ঢাকা, ||

গানপুরে অশ্লীলতার থাবা

শোনার পাশাপাশি গান এখন দেখার মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। যদিও একসময় গান শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কালের আবর্তনে সে ধারা বদলে গেছে। গ্রামোফোন, অডিও ক্যাসেট, সিডির গণ্ডি পেরিয়ে এখন ইন্টারনেটের যুগ। গান এখন ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সঙ্গে থাকে দর্শনীয় ভিডিও। কিন্তু সস্তা এবং দ্রুত পরিচিতির লোভে মাঝে মধ্যে সেসব ভিডিও হয়ে ওঠে অশ্লীল ও রুচিহীন। গানের জগতেও ভয়ঙ্করভাবে শোনা যায় অশ্লীলতার পদধ্বনি। অশ্লীলতার সংজ্ঞা এবং এর আইনি সুরক্ষা নিয়ে আজকের প্রতিবেদন। বিস্তারিত লিখেছেন আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব অভিনেত্রী কুসুম শিকদারের ‘নেশা’ গানটি যেন নেশাই ধরিয়ে দিল! প্রকাশ পেতেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন দর্শক। যে বেগে ‘ভিউয়ার’ বাড়ছে, তাতে গানটি সম্ভবত রেকর্ড বুকে নাম লেখাতে যাচ্ছে। মুক্তির ৪ দিনে ইউটিউবে গানটির ডিডিওর ‘ভিউয়ার’ প্রায় ৬ লাখ! কোনো বাংলাদেশি সলো গানের (নন-ফিল্ম) এত স্বল্প সময়ে এত ভিউয়ার- কল্পনাই করা যায় না। নিঃসন্দেহে সঙ্গীতাঙ্গনে এ মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত নাম ‘কুসুম শিকদার’। সেটি কতটা গান নিয়ে, আর কতটা ভিডিও নিয়ে- তা কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ। নেশা গানে দর্শক এখন বুঁদ বটে। তবে সেটি কতটা শিল্পের নেশা, আর কতটা ‘অন্য কিছুর’ নেশা- তা কিন্তু তর্ক সাপেক্ষ। ভিডিওটিতে খুব দৃষ্টিকটুভাবে যৌনতার বাণিজ্যিক সমীকরণ চোখে পড়ে। চোখে পড়ে অশ্লীলতার ব্যাকরণ। তাতে দর্শক মনে আশঙ্কা জাগছে- ‘হিট’-এর সোনার হরিণ ধরতে সাধারণ গানও কি এখন তবে যৌনতার ঘোড়ায় ভর করেছে? এখন থেকে সুপারহিট মিউজিক ভিডিওর ট্রেন্ড কি তবে পাল্টে যাচ্ছে? চলুন একটু পেছনে ফেরা যাক। গানের রূপবদল এক সময় গান ছিল শোনা ও উপলব্ধির বিষয়। সময়ের হাত ধরে সেটি হয়ে গেল দেখা ও শোনার বিষয়। আর এখন তা নিরঙ্কুশ দর্শনধারী। ভালো কথা, সুর ও কণ্ঠ ছিল আগে হিট গানের রসদ। সেই রসদ এখন মিউজিক ভিডিও। গানের কথা, সুর ও সঙ্গীত নিয়ে এখন ততটা আলোচনা হয় না, যতটা হয় মডেল ও মডেলিং নিয়ে। আগে ক্যাসেট, সিডি, ডিভিডির বিক্রি ছিল ‘হিট’ মাপার মিটার। সেই মিটার এখন ইউটিউবের ‘ভিউয়ার’ (দর্শক) সংখ্যা। কতজন শুনছে সেটি এখন গৌণ, কতজন দেখছে সেটিই এখন মুখ্য। গান যতই ভালো হোক, হিট হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত; যদি ভিডিও ভালো না হয়। বিপরীতে মোটামুটি চলনসই গান হলে, চিত্তাকর্ষক ভিডিওতে তা সুপারহিট। হিট ভিডিওরও রেসিপিও এখন পাল্টেছে। এখন আর কেবল ঝকঝকে প্রিন্ট, দুুর্দান্ত লোকেশন, মর্মস্পর্শী গল্প, সুন্দরী নারী মডেল ও পৌরুষোচিত পুরুষ মডেলে কাজ হয় না। সঙ্গে চাই যৌনতার সুড়সুড়ি। চাই অহেতুক শরীর প্রদর্শনী। কুসুম শিকদারের ‘নেশা’ গানেও সেই অব্যর্থ ফরমুলা। তার নাকি (ঘড়ংধষ) কণ্ঠের গানটির অডিও মুক্তি পায় ২-৩ মাস আগে। তখন কেউ টেরই পায়নি। আর খোলামেলা ভিডিওর বদৌলতে ওই গানেরই এখন মার মার কাট কাট অবস্থা। ‘নেশা’ গানের নেশাটা যেখানে ‘চোখে আমার তোমার নেশা। শ্বাসে আমার তোমার নেশা। সারা দেহে তোমার নেশা। রগে রগে তোমার নেশা। তোমায় পান করে... জ্ঞান হারাই, হই মাতাল।’ এমন ‘উত্তেজক’ কথার আবৃত্তি দিয়েই গানটির যাত্রা। প্রথম দৃশ্যেই সুইমিং পুল। ভেজা শরীরে কুসুমের যৌনাবেদনময়ী অভিব্যক্তি। তারপর শাওয়ারের দৃশ্য। হাতে হাত, শরীরে-শরীর। কুসুমের ভেজা জবুথবু উদাম পিঠ। পিঠে ঝরছে শাওয়ার বৃষ্টি। বেডসিন, চুমুর দৃশ্য, একটু পর পর অকারণে, অপ্রাসঙ্গিকভাবে পাত্র-পাত্রীর উদাম দেহের ‘বায়োলজি’... উফফ চমৎকার!! হাল জমানার হিট ভিডিওর সব মশলায় গানটি টইটম্বুর। গানটি আপাদমস্তক যৌনরসে, অশ্লীলতার ষোলোকলায় ভরপুর। এমনকি গানটির ঈড়াবৎ চযড়ঃড় বা ঞযঁসনহধরষ-এ পর্যন্ত শোভা পাচ্ছে কুসুম ও র‌্যাম্প মডেল সুজনের অর্ধনগ্ন শরীরের ঘনিষ্ঠ দৃশ্য। তাতে বলতে দ্বিধা নেই, শিল্প নয়, এ গানের ভিডিওঅয়ালারা অশ্লীলতার ‘ছুঁ মন্তর ছুঁয়ে’ই দর্শক বশ করতে চেয়েছেন। তাতে পরিষ্কার, কথা-সুর-সঙ্গীতের আবেদন নয়, কুসুমের আকর্ষণীয় শরীরের যৌনাবেদনকে পুঁজি করে তারা সুপারহিটের শিরোপা পরতে চেয়েছেন। জোর বিষয় হচ্ছে, গানটিতে লাইকের চেয়ে ডিসলাইক প্রায় দেড়গুণ। আর মন্তব্যের ঘরে গালির ফুলঝুরি। অশ্লীলতার চোরাগলিতে... কেবল ‘নেশা’ গানটি নয়, বেশ কয়েক বছর ধরে, দেশীয় মিউজিক ভিডিও যৌনতা বা অশ্লীলতা ঝুঁকছে। যৌনতার সুবিধাটা হল, তা গান বা সিনেমাকে দ্রুত আলোচনায় নিয়ে আসে। যত বিতর্ক, তত ভিউয়ার। এ পাটিগণিতে, কেবল উঠতি বা অখ্যাত কণ্ঠশিল্পী নয়, শীর্ষস্থানীয় শিল্পীরাও গানের অধিকতর কাটতি বা বাজার তৈরিতে যৌনতার চোরাগলিতে পা বাড়াচ্ছেন। এ তালিকায় আছে, ইমরানের ‘ধোঁয়া’, বালামের ‘মেঘে ঢাকা’, প্রীতমের ‘ভাইয়া’, হাবিবের ‘হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা’ ইত্যাদি ভিডিও। নায়লা নাঈমরা তো আছেই, তবে পিলে চমকাতে হয় ‘প্রেম করব তোমার সঙ্গে’ গানে আনিসুর রহমান মিলন ও জাকিয়া বারী মম; কিংবা ‘উড়ছে ধুলো’ গানে শাকিব খান ও তিশার অংশগ্রহণ দেখে। অনেকেই হয়তো প্রশ্ন তুলবেন এসব গান কীভাবে অশ্লীল? শ্লীল-অশ্লীলের চিরায়ত বিতর্ক সাধারণভাবে লজ্জাহীনতা, রুচিহীনতা, অসুন্দর ও অশোভনের সামষ্টিক রূপ হল অশ্লীলতা। অন্যভাবে ‘অশ্লীলতা (ইংরেজি : ঙনংপবহরঃু) হল একটি পরিভাষা, যা এমন সব শব্দ, চিত্র ও কার্যক্রমকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়; যেগুলো কিনা সমসাময়িক অধিকাংশ মানুষের যৌন নৈতিকতার দৃষ্টিতে অপরাধ বা দোষ হিসেবে বিবেচিত’। তবে বিষয়টি প্রচণ্ড আপেক্ষিক। স্থান, কাল-পাত্র ভেদে ‘অশ্লীলতার’ রূপ বদলায়, বদলায় রং। সঙ্গমের রগরগে বর্ণনা সংবলিত ডিএইচ লরেন্সের যে ‘লেডি চাটার্লিজ লাভার’-এর কপালে অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারতের আদালত ‘অশ্লীল’-এর তিলক এঁকে নিষিদ্ধ করেছে, প্রকাশক-পরিবেশককে শাস্তি দিয়েছে, একই বইকে ইংল্যান্ড, আমেরিকাও কানাডার সর্বোচ্চ আদালত বলছে ‘শ্লীল’। যৌনতার সুড়সুড়িতে ভরা সমরেশ মজুমদারের যে প্রজাপতি উপন্যাসকে কলকাতার নিন্ম আদালত ও হাইকোর্ট অশ্লীলের শিরোপা পরিয়ে উপন্যাসের সব কপি বাজেয়াপ্ত করেছে, ওই উপন্যাসকে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘শ্লীল’-এর সনদ দিয়েছে। শিল্প-সাহিত্যে শ্লীল-অশ্লীল এ দ্বন্দ্বটা অনেকটা বিশ্বজনীন। তা ছাড়া শিল্প বা সাহিত্য শ্লীলতা-অশ্লীলতা বিচারের সুনির্দিষ্ট কোনো পাল্লাও নেই। এ ক্ষেত্রে ‘হিকলিন টেস্ট’ই (ঐরপশষরহ ঞবংঃ) বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মাপকাঠি। যা অনুভূূতি প্রবণ থেকে কলুষিত করে এবং নৈতিক অধঃপাতে নিয়ে যায়, তাই-ই অশ্লীল। এটাই হচ্ছে, হিকলিন টেস্টের মূল কথা। ইংল্যান্ডের ‘রেজিনা বনাম হিকলিন’ (১৮৬৮) মামলায় এ তত্ত্বের জন্ম। ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’- এই শিরোনামে হুমায়ুন আজাদের একটা কবিতা আছে। আমাদের মিউজিক ভিডিও একইভাবে যেন নষ্ট মোনাফাখোরদের দখলে চলে যাচ্ছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা, চলচ্চিত্রের ‘অশ্লীল যুগ’ পেরিয়ে এসেছি। এখন গানের জগতেও যেন ওই গ্রহণ লেগেছে। মহামারী রূপ পাওয়ার আগেই, রোগটার বিনাশ দরকার। সমাধান হিসেবে, দুষ্কৃতকারীদের আইনের আওতায় সাজা দিয়ে দৃষ্টান্ত তৈরি করা যেতে পারে। অনলাইনে অশ্লীল ভিডিও রোধ ও মনিটরিংয়ে বিটিআরসির মাধ্যমে একটি সেল গঠন করা যেতে পারে। এমনকি ইউটিউব কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদনক্রমে বাংলাদেশ ইউটিউবের একটা গেটওয়ে খোলা যেতে পারে। শনিগ্রস্ত প্রাণের গানকে বাঁচাতে চাইলে আমাদের এখনই উদ্যোগী ও তৎপর হওয়া উচিত। লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
Top