উপকূলীয় পানি সংকটে বৃষ্টির পানির সঠিক সংরক্ষণ ও ব্যবহার জরুরি

শিখন ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বিষয়ক কর্মশালায় বক্তারা

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৬:০৮ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৫, ২০১৭ | আপডেট: ৬:০৮:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৫, ২০১৭
উপকূলীয় পানি সংকটে বৃষ্টির পানির সঠিক সংরক্ষণ ও ব্যবহার জরুরি
বাগেরহাট ::  পানির সঙ্গে পরিবেশের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গেও সম্পর্ক।  শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবনের পূর্বপান্ত শরণখোলা থেকে পশ্চিমপ্রান্ত শ্যামনগর প্রযন্ত ১৬ উপজেলার ৫০ লাখ মানুষ ভুগছে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে। বিশেষকরে বাগেরহাটের উপকূলীয় উপজেলা শরণখোলা, মংলা, চিতলমারী; খুলনার কয়রা, দাকোপ, পাইকগাছা; সাতক্ষীরার শ্যামনগরে এ সংকট ভয়াবহ। এছাড়াও, খুলনার ডুমুড়িয়া, কয়রা, বটিয়াঘাটা; সাতক্ষীরার আশাশুনি, কালিগঞ্জ, দেবহাটা, তালা; এবং সদর, রামপাল ও মোড়েলগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামের অধিবাসীরা এখনো বিশুদ্ধ পানি বঞ্চিত। সুপেয় পানির সংকট সমাধানে, ভরাট হওয়া সরকারি পুকুর ও খাল-নদী সংস্কার এবং পানির উৎসের লিজ বন্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা, একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণসহ  সুপেয় পানির বিকল্প ব্যবস্থা রাখার পাশাপাশি, গ্রামাঞ্চলভিত্তিক সমন্বিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন বাগেরহাটে বৃষ্টির পানি সংরক্ষন বিষয়ক এক শিখন ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বিষয়ক কর্মশালায় বক্তারা।
গতকাল শনিবার সকালে শহরের দশানীস্থ একটি অভিজাত হোটেলে বাংলাদেশ ওয়াটার পার্টনারশিপ ও গ্লোবাল ওয়াটার পার্টনারশিপ সহযোগিতায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সোস্যাল ইকোনোমিক ডেভলপমেন্ট সোসাইটি আয়োজিত কর্মশালায় বক্তারা এ দাবি করেন। এতে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রধান, জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সুবিধাবঞ্চিত মানুষ ও যুব প্রতিনিধিরা অংশ নেন। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমিয়ে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা, প্রবেশগম্যতা ও গুণাগুণ যেমন বাড়ানো প্রয়োজন, তেমনি সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে ফলপ্রসূ করতে টেকসই বিনিয়োগও দরকার। বৃষ্টির পানি ধরে রেখে ব্যবহারের জনপ্রিয় করতে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও জনসচেতনতা তৈরি করতে পানির ন্যয্যতা আদায়ে তরুণরা সংঘবদ্ধ হয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে পারে বলেও তারা মতামত ব্যক্ত করেছেন বক্তারা ।
বাগেরহাট সদর উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা ফজলে এলাহির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাগেরহাট সদর উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা ফজলে এলাহির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিকের  বাগেরহাট জেলা কমিটির সভাপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোজাফ্ফর হোসেন। মূল আলোচক ছিলেন বৃষ্টির পানি সংরক্ষনের মাধ্যমে মূল্যবান সুপেয় পানি নিশ্চিতকরণ প্রকল্পটির পারিচালক সোহানুর রহমান।  অনুষ্ঠানে বিশেষ আলোচক ছিলেন ভয়েস অব সাউথ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম। এসময় আরো বক্তব্য রাখেন সোস্যাল ইকনোমিক ডেভলপমেন্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক হাবিবুর রহমান তালুকদার, উদয়ন বাংলাদেশের প্রধান সম্বনয়কারী মো. শফিকুল ইসলাম মিলন, যুব প্রতিনিধি হাসিবা তাসনিম, সাংবাদিক সৈয়দ শওকত হোসেন, ভয়েস অব সাউথ বাংলাদেশের প্রোগাম অফিসার বিথি সাহা, ট্রেনিং অফিসার আফরিন হামিম, প্রোগাম কো-অর্ডিনেটর নাসরিন রহমান, ইউনেসেফের  প্রতিনিধি তাজুল ইসলাম প্রমুখ।
মরক্কোর রাজকীয় শহর মারাকাশে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক ২২তম সম্মেলনে পানি বিষয়ে একটি সম্মানজনক পুরষ্কার জিতে বাংলাদেশি যুবক সোহানুর রহমান। অংশগ্রহণকারী ১৭৮টি দেশের মধ্যে গ্লোবাল কম্পিটিশনের মাধ্যমে সোহানুর রহমানকে এ পুরষ্কারের জন্য বিজয়ী ঘোষণা করে সুইডেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা গ্লোবাল ওয়াটার পার্টনারশীপ । এই ‘ইয়ূথ ফর ওয়াটার অ্যান্ড ক্লাইমেট অ্যাওয়ার্ড’  সম্মাননা বাংলাদেশের জন্য বিরল।  যুব সমপ্রদায়কে পানি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে অর্ন্তভূক্ত করতে তাদের ক্ষমতায়ন এবং দক্ষতা উন্নয়নই ছিল এই গ্লোবাল কম্পিটিশনের মূল লক্ষ্য। এক হাজার ইউরো অনুদান দিয়ে সোহান যুব বিশেষজ্ঞ হিসেবে ‘সেইফ ওয়াটার ফর লাইফ’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন। বাংলাদেশ ওয়াটার পার্টনারশিপের তত্বাবধান এবং উন্নয়ন সংস্থা সোশ্যাল ইকোনোমিক ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির বাস্তবায়নে ছয় মাসব্যাপী এ প্রকল্পের মাধ্যমে বাগেরহাট জেলার লবণাক্ততা প্রবণ শরণখোলার হতদরিদ্র মানুষের নিরাপদ খাবার পানি নিশ্চিতকল্পে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে তরুণদের সামাজিক সহায়ক হিসেবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় ।
প্রকল্পের সমাপনী উপলক্ষে  কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্যপত্রে  আর্ন্তজাতিক যুব পানি  ও জলবায়ু অ্যাওর্য়াড বিজয়ী সোহানুর রহমান বলেন,  খুলনাসহ দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলীয় মানুষের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংগে লড়াই নিরন্তর। সিডর, আইলার মতো প্রলয়ঙ্করী ঘুর্নিঝড়, জ্বলোচ্ছাস এই অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। নানা সংকটের মধ্য পানীয় জলের অভাবই প্রধান। বঙ্গোপসাগর থেকে সুন্দরবনে ঢোকা লোনা পানির প্রভাব কাটানোর জন্য নদ-নদীতে যে পরিমাণ মিঠা পানির প্রভাব থাকা দরকার, তা বছরের মে থেকে নভেম্বর পযর্ন্ত না থাকায় সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছেই। নদীগুলো খরস্রোতা না হওয়ায় কমে গেছে মিঠা পানির প্রবাহ। যার কুপ্রভাব পড়ছে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে। যদিও উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির অভাব দীর্ঘকালের। এই বাস্তবতায় বৃষ্টির পানি ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। বৃষ্টির পানির সুবিধা হচ্ছে, এর মান ভালো ও হাতের নাগালে পাওয়া যায়। পানিকে মৌলিক অধিকার এবং জনগুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে চিহ্নিত করে এ খাতে প্রয়োজনীয় ন্যায্যতাভিত্তিক বাজেট বরাদ্দ ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষ করে নদী ভাঙন এলাকা, লবণাক্ত প্রবণ এবং ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকার সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সুপেয় পানি নিশ্চিতকরণে ব্যাপক কর্মসূচি ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করতে হবে।
ভয়েস অব সাউথ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন,   ২০০৭ সালে ‘সিডর’ এবং ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’য় উপকূলের সুপেয় পানির উৎসগুলো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সুপেয় পানির বিষয়টি মহাসংকটে রূপ নেয়। এখন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে উপকূলীয় নদ-নদীতে লবনাক্ততার পরিমাণ গ্রহণযোগ্য মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে উপকূলের জীবন-জীবিকা চরম সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অতিরিক্ত লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় এক কলস সুপেয় পানি সংগ্রহের জন্য এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে ছুটতে হয় বাসিন্দাদের। অনেকক্ষেত্রে সুপেয় পানির অভাবে বাধ্য হয়ে তাদের লবণাক্ত পানি পান করতে হচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে নারীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও শিশুবিবাহ। বিশুদ্ধ পানির অভাবের কারনে গর্ভাবস্থায় মায়েরা লবণাক্ত পানি পান করছেন, যা শিশুস্বাস্থ্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। লবনাক্ততায় আক্রান্ত এলাকায় সন্তানসম্ভবা মায়েদের উচ্চ রক্তচাপ জনিত সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।  প্রি-একলেম্পশিয়া রোগ দেখা দেয়ায় মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হারও বাড়ছে। শিশুদের মধ্যে দেখা দিচ্ছে পেটের পীড়া ও চর্মরোগ।
২০৩০ সাল মেয়াদি এসডিজিতে যে ১৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তার মধ্যে পানি ও স্যানিটেশন ছয় নম্বরে রয়েছে। এসডিজি-৬ এ সবার জন্য স্যানিটেশন ও পানির সহজলভ্যতা এবং এর টেকসই ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে। নিরাপদ পানীয় জল ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় সবার অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সমপ্রসারণ, পানি পরিশোধন, দূষিত পানি ব্যবস্থাপনা, পানির অপ্রতুলতা ও কার্যকর ব্যবহার, পানির উৎসসমূহের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, জলজ ব্যবস্থা সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে এতে। পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনায় কমিউনিটিভিত্তিক অংশগ্রহণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথাও বলা হয়েছে। কর্মশালায় বক্তরা বাগেরহাটের উপকুলীয় এলাকায় লবণ পানির ক্ষতিকর দিক ও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। মূলত দুর্বল পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার কারণে বৃহত্তর খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ সুপেয় পানির চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে বক্তারা চিহ্নিত করেন।  উপকুলীয় অঞ্চলের সুপেয় পানি সমস্যার জন্য সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি ও শহরমুখী পানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনাকেও দায়ী করছেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক আন্দোলনের নেতারা।  তাই সংকট মোকাবিলায় নাগরিক ও যুব অংশগহ্রন বৃদ্ধিসহ সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরো বেশি কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। উপকূলীয় এলাকার মানুষের নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করার দাবি তাদের।