আ.লীগে কোন্দল, বিএনপিতে অস্বস্তি

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৮ | আপডেট: ৬:১৫:পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৮
আ.লীগে কোন্দল, বিএনপিতে অস্বস্তি

যশোর-৪ আসনে (অভয়নগর, বাঘারপাড়া ও যশোর সদরের বসুন্দিয়া ইউনিয়ন) বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী হাওয়া। অনেকটা আগে থেকেই এ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রার্থীদের প্রায় সবাই মাঠপর্যায়ে গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে নিজেদের প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন। কর্মী-সমর্থকরা তাদের পছন্দের প্রার্থীই এ আসনে একাদশ সংসদ নির্বাচনে উপযুক্ত দাবি করে সামাজিক গণমাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে নেতার পক্ষে জনগণের সমর্থন ও দোয়া চাইছেন। আর নেতারা যে যার মতো নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে। আবার প্রয়োজনমতো ছুটছেন ঢাকায়।

অভয়নগর ও বাঘারপাড়া উপজেলায় বিএনপিতে বিভক্তি কম থাকলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে রয়েছে চরম দলীয় কোন্দল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে আছেন। আর বিএনপির নেতাকর্মীরা বিভক্ত দুই ভাগে। ফলে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে আগামী নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রশ্নে আছে এক ধরনের অস্বস্তি। কোন্দলের কারণে দুই উপজেলাতেই দল দুটি বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও দলীয় কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করে থাকে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের পাঁচজন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) তিনজন, জাতীয় পাটির (এরশাদ) দুজন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির একজন এবং জাতীয় পার্টির (না-ফি) একজন রয়েছেন বলে নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। আসনটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। গত ১০টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাতবার বিজয়ী হয়েছেন, আর জোটের শরিকরা বিজয়ী হয়েছেন তিন বার।

আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেনÑ বর্তমান সাংসদ রণজিত কুমার রায়, অভয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও নওয়াপাড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র এলামুল হক বাবুল, জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ অধ্যক্ষ শেখ আবদুুল ওহাব, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য নাজমুল ইসলাম কাজল, সাবেক সাংসদ শাহ হাদিউজ্জামানের জ্যেষ্ঠ পুত্র উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ ফরিদ জাহাঙ্গীর। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য, যশোর জেলা সভাপতি ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবীর জাহিদ ১৪ দলীয় জোটের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেনÑ বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বাঘারপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব হোসেন এবং শ্রমিকদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও অভয়নগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফারাজী মতিয়ার রহমান। এ ছাড়াও বাঘারপাড়া উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবু তাহের সিদ্দিকী মনোনয়নের জন্য গণসংযোগ করছেন।

জাতীয় পার্টি (এরশাদ) থেকে কেন্দ্রীয় নেতা ও অভয়নগর উপজেলা সাধারণ সম্পাদক লে. কর্নেল (অব) শাব্বির আহম্মেদ ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আইনবিষয়ক সম্পাদক ও বাঘারপাড়া সভাপতি অ্যাডভোকেট জহুরুল হক জহিরও গণসংযোগ করে চলেছেন। জাতীয় পার্টি (না-ফি) থেকে সাবেক সাংসদ এমএম আমিন উদ্দিন জোটের মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।

এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে শাহ হাদিউজ্জামান ১৯৭০, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে বিএনপির প্রার্থী নাজিমউদ্দিন আল আজাদ ও ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপি থেকে অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাহ হাদিউজ্জামানকে হারিয়ে চারদলীয় জোটের প্রার্থী (বিজেপি) এম এম আমিনউদ্দিন নির্বাচিত হন। সীমানা পুনর্গঠনের আওতায় ২০০৮ সালে শুধু বাঘারপাড়া উপজেলা ও যশোর সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় যশোর-৪ আসন। ওই সময় আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান সাংসদ রণজিত রায় নির্বাচিত হন। অন্যদিকে অভয়নগর ও কেশবপুর উপজেলা এবং মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয় যশোর-৬ আসন। এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে অধ্যক্ষ শেখ আাদুল ওহাব নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আসন পুনর্গঠনের আওতায় ফের অভয়নগর, বাঘারপাড়া এবং সদরের বসুন্দিয়া ইউনিয়ন নিয়ে যশোর-৪ আসন গঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন রণজিত কুমার রায়।

যশোর-৪ আসনে আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান থাকলেও বর্তমানে দলের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক কোন্দল। নির্বাচন নিয়ে সাধারণ নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অধ্যক্ষ শেখ আবদুল ওহাব দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। তখন থেকে অভয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। এর পর অভয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক, পৌর কাউন্সিলর, শ্রমজীবী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা মোল্যা ওলিয়ার রহমান হত্যাকা-ের পর অভয়নগর আওয়ামী লীগের কোন্দল ব্যাপক আকার ধারণ করে। তখন উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যত তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

দীর্ঘদিন অভয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি নেই। শুধু সাধারণ সম্পাদক দিয়েই চলছে দলীয় কার্যক্রম। সর্বশেষ ২০১৩ সালে সম্মেলন হলেও এখনো এ উপজেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। এখানে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অন্তত চার ভাগে বিভক্ত। দলীয় কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করা হয়ে থাকে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক বাবুল একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। দলীয় বিভেদ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমার দৃষ্টিতে দলে কোনো বিভেদ দেখি না।

বাঘারপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে বর্তমান সাংসদ রণজিত কুমার রায় এবং যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য নাজমুল ইসলাম কাজলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন দলীয় কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করে আসছেন। নাজমুল ইসলাম কাজল বলেন, বাঘারপাড়া উপজেলায় ২০০৪ সালের পর আর সম্মেলন হয়নি। এ উপজেলার সাধারণ সম্পাদকসহ নয়টি ইউনিয়নের ছয়জন চেয়ারম্যান এবং অধিকাংশ নেতাকর্মী আমার পক্ষে রয়েছে। আমি ইতোমধ্যে এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছি।

বিএনপির নেতাকর্মীরা ব্যাপকভাবে সক্রিয় হতে পারছে না মামলার কারণে। একাধিক মামলা থাকায় নেতাকর্মীরা অস্বস্তিতে রয়েছেন। দুটি উপজেলাতেই বিএনপির মধ্যে দলীয় কোন্দল রয়েছে, তবে সেটা আওয়ামী লীগের তুলনায় কিছুটা কম। ২০০৯ সালের পর অভয়নগরে দলটির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। এ উপজেলায় সভাপতি ফারাজী মতিয়ার রহমান ও সাধারণ সম্পাদক কাজী গোলাম হায়দার ডাবলু একটি গ্রুপের এবং বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি নূরুল হক মোল্যা ও জেলা বিএনপির সদস্য মশিয়ার রহমান মশি অপর গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছেন। দলীয় কর্মসূচি তারা পৃথকভাবে পালন করে থাকেন। ফারাজী মতিয়ার রহমান উপজেলা বিএনপিতে দুটি গ্রুপের কথা স্বীকার করে বলেন, প্রতিপক্ষ গ্রুপ বাস্তবে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে না। উপজেলা কমিটির কেউ ওদের পক্ষে নেই। এবার আমি মনোনয়ন চাইব।

দীর্ঘদিন বাঘারপাড়া বিএনপিতে দলীয় কোন্দল না থাকলেও গত দুই বছর ধরে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা আবু তাহের সিদ্দিকী একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে মুঠোফোনে তিনি (আবু তাহের সিদ্দিকী) এ প্রতিনিধিকে জানান। বাঘারপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুব হোসেন দলীয় মনোনয়ন পাবেন এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বড় দলের মধ্যে কোন্দল সব জায়গাতেই থাকবে। কমিটির নেতাকর্মীরা সবাই আমার সঙ্গে আছে। প্রতিপক্ষরা বাইরে দলীয় কোনো কর্মসূচি পালন করে না। ঘরের মধ্যে মিটিং করে বিবৃতি দিয়ে থাকে।

জাতীয় পার্টির (এরশাদ) নেতাকর্মীদের দাবি, দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ইতোমধ্যে এ আসনে তাদের দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছেন। সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য লে. কর্নেল (অব) শাব্বির আহম্মেদ দলীয় প্রার্থী বলে জানা গেছে।