ঢাকা, ||

মরে গিয়ে তনুর বেঁচে যাওয়া

  সোহাগী জাহান তনুর ছবিটি যতোবার দেখছি ততোবারই চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছে। দেখছি আর ভাবছি দরিদ্র ঘরে জন্ম নেওয়া মেয়েটির কাজলটানা দু’টি চোখের গভীরে কত স্বপ্নই না লুকিয়ে ছিলো। সে স্বপ্নজয়ে দারিদ্র্য কোন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। শিক্ষাজীবনের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করে কেবল অর্থ আহরণের স্বপ্ন ছিলো না তার চোখে, ছিলো মেধা আর মননে, শিক্ষা আর নন্দনে নিজেকে একজন শুদ্ধ মানুষরূপে গড়ে তোলার। নিজের মননকে বিকশিত করতে জড়িয়ে ছিলো থিয়েটারের সঙ্গে। বড় আদরের মেয়ে সোহাগীর সে স্বপ্ন হয়তো ছুঁয়ে গিয়েছিলো তার বাবা-মাকেও। ভাবতেই পারছি না সেই স্বপ্নময় চোখ দুটি নিথর হয়ে গেছে। গাঁ শিউরে উঠছে তনুর হাসিমাখা নিষ্পাপ মুখটির এমন বিভৎস পরিণতি দেখে। না, মেয়েটি আমার কেউ নয়। মেয়েটির এমন নির্মম পরিণতির আগে তার নামটি পর্যন্ত আমার জানা ছিলো না। কিন্তু এমন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে হয়ে উঠেছে আমার বোন, আমার বন্ধু, আমার পরম আত্মীয়। সে যে নিজের জীবন দিয়ে আমাকে জানিয়ে দিয়ে গেছে নারী তুমি কোথাও নিরাপদ নও। আর এই ‘একটি মাত্র জানা’ নারী হিসেবে আমাকে বড় বেশি অসহায় করে দেয়। তার চেয়েও বেশি অস হায় হয়ে যাই যখন এ ধরনের ঘটনার দায় নারীকেই নিতে হয়। পহেলা বৈশাখের ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর শুধু পুরুষের কাছ থেকে নয়, বহু নারীর কাছ থেকেও শুনেছিলাম সেদিন নারীরা লাঞ্ছিত হয়েছিলো তাদের পোশাকের দোষেই। এখন হিজাব পরা তনুও নিজের দায় এড়াতে পারেন না। হিজাব পরলে কী হবে! ধর্ষণের জন্য তার থিয়েটারে কাজ করাটাই দায় হয়ে উঠেছে। একটি সমাজ কতখানি বিকৃত মানসিকতাকে ধারণ করলে এমন মন্তব্য করতে পারে আমার জানা নেই আর একদিন ভোট দিয়ে আমাদের নিরাপত্তার ভার যাদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম, এতবড় একটি ঘটনায় তারা কেমন নির্বিকার! অবশ্য মাত্র কয়েকদিন আগেইতো একজন মাননীয় মন্ত্রীর মন্তব্য থেকে জেনেছিলাম ‘পহেলা বৈশাখে যে ঘটনা ঘটেছিলো সেটা তেমন কোনো ঘটনা না। এমন টুকিটাকি ঘটনা হতেই পারে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর ধর্ষণ-হত্যার ঘটনাটিকেও এই টুকিটাকি ঘটনার বেশি কিছু ভাবতে পারেননি আমাদের মহান রাজনীতিবিদেরা। আর তাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তার বলয়ে মোড়া ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে ঘটে যাওয়া এই নারকীয় ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সরকারের কোনো বক্তব্য এখনও পাইনি আমরা। অবশ্য টুকিটাকি ঘটনা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোথায় তাদের? আর নিরাপত্তা! নারীর জন্য পাড়ার বখে যাওয়া ছেলেটি থেকে শুরু করে পুলিশ, শিক্ষক, সেনাবাহিনী কেউ যে নিরাপদ নয় সে প্রমাণতো মিলছে বহু আগে থেকেই। ইয়াসমিন, তৃষা, ফাহিমা, সীমা আরো আরো অসংখ্য নাম সে সাক্ষ্য বহন করছে অনেকদিন ধরেই। আর এসব ঘটনার বিচারহীনতাই ঘটনার পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করছে বারংবার। নারীর জন্য আজ নিরাপদ নয় পথ, পার্ক, ক্যান্টনমেন্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি পরিবারও। আর তাই একটি মেয়েশিশু নারী হয়ে ওঠার আগেই শরীরটি তার শত্রু হয়ে ওঠে। ধর্ষণের অর্থ জানার আগেই হয়তো তাকে বহন করতে হয় ধর্ষিতার অভিশাপ। তনু, তুমি তার বাইরের কেউ নয়। তোমার সৌভাগ্য এই যে এই কষ্টকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়নি। ধর্ষণের চিহ্ন নিয়ে তুমি যদি বেঁচে থাকতে তাহলে হয়তো আজীবন বহন করতে হতো এক দুর্বিষহ ক্ষত। আর যদি প্রতিবাদী হয়ে উঠতে, বিচার চাইতে তোমার প্রতি এই অবিচারের তাহলে তোমার পরিণতি হতো আরো ভয়াবহ। তোমার ধর্ষণের সত্যতা যাচাইয়ের নামে, আদালতের কাঠগড়ায় শুনানীর নামে তোমাকে ওরা ধর্ষণ করতো বারবার! তুমি মরে গিয়ে বেঁচেই গেছ তনু। কিন্তু আমরা এখনও যারা মরার মতো করে বেঁচে আছি তাদের বাঁচার অধিকার আদায় করে নিতে হবে নিজেদেরকেই। বেঁচে থাকার শেষ নিঃশ্বাসটুকু অপহৃত হওয়ার আগেই জেগে উঠতে হবে সবাইকে। এখনই সময় আমাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবেকটাকে জাগ্রত করার, মানবতাকে জাগ্রত করার। তুমুল প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তোলার। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে তোলার। আর তা যদি করতে না পারি তাহলে তনুদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়তেই থাকবে। সে তালিকায় হয়তো যুক্ত হবে আমারই প্রিয় বোন, সন্তান, বান্ধবি কিংবা হয়তো নিজের নামটিই। তনুকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু তনুই যেনো হয় এমন পাশবিক নির্মমতার শেষ শিকার। তনুর যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ হোক আমাদের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর।
Top