ঢাকা, ||

জন্ম থেকে আজ অবধি ভাত খায়নি বিস্ময়কর যুবক ইমরান!

শাহ্ আলম শাহী, স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর থেকেঃ বাঙালিকে বলা হয় ‘মাছে-ভাতে’ বাঙালি। ভাত ছাড়া বাঙালি কল্পনাই করা যায় না। সকাল, দূপুর, রাত এই তিন বেলার এক বেলা খাবারে কমপক্ষে ভাত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। ভাত ছাড়া একটি দিন কাটানো অকল্পনীয়। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নিরন্ন ফলাহার, রুটি খেয়ে কোন দিন উপাসনা করে থাকে কিন্তু তা হয়তো এক বা দু’দিনের জন্য। লক্ষী পুজায় সারাদিন নিরন্ন দিনটি কাটে লুচি-পুড়ি খেয়ে। তবে পুজার পরদিন অবশ্যই ভাত দরকার হয়। এছাড়া নাশতা কিংবা হালকা খাবার হিসেবে রুটি, পরোটা বিভিন্ন প্রকার ফাস্টফুড খেয়ে থাকে। কিন্তু দিনের পর দিন ভাত ছেড়ে শুধু রুটি খেয়েই কাটিয়ে দেয় এ ঘটনা সত্যি বিরল। জন্ম থেকে ভাত খায়নি এমন ব্যক্তি ভাত প্রধান বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর এমনই একজন বাঙালি তরুণের সন্ধান পাওয়া গেছে দিনাজপুরের খানসামায়। যে জন্ম থেকে আজ অবধি ভাত স্পর্শ কিংবা স্বাদ নেয়নি। বিস্ময়কর এ তরুণের নাম আল-ইমরান। সে খানসামা উপজেলাস্থ পাকেরহাটের ব্যবসায়ী আমিনুল হক আমুর ছেলে। ৪ ভাই এক বোনের মধ্যে ইমরান তৃতীয়। সে ২৮ ডিসেম্বর, ১৯৯৪ সালে জন্ম গ্রহন করে। সেই মোতাবেক ইমরানের বর্তমান বয়স প্রায় ২৩ বছর। এ দেশে জন্ম নেয়া কোন ব্যক্তি দীর্ঘ সময়ে কোন একদিন একটিও ভাত খায়নি এমন নজির খুব কম পাওয়া যায়। অন্তত খানসামা উপজেলায় ইমরানই একমাত্র উদাহরণ বলে দাবী করছে এলাকাবাসী। ইমরানের মা লতিফা বেগম বলেন, সাত মাস বয়সে ছোট্ট ইমরানকে ভাত খাঁওয়ানোর চেষ্টা করি। সে জন্য পেষা ভাত গাভীর দুধের সাথে মিশিয়ে প্রস্তুত করি। কিন্তু ভাত মুখে দিতে গিয়ে আশ্চর্য হই। ইমরান ভাত তো খায়নি বরং ভাত বের করে দেয় এবং মুখ হা করে থাকে। এরপরই ৩-৪ দিন ধরে পাতলা পায়খানায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ইমরান বড় হতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে বিভিন্ন সময় ভাতের থালা তার কাছে দিলেও সে তা গ্রহণ করেনি। সে ভাতের থালা দেখলেই চিৎকার করে কান্নাকাটি শুরু করতো। এরপর ৯ বছর বয়সে ইমরানের চাচা ভাত পিষিয়ে চিনি দিয়ে মিষ্টির মতো বানিয়ে ইমরানের মুখে পুরে দেয়। কিন্তু একই ঘটনা ঘটে। ইমরান খেতে রাজি হয়নি বলে জানান ইমরানের চাচা ওষুধ কোম্পানির সাবেক রিপ্রেজেন্টেটিভ ও বর্তমান ওষুধ ব্যবসায়ী বিপ্লর রহমান। ইমরানের বাবা আমিনুল হক আমু বলেন, পরে আবারও রংপুর শহরে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। চিকিৎসক ভাত খাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ইমরানের সাথে জোরাজুরি করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, শুধু ভাত নয়, চালের তৈরি কোন খাবারই ইমরান খায়নি। ইমরান ভাতের বিকল্প খাবার হিসেবে ময়দার তৈরি রুটি, পাউরুটি, ফলমূল, দুধ ও স্বাভাবিক তরি-তরকারি খেয়ে স্বাভাবিকভাবে জীবনধারণ করছে। লম্বাটে গড়ন আর স্লিম দেহী ইমরানের বর্তমান ওজন প্রায় ৫৫ কেজি। সে বর্তমানে দিনাজপুর সরকারি কলেজে ইসলামের ইতিহাস নিয়ে অনার্স শেষ বর্ষে পড়ালেখা করছে। তার অদম্য মেধার কাছে সামান্য বিষয়টিকে তুচ্ছ জ্ঞান করে পড়া লেখায় উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছে। অনার্স ১ম বর্ষে জিপিএ-৩.১৯, ২য় বর্ষে-৩.২৫ প্রাপ্ত হয় এবং ৩য় বর্ষের রেজাল্টের অপেক্ষমান রয়েছে। এছাড়াও বাল্য জীবনে সে ২০১২ সালে স্থানীয় হোসেনপুর ডিগ্রি কলজে থেকে এইচএসসিতে অংশ নিয়ে জিপিএ-৩.৯০ এবং ২০১০ সালে বাড়ীর পার্শ্ববর্তী নিউ পাকেরহাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে অংশ নিয়ে জিপিএ-৩.১৯ প্রাপ্ত হয়। ইমরানের পিতা কথা বলার এক পর্যায়ে বলেন, এগারো বছর বয়সে লোকমুখে খবর শুনে পার্শ্ববর্তী ঠাকুরগাঁও জেলার জনৈক ব্যক্তি ইমরানের সাথে তার মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসেন। তার মেয়েও জন্মের পর থেকে ভাত খেত না। মেয়েটি চালের তৈরি মুড়ি, পিঠা ও অন্যান্য খাবার খেত বলে জানা গেছে। তখন তার বয়স ছিল প্রায় ১৬ বছর এবং এসএসসি পাশ করেছে। ইমরানের সাথে আলাপকালে সে জানায়, ভাত না খাওয়ার বিষয়টি আমার বন্ধু-বান্ধবরা জানে। তাছাড়া দিনাজপুর শহরে মেসে থাকাকালীন তিন বেলা হোটেলে রুট পরোটা খাইতাম। আর কোথায় দাওয়াত খেতে গেলে সে ভাবে আয়োজন করা হয়। আমি ভাত না খেয়ে ভালো আছি। লেখাপড়া, কৃষিকাজ, গরু পালন, ব্যবসা ছাড়াও কম্পিউটার বিষয়ে আল-ইমরানের দক্ষতা রয়েছে। পড়ালেখা শেষে ভবিষ্যৎ জীবনে কাজ-কর্মের বিষয়ে জানতে চাইলে ইমরান বলে, বর্তমানে ঘুষ কালচারের যুগে বিনিময়ে সরকারি চাকরি নেয়ার ইচ্ছা আমার নেই। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করার ইচ্ছা আছে। আর যদি তা না হয়, তাহলে ব্যবসা পাশাপাশি গরু পালন করব। যার প্রস্তুতি হিসেবে পড়ালেখার পাশাপাশি ইতোমধ্যে ফ্রিজিয়ান জাতের একটি অস্ট্রেলিয়ান ষাঁড় পালন করছে ইমরান। এক বছর আগে পিতার দেওয়া অর্থ দিয়ে কোন এক বন্ধুর অনুপ্রেরণায় গরু পালন শুরু করে সে। সে জানায়, বর্তমানে গরুটির বাজার মূল্য প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার রয়েছে টাকার মত। -সময়ের কণ্ঠস্বর
Top