ঢাকা, ||

খাদিজাকে পেয়ে খুশি সবাই

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেন সিলেটের খাদিজা। তিনি এখন সুস্থ। হাসি-খুশি। কিন্তু বদরুলের কথা শুনেই আঁতকে উঠলেন তিনি। বললেন, ‘আমি ওর সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। এমন শাস্তি দেয়া হোক, যা দেখে আর কোনো পাষণ্ড মেয়েদের ওপর নির্মমতা না চালায়।’ খাদিজার পিতা মাসুক মিয়াও জানালেন আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। খাদিজাকে এখন থেকে আদালতে উপস্থিত করা হবে বলেও জানান তিনি। সিলেটের আদালত খাদিজার জন্য প্রায় দুই মাস ধরে অপেক্ষায়। আলোচিত এ ঘটনায় খাদিজার জবানবন্দি শুনতে চান আদালত। এ কারণে ৩৩ সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের পরও ন্যায় বিচারের স্বার্থে খাদিজার জন্য এ অপেক্ষা। খাদিজা আক্তার নার্গিস। সিলেট শহরতলির আউশা গ্রামের সৌদি প্রবাসী মাসুক মিয়ার কন্যা। সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বাড়ি থেকে এসেই পড়ালেখা করতেন সিলেটে মহিলাদের সর্বোচ্চ এ বিদ্যাপীঠে। তবে একা আসতেন না। সঙ্গে আসতেন চাচা অথবা পরিবারের কেউ। আর হামলাকারী বদরুল সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অনিয়মিত শিক্ষার্থী। সে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতাও। একসময় বদরুল খাদিজাদের বাড়িতে লজিং থাকতো। কিন্তু চারিত্রিক ত্রুটির কারণে বদরুলকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। দেশজুড়ে আলোচিত এ ঘটনা ঘটে ৩রা অক্টোবর সিলেটের এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে। ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা দিতে কেন্দ্র এমসি কলেজে যান খাদিজা আক্তার নার্গিস। ওই দিন দুপুরেও বদরুল খাদিজার সঙ্গে কথা বলতে  চেয়েছিল। কিন্তু খাদিজা সায় না দিয়ে পরীক্ষার হলে চলে যান। এতে ক্ষেপে যায় বদরুল। সে ক্যাম্পাস থেকে ফিরে নগরীর আম্বরখানা থেকে ২৬০ টাকা দিয়ে চাপাতি কিনে আনে। আর ওই চাপাতি কোমরে নিয়ে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে যায়। বিকাল ৫টার একটু পর খাদিজা পরীক্ষার হল থেকে বের হলে তার ওপর চাপাতি নিয়ে হামলা চালায় বদরুল। শিক্ষার্থীদের সামনেই খাদিজাকে নির্মমভাবে কোপায়। সবার ধারণা ছিল খাদিজা বাঁচবেন না। এরপরও কয়েকজন যুবক রক্তাক্ত খাদিজাকে সিএনজিযোগে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। আর কয়েকজন যুবক বদরুলকে ক্যাম্পাসে আটক করে গণধোলাই দেয়। পরে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়। ওদিকে রক্তাক্ত খাদিজাকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তখন প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল তার। তার শরীরে রক্ত পুশ করার পাশাপাশি চিকিৎসা দেয়া হয়। খাদিজার ওপর যেমন নির্মমতা চালানো হয়েছে তা দেখে ডাক্তাররাও আঁতকে ওঠেন। তার মাথা-কাঁধসহ একাধিক স্থানে উপর্যুপরি কোপানো হয়। ওসমানী হাসপাতালের ডাক্তাররা বিচক্ষণতার সঙ্গে তার চিকিৎসা করেন। রক্তক্ষরণ কমাতে সক্ষম হন। এরপরও তারা খাদিজাকে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। এ অবস্থায় ওই রাতেই বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সযোগে খাদিজাকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আর ওদিকে খাদিজার ঘটনায় ক্ষোভ দেখা দেয় সিলেটে। শুরু হয় তীব্র আন্দোলন। সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হামলাকারী বদরুলের শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন। সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা টানা তিন দিন কর্মসূচি পালন করে। খাদিজার ওপর হামলার ঘটনায় গোটা সিলেট বিভাগেও আন্দোলন গড়ে ওঠে। ঘটনার পর গণপিটুনির কারণে বদরুলের অবস্থাও গুরুতর ছিল। এ কারণে তাকে পুলিশি হেফাজতেই ভর্তি করা হয়েছিল হাসপাতালে। সে ভর্তি থাকা অবস্থায় খাদিজার চাচা আবদুল কুদ্দুস বাদী হয়ে নগরীর শাহপরান থানায় বদরুলকে একমাত্র আসামি করে মামলা করেন। দু’দিন হাসপাতালে থাকার পর বদরুলকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়। সেখানে বদরুল ঘটনার দায় স্বীকার করে। পরে সিলেটের আদালতেও বদরুল ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। ওই জবানবন্দিতে বদরুল জানিয়েছে, প্রেম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সে খাদিজাকে কুপিয়েছে। এছাড়া সে খাদিজাদের বাড়িতে লজিং থাকার কথাও উল্লেখ করেন। এদিকে ঘটনার প্রায় এক মাস পর ৮ই নভেম্বর সিলেটের আদালতে বদরুলকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করে শাহপরান থানা পুলিশ। আদালত চার্জশিট আমলে নিয়ে শুরু করেছেন বিচার। পুলিশ চার্জশিটে ৩৭ জন সাক্ষীর নাম উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেট, ডাক্তার, পুলিশসহ ৩৩ জন সাক্ষী আদালতে তাদের সাক্ষ্য দেন। এরপর গত ডিসেম্বরে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ করে আদালত খাদিজাকে তলব করেন। কিন্তু ঢাকার সিআরপিতে থাকায় খাদিজাকে সিলেটে আনা হয়নি। জানুয়ারিতে এক দফা তারিখ পরিবর্তনের পর আগামীকাল রোববার নতুন তারিখ ধার্য করা আছে। এদিন খাদিজাকে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে সাভারের সিআরপিতে নেয়া হয় খাদিজাকে। সেখানে তার ফিজিওথেরাপি করা হয়। পাশাপাশি ভয় কাটাতে তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়। এরই মধ্যে ১লা ফেব্রুয়ারি খাদিজাকে ডাক্তারের পরামর্শে নিয়ে আসা হয় সিলেটের আউশা গ্রামের বাড়িতে। ওই সময় খাদিজা সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। এক সপ্তাহ পর ফের খাদিজাকে নিয়ে যাওয়া হয় সিআরপিতে। ঢাকার চিকিৎসা পর্ব শেষ করে শুক্রবার দুপুরে সিলেটের আউশা গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসেন খাদিজা। বেলা দেড়টায় খাদিজা তার পরিবারের সঙ্গে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসেন। এ সময় তাকে বেশ হাসি-খুশি দেখাচ্ছিল। সিলেটে নেমেই তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ‘আমি এখন অনেক ভালো আছি। সবার দোয়ায় আমি আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো’-। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এ সময় খাদিজা বলেন, ‘বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। তার মতো আর কোনো মেয়ের ওপর এরকম নির্যাতন যেন না হয়।’ ওসমানী বিমানবন্দরেই সাংবাদিকদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তার বড় ভাই শাহীন আহমদ। বলেন, ‘খাদিজার চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। আর দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ আগামীতেও তিনি সবার সহযোগিতা চান। শাহীন বলেন, ‘খাদিজা এখন পুরোপুরি সুস্থ। ঢাকার সিআরপির ডাক্তাররা তার চিকিৎসা শেষ করে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। আশা করা হচ্ছে আর কোনো সমস্যা হবে না।’ আর পিতা মাসুক মিয়া খাদিজার চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বদরুলের সর্বোচ্চ শাস্তি সবাই চায়। আমরাও চাই। এখন আইনি লড়াই চালিয়ে যাবো। আগামীকাল রোববার খাদিজাকে আদালতে নেয়া হবে বলে জানান তিনি। এদিকে, খাদিজা ফেরার আগেই তার বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরিবারের লোকজন খাদিজাকে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
Top