বরিশাল সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে তৎপর একাধিক প্রার্থী

নির্বাচনী হাওয়া

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১১:১৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০১৮ | আপডেট: ১১:১৯:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৩০, ২০১৮

আযাদ আলাউদ্দীন বরিশাল ব্যুরো: নির্বাচনের কয়েক মাস বাকি থাকলেও প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত র চতুর্থ মেয়াদের নির্বাচনে কারা হচ্ছেন মেয়র পদে প্রার্থী, তা নিয়ে জোরালোভাবে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে প্রধান দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা কৌশলে যে যার মতো করে কেন্দ্র থেকে শুরু করে মাঠ গোছাতে দলীয় নেতাকর্মী ও তৃণমূল পর্যায়ের ভোটারদের সাথে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তবে নতুন আলোচিত খবর হচ্ছে বরিশাল সিটি করপোরেশনের এই নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী দিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী; যে কারণে পাল্টে যাচ্ছে প্রার্থী ও ভোটের বিভিন্ন সমীকরণ।

জানা গেছে, সর্বশেষ নির্বাচনের তারিখ ধরা হলে এ বছরের জুন মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। তফসিল ঘোষণা হতে পারে মার্চ বা এপ্রিলে। সে হিসাবে নির্বাচনের আর পাঁচ মাসও বাকি নেই। আর সে কারণেই আগেভাগে মাঠে নেমেছেন মেয়র পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। সাথে যুক্ত হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেয়ার বিষয়টি। বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিগত নির্বাচনগুলোতে জামায়াতে ইসলামী জোটের স্বার্থে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে গেলেও এবার আর তেমনটি থাকছে না।

কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আলোকে এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হচ্ছেন দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও বরিশাল মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির অ্যাডভোকেট মুয়ায্যম হোসাইন হেলাল। এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে কে পাচ্ছেন মেয়র পদে মনোনয়ন, তা নিয়ে ৬৫ বর্গ কিলোমিটারের বরিশাল নগরজুড়ে চলছে বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ।

 

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি দলীয় মনোনয়ন প্রশ্নে অনেকটাই নির্ভাবনায় ছিল আওয়ামী লীগ। গত বছরের ৮ এপ্রিল বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের একটি সভায় দলীয় এককপ্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রের কাছে মনোনয়ন চাওয়ার জন্য বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এমপির জ্যেষ্ঠপুত্র ও মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর নাম চূড়ান্ত করা হয়েছিল।

তা ছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত বছর বরিশাল সফরকালে অনুষ্ঠিত জনসভায় স্থানীয় প্রায় প্রত্যেক নেতা তাদের বক্তব্যে সাদিক আবদুল্লাহকে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন দেয়ার জোর দাবি জানান।

এ দিকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার আলোচনায় আছেন সাদিক আবদুল্লাহর চাচা ও শহীদ আবদুর রব সেরনিয়াবাতের ছোট ছেলে এবং আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছোট ভাই আবুল খায়ের আবদুল্লাহ খোকন সেরনিয়াবাত।

সূত্র মতে, চাচা খোকন সেরনিয়াবাত ও ভাতিজা সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ছাড়াও সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছেন কর্নেল অব: জাহিদ ফারুক শামিম। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ (সদর) আসনের নির্বাচনে অংশ নেন বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন শামিম।

ওই সময় তিনি (শামিম) বরিশালের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের পক্ষে সর্বোচ্চ ৯৯ হাজার ৬২৪ ভোট পেয়েছিলেন। ২০১৪ সালের ৯ এপ্রিল সাবেক মেয়র ও সংসদ সদস্য বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি শওকত হোসেন হিরণের মৃত্যুর পর জাহিদ ফারুক শামিমকে মরহুম হিরণের পদে (মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি) অধিষ্ঠিত করার গুঞ্জন উঠেছিল।

পরে ওই পদে দায়িত্ব দেয়া হয় শহর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট গোলাম আব্বাস চৌধুরী দুলালকে। এর আগে ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসনে জাহিদ ফারুক শামিম আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। সেই সময় সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে হিরণ পরাজিত হওয়ায় মানবিক দৃষ্টিকোণে দল থেকে তাকেই (হিরণ) মনোনয়ন দেয়ার পর তিনি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। হিরণের মৃত্যুর পর বরিশাল-৫ আসনে ২০১৪ সালের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন জাহিদ ফারুক শামিম। শেষ পর্যন্ত শওকত হোসেন হিরণের পরিবারের কথা বিবেচনা করে হিরণের স্ত্রী জেবুন্নেছা আফরোজকে মনোনয়ন দেয়ার পর তিনি বিজয়ী হন।

মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন প্রশ্নে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের প্যানেল স্পিকার অ্যাডভোকেট তালুকদার মো: ইউনুস বলেন, দলের কাছে যেকোনো নেতা মনোনয়ন চাইতেই পারেন। তবে কেন্দ্র থেকে যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে তার জন্যই মাঠে নেমে শতভাগ বিজয় নিশ্চিতকরণে সবাইকে কাজ করতে হবে।

বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রশ্নে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপির ভেতরেও চলছে নানা জটিলতা। তবে বরিশাল বিএনপির নীতিনির্ধারক হিসেবে সব সময়ই অগ্রণী ভূমিকায় থাকেন দলের যুগ্ম মহাসচিব ও সাবেক মেয়র অ্যাডভোকেট মো: মজিবর রহমান সরোয়ার। তিনি নিজে মনোনয়ন চাইলে অন্য কেউ এবার মনোনয়ন নাও পেতে পারেন। তবে তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, তিনি এবার মেয়রের চেয়ে এমপি পদে নির্বাচনে বেশি আগ্রহী।

বর্তমান মেয়র বিএনপি নেতা আহসান হাবিব কামাল আবারো দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। এ ছাড়াও মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিন, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু, মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন সিকদার ও ছাত্রদল নেত্রী আফরোজা খানম নাসরিন।
এবায়েদুল হক চাঁন বরিশাল বিএনপিতে ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিত। ২০১৩ সালে তিনি মেয়র পদে প্রার্থী হয়েও দলীয় সিদ্ধান্তে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। ওই কারণে এবার তিনি প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

আর সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু ২০০৮ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনেক ভোট পেয়ে চমক সৃষ্টি করেন। এককভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মাত্র ৫০০ ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শওকত হোসেন হিরণের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি। সে কারণে দলীয় ইমেজের বাইরেও সাধারণ ভোটারদের কাছে তার আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
বর্তমান মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, মনোনয়ন প্রশ্নে দল যে সিদ্ধান্ত নেবে তা-ই আমার সিদ্ধান্ত। তবে অ্যাডভোকেট মো: মজিবর রহমান সরোয়ার নিজে প্রার্থী না হলে আহসান হাবিব কামালকে গত নির্বাচনের মতো এবারো কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন পাইয়ে দিতে পারেন বলে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে গুঞ্জন চলছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহানগর শাখা নায়েবে আমির অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম খসরু বলেন, ‘আমরা বরিশালে এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখানে দলের মেয়র প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত হয়ে আছেন বরিশাল মহানগর জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট মুয়ায্যম হোসাইন হেলাল। নির্বাচন কমিশন থেকে দলীয়ভাবে আমাদের প্রার্থিতা গ্রহণ করা না হলে স্বতন্ত্রভাবে একক নির্বাচন করব।’ নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী কমিটি রয়েছে দাবি করে অধ্যক্ষ খসরু আরো বলেন, নগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের সভাপতি সম্পাদকগণ মতামত দিয়ে আমাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছেন। মেয়র পদ ছাড়াও নগরীর বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে জামায়াতে ইসলামী কাউন্সিলর প্রার্থী চূড়ান্ত করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুয়ায্যম হোসাইন হেলাল বরিশাল ২০ দলীয় জোটের সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিগত ১০ বছরে রাজনৈতিক কারণে প্রায় ১৭টি মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে। পেশাদার আইনজীবী হিসেবেও তার সুনাম রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে কয়েকজনের নাম আলোচনায় থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে এখনো প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন দলের নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মো: ফয়জুল করিম।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে মেয়র পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছেন অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী হয়ে মেয়র নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন ডা: মনীষা চক্রবর্তী। সূত্র: নয়াদিগন্ত