

ভোটারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আমাদের কমিটমেন্ট করতে আমার ভোট আমি দিবো, যাকে খুশি তাকে দিবো এবং জনগনের ভোট যারা দখল করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আজ দলীয় নির্বাচনের কারনে দলীয় করন হয়ে গেছে। আমরা চাই গনতন্ত্র মুক্তির পথে আসুক।গনতান্ত্রিক সরকার নির্বাচিত না হলে সিটি কর্পোরেশনকে এগিয়ে নেয়া যাবে না।

সরোয়ার বলেন, উন্নয়নের জন্য আমাদের বাজেটে বরাদ্দের নির্ভরতা কমাতে হবে। আমি বিগত সময়ে যখন মেয়র ছিলাম তখন সিটি কর্পোরেশনের কোন জায়গা লিজ দেইনি, ১১ টি মার্কেট করেছি, কালেক্টর পুকুর দখলমমুক্ত করেছি, বাড়ি-ঘর, মন্দির দখলমুক্ত করেছি। এমনকি সন্ত্রাস করতে দেবো না কমিটমেন্ট করেছিলাম তাও করতে দেইনি। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সড়ক করেছি, মেয়র পদক ঘোষনা করেছিলাম। মেয়র হলে নগর উন্নয়নে পরিকল্পনা করে জনগনের সাথে মিলেমিশে কাজ করবো।

বরিশালকে সুন্দর নগরী করার আকাঙ্খা প্রকাশ করে সরোয়ার বলেন, আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী হলে খাল খনন, জলাবদ্ধতা নিরসন, শহর রক্ষাবাধ নির্মান, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানসহ নাগরিক সংকটগুলো দূর করে বরিশালকে প্রযুক্তি সমৃদ্ধ সুন্দর নগরী করে গড়ে তুলবেন তিনি।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের দাবী জানিয়ে জাতীয়পার্টির মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন (তাপস) বলেন,জনগনের উন্নয়ন আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি দিতে চাইনা। জনগন সবার ওপরে। নির্বাচিত হলে নগরভবনে নগরপিতা হিসেবে নয়, সেবকভবনে নগরের সেবক হিসেবে বসতে চাই।

অনুষ্ঠানে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী বশির আহমেদ ঝুনু বলেন, বিগত সময়ে মেয়রের পদে থেকে কে কি করেছেন তা সবাই জানে। শুধু শওকত হোসেন হিরনই কাজ করেছেন।মেয়র পদে ব্যক্তিগত দূর্ণীতিমুক্তদের বসা প্রয়োজন। আমি বাজে কমিটমেন্ট দিবো আর নির্বাচিত হলে ভুলে যাবো সেটা হতে দেয়া উচিত নয়। ভোটাররা ১ দিনের জন্য ভোট দিবেন আর যোগ্য প্রার্থী না হলে ৫ বছরের জন্য পস্তাবেন। পার্সেন্টিসবাজদের দুর্নীতিবাজদের ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে। আমার ভোট চাইতে লজ্জা করে কারন আমি বরিশালবাসীর জন্য কিছু করিনি। তবে দয়া করে যদি ভোটাররা ভোট দেন তবে বরিশালের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রাখবো।

বাসদের মেয়র প্রার্থী ডাঃ মনিষা চক্রবর্তী বলেন, নির্বাচিত হলে নগর কাউন্সিলের মাধ্যমে জনগননের মতামত নিয়ে উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড পরিচালনা করা হবে। আমি এই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের প্রথম নারী প্রার্থী। বিগত ১৫ বছরে কোন মেয়রই নারী বান্ধব কর্মসূচী হাতে নেয়নি। আমি মেয়র হলে কর্মজীবি নারী হোষ্টেল, ডে কেয়ার সেন্টারসহ নারীবান্ধব কর্মকান্ড পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি সমাজকে মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে পাড়ায় পাড়ায় পাঠশালা তৈরি,রচনা প্রতিযোগীতা, গনিত উৎসব, সাংস্কৃতিক চর্চার ব্যবস্থা করা হবে।

সিপিবির মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, বরিশাল সিটি কর্পোরেশনকে দৃষ্টিনন্দন একটি নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন, সড়ক উন্নয়নসহ নাগরিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা হবে। নগরের বস্তি এলাকার মানুষদের পুনঃবাসনের উদ্যোগ নেয়া হবে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী ওবাইদুর রহমান মাহবুব বলেন, সিটি কর্পোরেশনকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করার জন্য দুর্নীতি মুক্ত করা হবে। পার্সেন্টিস মুক্ত কর্পোরেশন গড়া হবে। এসময় তিনি সৎলোককে ভোট দেয়ার জন্য ভোটারদের কাছে আহবান জানান।

অনুষ্ঠানে সুজন কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক ড. বদিউল আলম জনগণের রায় মেনে নেয়ার জন্য প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান। পাশাপাশি যারা নির্বাচিত হবেন তাদের কর্পোরেশনে নামে-বেনামে কোন ঠিকাদারি না করার জন্যও আহ্বান জানান।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আসন্ন বরিশাল সিটি নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকে ভোটের মাধ্যতে বিজয়ী করতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। নাগরিকদের সক্রিয় ভূমিকা ও সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে দেশের গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। তাই নাগরিকগণ যে কোন প্রার্থী সম্পর্কে জেনে, শুনে, বুঝে স্বাধীন ভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সৎ, যোগ্য ও নগরীর সকল বিষয়ে কল্যাণে নিবেদিত জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করে আপনাদের প্রত্যাশিত নগরীকে গড়ে তুলবেন। শুধুমাত্র প্রার্থীরা প্রতিশ্র“তি দিবেন তাই নয়, জনগণকেও প্রতিশ্র“তি দিতে হবে যাতে তারা কোন ধরনের অসৎ, অযোগ্য এবং অকল্যাণকর কোন প্রার্থীকে নির্বাচনে বিজিত করবেন না। আবেগের বশবর্তী হয়ে অসৎ ও অযোগ্য প্রার্থীকে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করার ফলে যে সমস্যা ও জনদূর্ভোগ সৃষ্টি হবে সে জন্য ঐ সকল ভোটারগণও সমভাবে দায়ী থাকবেন বলে তিনি উলে­খ করেন।

তিনি আরো জানান যে, জনপ্রতিনিধি আইন ও বিধান মতে কোন প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার পর ঐ প্রতিষ্ঠান হতে ব্যক্তিগত ভাবে কোন ধরনের লাভবান হবেন না বা হতে পারেন না। বিশেষ করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ কিংবা তার নিকত্মায়ীগণ কোন ভাবে ঠিকাদারী কিংবা অন্য কোন ভাবে লাভবান হয়েছেন বা হতে পারেন এমন প্রার্থীর ব্যাপারে সচেষ্ট থাকার আহবান জানান।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিপুল ভোটারের মধ্যে মেয়র প্রার্থীদের হলফনামায় তথ্যাবলিবিষয়ক প্রচারপত্র বিলি করা হয়।

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী সাদিক আব্দুল্লাহ এই অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে না থাকা প্রসঙ্গে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

তবে তার প্রচারণায় ছিলেন এমন এক ব্যক্তি বলেন, সকাল থেকেই তিনি (সাদিক আব্দুল্লাহ) প্রচারণায় রয়েছেন। বিকেলেও তিনি গণসংযোগে ছিলেন। ওই কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি।

মূলত প্রধান দুই প্রতিদ্বন্ধী মেয়র প্রার্থীর কাছ থেকে কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আশায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন অর্ধসহস্রাধিক মানুষ। কিন্তু ৭ মেয়র প্রার্থীর মধ্যে আওয়ামীলীগের প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ উপস্থিত হননি। এতে উপস্থিত দর্শকরা হতাশ হন।

আগামী ৩০ জুলাই বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে সুশাসনের জন্য নাগরিক ( সুজন) সিটি নির্বাচনে মেয়রদের এবং সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের ‘জনগণের মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানে হাজির করেন। এখানে উপস্থিত জনতা প্রশ্ন করেন এবং প্রার্থীরা উত্তর দেন। বিশেষ করে বিগত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ধারাবাহিকভাবে এবারও এধরনের একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।