বরিশাল চরকাউয়া বাস মালিক সমিতি থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন আ’লীগ নেতা ছবি

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০১৭ | আপডেট: ১২:৩৮:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৪, ২০১৭
বরিশাল চরকাউয়া বাস মালিক সমিতি থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন আ’লীগ নেতা ছবি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ দেশব্যাপী এক আইন আর বিএনপির অভিভাবকখ্যাত সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনিরুল ইসলাম ছবির নির্বাচনী ইউনিয়ন চরকাউয়ায় চলে ভিন্ন আইন। সম্প্রতি তাকে নিয়ে অনুসন্ধানে নামলে এমন তথ্যই উঠে আসে। বেড়িয়ে এসেছে শুধু দলের পরিচয় বহন করে কোন আইনই মানছেন না বির্তকিত এই ইউপি চেয়ারম্যান। সরকারি দফতরে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অবৈধকে বৈধ সাজিয়ে বছরের পর বছর নিজের আখের গোছাচ্ছেন। ‘নূন্যতমও আইন মানেন না ছবি ভাই’ বলছিলেন বিআরটিএ বরিশালের শীর্ষ পদে থাকা এক কর্মকর্তা। যদিও তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি। তবে জানিয়েছেন, সে পলিটিক্যাল লোক। তার বিরুদ্ধে কথা বলাটা আমার সাজে না। ধরুন আজ মুখ খুললাম, কাল আমার বদলী হযে যাবে। ফলে ছবি চেয়্যারম্যানের প্রশ্নে সরকারি অফিসের কর্মকর্তারাও থাকেন চুপচাপ। মনিরুল ইসলাম ছবির দখলে থাকা চরকাউয়া বাস মালিক সমিতির আওতায় চলমান বাস সার্ভিসে যাত্রী অধিকার বাস্তবায়ন হয় না। আবার বিভিন্ন অজুহাতে দৈনিক বিভিন্ন অঙ্কের চাঁদা আদায় করা হয়। বিআরটিএ বরিশালের উপ-পরিচালক মোঃ শাহ আলম বলেন, যাত্রীবহনকারী বাস থেকে সরকার নির্ধারিত নিয়মে সবোর্চ্চ ৪০ টাকা উত্তোলন করতে পারবে বাস মালিক সমিতি। এর বেশি কোথাও আদায় হলে তা নিয়ম বর্হিভূত।

তবে চরকাউয়া বাস মালিক সমিতির একাধিক বাস মালিকের সাথে আলাপ করে জানা গেল অদ্ভুত তথ্য। সরকার নির্ধারিত পরিমানের প্রায় সাড়ে চারগুন বেশি টাকা উত্তোলন করা হয় প্রতিটি বাস থেকে। বাস মালিক ফয়সাল মোল্লা বলেন, বাস মালিক সমিতির সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমরা দৈনিক মালিক সমিতিকে ১৫০ টাকা এবং স্ট্যান্ড ফি ৩০ টাকা করে দেই। এটি সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি কিন্তু বাস মালিকরা কেন দিচ্ছেন? এমন প্রশ্নের কোন জবাব দেননি ফয়সাল মোল্লা।

অপর এক বাস মালিক যিনি এর আগের কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন তিনি জানিয়েছেন, ১৮০ টাকা নিয়ে থাকে বাস মালিক সমিতির নামে। এ ছাড়াও অন্যান্য আরও খাত রয়েছে যেখানে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। চাঁদা দিতে দিতে বাস মালিকরা হয়রান হয়ে উঠেছি।

বাসস্ট্যান্ডেই কথা হয় কয়েকজন শ্রমিকের সাথে। শ্রমিকরা জানান, ছবি চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্তের বিপরীতে কথা বলেছি জানতে পারলে বাস চলাচলের রুট-পারমিট বাতিল করে দিবে। বাস মালিকরা মুঠোফোনে জানান, যে যাত্রী হয় তা দিয়ে মোটামুটি ভালোই চলে। কিন্তু বাস মালিক সমিতির নিত্য নৈমেত্যিক অজুহাতের টাকা দিতে দিতে আমরা ক্লান্ত।

বাস মালিকরা দাবী করেন, পূর্বে ২৫০ টাকা ও আরও ৫০ টাকা দৈনিক জমা দিতে হতো। মাঝখানে ১৮০ টাকা করা হয়েছিল। কিন্তু বরিশাল সদর উপজেলা আলীগের সভাপতি ছবি চেয়ারম্যান স্ট্যান্ড দখল করার পর ওই একই রেট বহাল রয়েছে। জানা গেছে, এই বাস মালিক সমিতির আওতায় অর্ধশত বাস চলাচল করে। এভাবে বাস থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে ৩২ লাখ টাকার চাঁদা উত্তোলিত হয়। এত বিশাল অংকের টাকা গচ্ছিত রাখতে নেই মালিক সমিতির কোন ব্যাংক একাউন্ট। ফলে সমিতির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ তিরস্কার করে জানান, ছবি চেয়রম্যানের পকেটই হচ্ছে বাস মালিক সমিতির ব্যাংক একাউন্ট।

বাস মালিক সমিতি দাবী করেছে, স্ট্যান্ড ভাড়া প্রদানের জন্য ওই টাকা উত্তোলন করে থাকে। অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে বাৎসরিক এই বিপুল পরিমান অর্থ উত্তোলন হলেও স্ট্যান্ড খরচ, বন্দর থানা ম্যানেজ এবং ট্রাফিক বিভাগ ম্যানেজ করতে মাত্র দেড় লাখ টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে চরকাউয়া আহমোদীয়া ফাজিল মাদ্রাসার জমি ব্যবহার করে স্ট্যান্ড কাজ পরিচালনা করায় মাসিক ভাড়া প্রদান করেন ৩০০০টাকা। বাস মালিক সমিতির নির্ভযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বন্দর থানা কর্তৃপক্ষকে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা এবং ট্রাফিক বিভাগকে ৫ হাজার টাকা প্রদান করে ম্যানেজ করেন মনিরুল ইসলাম ছবি। ওই সূত্রের দাবী, বাস স্ট্যান্ডের ‘স্ট্রাটার’ তপন বাবু উল্লেখিত টাকা সংশ্লিষ্ট দফতরে পৌঁছে দিয়ে আসেন। বাকি ৩০ লাখ টাকার হদিস পাওয়া যায়না। ধারণা করা হচ্ছে বাস থেকে দৈনিক উত্তেলিত এই বৃহৎ অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন মনিরুল ইসলাম ছবি।

তবে চরকাউয়া বাস মালিক সমিতি থেকে ট্রাফিক বিভাগকে টাকা দেওয়ার কোন সুযোগ নেই উল্লেখ করে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (ট্রাফিক) উত্তম পাল বলেন, ট্রাফিক বিভাগ অন্যায়ের সাথে আপোস করে না। যদি কেউ এমন দাবী করে তা তিনি সঠিক বলেন নি। একই সাথে সদর উপজেলাধীন চরকাউয়া বাসস্ট্যান্ট দেখভালের দায়িত্ব সরাসরি তাদের নয় বলে জানান এই কর্মকর্তা।

যদিও মনিরুল ইসলাম ছবি জানিয়েছেন, সমিতির সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাস থেকে স্ট্যান্ড খরচ বাবদ নির্ধারিত টাকা উত্তোলন করা হয়। এখান থেকে টাকা আত্মসাতের সুযোগ নেই। সরকার নির্ধারিত টাকার সাড়ে চারগুন বেশি আদায়ের প্রশ্নে কোন জাবাব দেননি বাস মালিক সমিতির এই সভাপতি। ইউিনয়ন পরিষদে সাক্ষাৎকার গ্রহনকালে তিনি জানান, আপনারা লেখেন। আমিও আপনাদের বিরুদ্ধে বাংলায় না পারি ইংরেজীতে লেখাবো। আমার ভাইপোও ডেইলি স্টারের সাংবাদিক। ওদিকে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, চরকাউয়া বাস মালিক সমিতি থেকে যে কয়টি রুটে বাস চলাচল করে তার কোথাও যাত্রীদের টিকিট প্রদান করা হয় না। সুমন নামে একজন বাসযাত্রী তার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলেন, চলতি বছরের ২১ অক্টোবর চরকাউয়া থেকে লাহারহাট যাবার জন্য বাসে উঠি। ভাড়া দিয়ে টিকেট চাইলে কন্ডাক্টর বলেন টিকিট নাই। আবারও চাইলে বলে, টিকিট দেয়া নিষেধ। এ বিষয়ে বিআরটিএ বরিশালের উপ-পরিচালক মোঃ শাহ-আলম বলেন, প্রত্যেক যাত্রীকে টিকিট প্রদান করা বাধ্যতামূলক। চরকাউয়ায় যদি টিকিট দেয়া না হয় তাহলে অতিদ্রুত সেখানে অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বরিশাল জেলা প্রশাসক মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, বিষয়টি দেখভালের দায়িত্ব বিআরটিএ’র। তবে অনিয়মের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করবেন বলে জানান তিনি।