‘প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং তারুণ্যকেন্দ্রিক আগামীর উন্নয়ন ভাবনা’

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১২:০৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২, ২০১৮ | আপডেট: ১২:১৭:অপরাহ্ণ, জুলাই ২, ২০১৮
‘প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং তারুণ্যকেন্দ্রিক আগামীর উন্নয়ন ভাবনা’

ডা. খাইরুল ইসলাম: একমঞ্চে দু’জন; পাশাপাশি বসে আছেন – বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সম্মেলনকক্ষে। একজন বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। অন্যজন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস।

সম্মানিত অতিথি হিসাবে তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) নিয়ে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে যেখানে আছেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রনলায়ের সচিব, ডাকসাইটের রাষ্ট্রদূত, উন্নয়ন সহযোগী, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, এনজিও, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, কিশোর যুব সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। সম্মেলন কক্ষ কানায় কানায় পরিপূর্ণ।

এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আজাদ সাহেবের সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনার পর উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব। শ্রদ্ধেয় কাজী খলীকুজ্জামান, ব্যবসায়ী নেতা নিহাদ কবির, এনজিও ব্যক্তিত্ব খুশী কবির, উপাচার্য ফারজানা ইসলাম, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বেশ কঠিন কঠিন প্রশ্ন করলেন। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তাঁর প্রস্তুতকৃত বক্তৃতা বাদ দিয়ে উপস্থাপিত প্রশ্নের উপর বক্তব্য রাখলেন।

কথায় কথায় তিনি জানালেন – তিনি বাংলাদেশ নিয়ে লেখাপড়া করছেন অনেকদিন ধরেই। তাঁর অধীত বিষয়ের মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা শাস্ত্র, জনস্বাস্থ্য, নৃতত্ত্ব; বিশ্বব্যাংকের প্রক্ষাপটে তাঁর শাস্ত্রীয় জ্ঞান ভিন্নধারার। কিন্তু তাঁর জ্ঞানের গভীরতা প্রকাশিত হয় তাঁর বক্তব্যে। এত চমৎকার করে বলেন, মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে হয়।

জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান যে উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য তা তিনি চমৎকার বুঝিয়ে বলেন। আমাদের কেউ কেউ মনে মনে আমাদের বিভিন্ন কমিশনের কথা ভাবি। অবকাঠামোর পাশাপাশি তিনি শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলেন; এসব খাতে বাংলাদেশের অর্জনের প্রশংসা করেন। এসডিজির অর্থায়নের ব্যাপারে তিনি জানান যে প্রাইভেট সেক্টর থেকে এসডিজির প্রায় ৪০% আসতে হবে।

তিনি হিসাব দেন – এসডিজি অর্জন করতে হলে প্রতি বছর কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার লাগবে, অথচ প্রতি বছর পাওয়া যাচ্ছে কয়েকশ বিলিয়ন। প্রয়োজন ও প্রাপ্যতার ফাঁকটুকু পূরন করতে হলে জাপান, ইউরোপ আর পশ্চিমের নানা দেশে যে অলস টাকা পড়ে আছে যেখানে টাকা রাখার জন্য উলটো ব্যাংককেই টাকা দিতে হয় – সেখান থেকে বিনিয়োগের সংস্থানের জন্য উদ্ভাবনী উপায় খোঁজার আহ্বান জানান তিনি। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকও কাজ করছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

জাতিসংঘের মহাসচিব বয়সে তাঁর চাইতে প্রবীন; কঠিন কঠিন প্রশ্ন এরই মধ্যে সামলে নেয়ায় মহাসচিব স্বস্তি বোধ করেন; বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের হাত চাপড়ে দেন।

মহাসচিবও বলেন চমৎকার। তিনি বললেন – বাংলাদেশের জন্য তিনি তিনটি শব্দ ব্যবহার করবেন – সংহতি, প্রশংসা আর উদ্বেগ।

মিয়ানমারের নাগরিক আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবতার প্রতি যে সংহতি দেখিয়েছে আজ পুরো পৃথিবী বাংলাদেশের সাথে সংহতি প্রকাশ করছে। উনারাও এসেছেন – এই সংহতি প্রকাশেরই অংশ হিসাবে। পৃথিবীতে সংহতির এরচেয়ে ভালো কোন উদাহরন আছে কিনা জানা নেই।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের দক্ষতা, দুর্যোগ সহিষ্ণুতায় অগ্রগতি, বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিশেষ করে মানব উন্নয়নে বাংলাদেশ যা করে দেখিয়েছে তাঁর জন্য তাঁর প্রানঢালা প্রশংসা।

তাঁর উদ্বেগের মূল কারন হলো জলবায়ু পরিবর্তন যা আমাদের সকল অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে; সেই সাথে তিনি উন্নয়নের কেন্দ্রে তারুন্যকে স্থাপন করার জন্য গুরুত্ব আরোপ করেন। আরব বসন্ত এবং তারপরের ঘটনাবলী আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে – যে তারুন্য সামাজিক পরিবর্তনের মূলশক্তি সেই তারুন্যকেই যথাযথ কাজে না লাগালে তা হয়ে যেতে পারে দেশ মহাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্বের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি।

তারুন্যকেন্দ্রিক উন্নয়নই আগামীদিনের চ্যালেঞ্জকে রূপান্তরিত করতে পারে এক মহাশক্তিতে। এই প্রবীন তাঁর প্রজ্ঞায় তুলে ধরেন তারুন্যের জয়গান।

নিরাপত্তাজনিত কারনে অনুষ্ঠানস্থলে যেতে হয়েছিল একঘন্টা আগে; আর অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল প্রায় একঘন্টা দেরিতে। আয়োজকদের কেউই এনিয়ে কোন দুঃখপ্রকাশ করার সৌজন্য দেখালেননা। হয়তো সেটা করলে অতিথিদের জন্য তা বিব্রতকর হতো।মাত্র দেড় ঘন্টার মধ্যে এমন দুটি বক্তৃতা মুগ্ধতার সাথে শুনে আমরা শিহরিত হই।

তবে আমার মতো ব্রাত্যজনের জন্য হয়তো এটা ছিল জীবনে পাওয়া একটা অন্যতম সুযোগ। এই মাপের মানুষদের কাছ থেকে এত চমৎকার বক্তৃতা শুনতে পারা সৌভাগ্য বটে।

লেখক: কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ, ওয়াটার এইড বাংলাদেশ