কান্নাই ভরসা বিএনপির

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ২:০৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮ | আপডেট: ২:০৬:অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮
কান্নাই ভরসা বিএনপির
  • প্রতিবাদে ব্যর্থ নেতাকর্মীরা
  •  ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক
  • সবকিছুই নির্ভর করছে খালেদার জামিন পাওয়া না পাওয়ার ওপর
  •  আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে ব্রিফ

খালেদা জিয়ার সাজার প্রতিবাদে গতকাল বাদ জুমা বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট থেকে শত শত নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে এলে পুলিশ বেশ কজন নেতাকর্মীকে আটক করে –এম খোকন সিকদার
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদ- দেওয়ায় চাপাক্ষোভ আর হতাশা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক চাপে এমনিতেই বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দাঁড়াতে পারছে না। তার ওপর দলীয় প্রধানের কারাবাস তাদের বোবা কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিৎকার করে কাঁদতেও পারছে না জেল-জুলুমের ভয়ে। ফলে বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি দিয়েও গতকাল সামান্যতম জমায়েত করতে পারেনি দলটি। যদিও খালেদা জিয়া আদালতে যাওয়ার সময় সর্বোচ্চ নিরাপত্তার মধ্যেও সঙ্গে ছিল হাজার হাজার নেতাকর্মী আর সমর্থক।

তখন পুলিশি বাধাকেও তাদের কাছে কোনো বাধা বলে মনে হয়নি, এমনই চিত্র দেখা গিয়েছিল বৃহস্পতিবার। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়ের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-মিছিল করেছে দলের কর্মীরা। গতকাল রাজধানীতে জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মিছিলটি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে নয়াপল্টনে দলের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। এসময় কার্যালয়ের কাছাকাছি স্কাউট ভবনের সামনে থেকে চারজনকে আটক করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আজও তারা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করবে। এবং পরবর্তী কর্মসূচি কি হবে তা পরে জানানো হবে বলে বলেছেন দলীয় মহাসচিব। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি আগামী নির্বাচনকে মাথায় রেখে কর্মসূচি দিচ্ছে। কারণ খালেদা জিয়াকে সাজা দেওয়ায় জনসমর্থন বিএনপির দিকে বাড়ছে। ফলে ব্যাপক কর্মসূচি দিলে জনমত পাল্টে যেতে পারে। তারপরও সবকিছু নির্ভর করছে খালেদা জিয়ার জামিন পাওয়া না পাওয়ার ওপর। বা জামিন দিতে কতটা বিলম্ব হয় তার ওপর। তবে অন্যান্য মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় জামিন পেলেও তাকে আটক থাকতে হবে। তখন বিএনপি কি কৌশল নেয় তাও অনেকের ভাবনায় রয়েছে। ফলে সবকিছু মিলিয়ে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থায় রয়েছে বিএনপি।

অনেকেই বলছেন, খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ায় তার নেতাকর্মীরা নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগছেন। যদিও তার বড় ছেলে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিদেশে বসেই দলের দিকনির্দেশনা দেবেন। এরই মধ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণার পর গত বৃহস্পতিবার রাতে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়Ñ ‘গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।’ যদিও এই মামলায় বর্তমানে লন্ডনে নির্বাসনে থাকা তারেক রহমানেরও ১০ বছরের কারাদ- ও আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। ২০১৬ সালে মুদ্রাপাচারের আরেকটি মামলায় তাকে সাত বছরের কারাদ- দেওয়া হয়। বিগত ওয়ান-ইলেভেনের সময় গ্রেপ্তার বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান। পরে তিনি সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভ করেন। এদিকে খালেদা জিয়াকে আসলে ঠিক কত দিন জেলে থাকতে হতে পারে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে রায়ের সত্যায়িত কপি হাতে পাওয়ার পরই কেবল খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আপিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। এপরই জামিনের বিষয়। এর আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে বন্দি থাকতে হবে। এই রায়ের কপি পাওয়ার কোনো সময়সীমাও নেই। এ বিষয়ে আইনবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহদীন মালিক বলছেন, কপিপেতে সময়সীমা বাধা নেই। তবে সার্টিফায়েড কপির আগে টাইপ করা কপি যাকে বলা হয় ট্রু কপিÑ সেটা হয়তো আইনজীবীরা আগামী সপ্তাহের প্রথম দিকেই পেয়ে যেতে পারেন এমন কথা শোনা গেছে। তাহলে তারা হয়তো আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝিই আপিল দায়ের করবেন, হয়তো আপিলের সাথেই জামিনের আবেদনও করবেন। আইনি প্রক্রিয়ায় যেটা হয়, নারীদের ব্যাপারে, বয়স বেশি হলে বা সাজা কম বলেÑ কারণ এটা যাবজ্জীবন কারাদ- নয় এবং পাঁচ বছরের কারাদ-কে কম সাজাই বলতে হবে। তাই এসব বিবেচনায় হয়তো জামিন হয়ে যেতে পারে বলেও তিনি মনে করেন। এক বা দুই সপ্তাহে ছাড়া পেয়ে গেলেও এক অর্থে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন, রাজনৈতিক কর্মকা-ও শুরু করতে পারবেন। এদিকে এক বিবৃতিতে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সরকারের সমালোচনা করে বলেন, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। দেশের জনগণ বর্তমান একদলীয় স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে মুক্তি পেতে একটা গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় ফেরত যাওয়ার জন্য ব্যাকুলভাবে অপেক্ষা করছে।

সে সময় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এ ধরনের রাজনৈতিক আক্রমণের মাধ্যমে শাসক দল জনগণের সামনে নিজেদের ভীতিকর চেহারাটাই উন্মোচন করেছে। তিনি বলেন, এ সরকার বাকস্বাধীনতা হরণ করেছে, স্বাধীনভাবে তথ্য ও মতপ্রকাশে বাধা দিচ্ছে। গণতন্ত্রকে টেকসই করতে দেশের যেসব প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি সেক্টরই বর্তমান সরকারের দলীয়করণের কবলে পড়েছে। এই স্বৈরাচারী সরকার দেশের জনগণকেই জিম্মি করতে চাচ্ছে। খালেদা জিয়ার মামলা এবং তাকে জেলে প্রেরণসহ চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশে কর্মরত বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকর্মীর কাছে ব্রিফিং করছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বিকাল সোয়া ৪টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ ব্রিফিং হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, এপি, এফপি, জার্মান রেডিও ডয়চে ভেলে ইত্যাদি। বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, দেশে অবস্থানরত বিদেশি গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে বিএনপির পক্ষ থেকে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলাসংক্রান্ত ও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবহিত করতেই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। তবে এখানে দেশি গণমাধ্যমকর্মীদের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি। বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, নজরুল ইসলাম খান, বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আন্তর্জাতিক সম্পাদক ব্যারিস্টার নওশাদ জমির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পাঁচ বছরের কারাদ- দিয়েছেন আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার বকশিবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত-৫ এ রায় ঘোষণা করেন।

বয়স ও সামাজিক মর্যাদার কথা বিবেচনা করে খালেদা জিয়ার পাঁচ বছর কারাদ- দিয়েছেন আদালত। যদিও একই অভিযোগে তার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পাঁচজনের ১০ বছর সশ্রম কারাদ- দিয়েছেন আদালত। মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ১২ দশমিক ৫৫ লাখ মার্কিন ডলার আসে, যা বাংলাদেশি টাকায় তৎকালীন ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ১৯৯১ সালের ৯ জুন থেকে ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ অর্থ দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানায় না দিয়ে অস্তিত্ববিহীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠন করেন। অথচ কোনো নীতিমালা তিনি তৈরি করেননি, করেননি কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থাও। অথচ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা অস্তিত্ববিহীন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে পাঠান। পরে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন। যে কারণে তিনি দায়ী। আমার সংবাদ