মা-শাশুড়ির সঙ্গে থাকলে সন্তান কমে!

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ২:৪৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০১৭ | আপডেট: ২:৪৩:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০১৭
মা-শাশুড়ির সঙ্গে থাকলে সন্তান কমে!

প্রতীকী ছবি।

শাশুড়ি বা মায়ের উপস্থিতি প্রভাব ফেলে নারীর প্রজননের (ফার্টিলিটি) ওপর। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রজননক্ষম নারী নিজের মা বা শাশুড়ির সঙ্গে একই পরিবারে বাস করলে তাঁর সন্তানসন্ততি কম হয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে এমন হয়।

অস্ট্রিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার নৃবিজ্ঞান বিভাগের তিনজন গবেষক ১৪টি দেশের ২৪ লাখ ৭৮ হাজার ৩৮৩ জন বিবাহিত নারীর ওপর এই গবেষণা করেছেন। এসব নারীর বয়স ছিল ১৫ থেকে ৩৪ বছর। ‘লিভিং উইথ ওন অর হাসবেন্ডস্‌ মাদার ইন দ্য হাউসওল্ড ইজ অ্যাসোসিয়েটেড উইথ লোয়ার নাম্বার অব চিলড্রেন: এ ক্রস-কালচারাল অ্যানালাইসিস’ শিরোনামে তাঁদের গবেষণাবিষয়ক নিবন্ধটি গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যর দ্য রয়েল সোসাইটির ‘ওপেন সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।

অবশ্য এই গবেষণায় বাংলাদেশের বিবাহিত নারীদের নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়নি।

গবেষকেরা আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, মালাউই, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, রোমানিয়া, সুদান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও জাম্বিয়া—এই দেশগুলোর বিবাহিত নারীদের ওপর গবেষণা করেছেন। তাঁরা এসব দেশের বিভিন্ন সময়ের আদমশুমারির তথ্য ব্যবহার করেছেন।

গবেষণা প্রবন্ধের শুরুতে বলা হয়েছে, আত্মীয়স্বজনের উপস্থিতি বিশেষ করে নিজের মা বা শাশুড়ির উপস্থিতি নারীর প্রজননের ওপর প্রভাব ফেলে, তা অনেক গবেষণায় আগেই দেখা গেছে। এ বিষয়ে বিস্তর বইপত্র, দলিল আছে। বর্তমান গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল মা বা শাশুড়ির উপস্থিতি সন্তানসন্ততির সংখ্যার ওপর প্রভাব ফেলে কি না, তা জানা। গবেষণায় দেখে গেছে, শুধু স্বামীর সঙ্গে থাকা নারীর সন্তানের সংখ্যা মা বা শাশুড়িসহ স্বামীর সঙ্গে থাকা নারীর চেয়ে বেশি। মা বা শাশুড়ি সঙ্গে থাকলে প্রজননক্ষম নারীর সন্তান সংখ্যা কমে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এ কে এম নূর-উন-নবী প্রথম আলোকে বলেন, আত্মীয়স্বজন বা স্বজনের নেটওয়ার্ক নারীর প্রজননের ওপর প্রভাব ফেলে। মায়ের প্রভাব বেশি থাকে তাঁর ছেলের ওপর। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে ছেলের বিয়ের পরপরই মা দেখতে চান ছেলের বউ সন্তান দানে সক্ষম। ছেলে ও ছেলের বউ নিজেদের সিদ্ধান্তে বিলম্বে সন্তান নিতে চাইলে মায়ের বা পরিবারের অন্য সদস্যদের বউয়ের প্রজননক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়।’

অধ্যাপক নূর-উন-নবী বলেন, এ দেশের সংস্কৃতিতে মা বা শাশুড়ির উপস্থিতি অধিক সন্তানের সহায়ক হিসেবে ভাবা হয়েছে। তবে এ নিয়ে গবেষণা হয়নি। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (নিপোর্ট) জ্যেষ্ঠ গবেষক সুব্রত ভদ্র প্রথম আলোকে বলেন, নারীর প্রজনন হারের (ফার্টিলিটি রেট) ওপর মা বা শাশুড়ির উপস্থিতির প্রভাব নিয়ে কোনো গবেষণা এ দেশে হয়েছে, এমন তাঁর জানা নেই।

ইউনিভার্সিটি অব ভিয়েনার গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ের পর নিজের মায়ের সঙ্গে থাকে এমন নারীর হার সবচেয়ে কম মালাউইতে (০.৭৯ শতাংশ), আর সবচেয়ে বেশি থাইল্যান্ডে (১৭.১৫ শতাংশ)। অন্যদিকে বিয়ের পর শাশুড়ির সঙ্গে থাকা নারীর হার সবচেয়ে বেশি ইরাকে (৫৩.১৫ শতাংশ), সবচেয়ে কম যুক্তরাষ্ট্রে (১.৪৭ শতাংশ)। ১৪ দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিজের মা বা শাশুড়ি সঙ্গে থাকে না এমন নারীর সন্তান বেশি।

গবেষকেরা বলছেন, সন্তান কম বা বেশি হওয়ার পেছনে আরও কিছু বিষয় কাজ করে। যেমন, নারী যদি চাকরি করেন এবং তিনি যদি উচ্চশিক্ষিত হন, তা হলে তাঁর সন্তান কম হয়। আবার শহরের চেয়ে গ্রামের নারীদের সন্তান বেশি।

গবেষণার পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মা বা শাশুড়ি ছাড়াই বিবাহিত নারী তাঁর স্বামীর সঙ্গে বসবাস করেন। একমাত্র ব্যতিক্রম ইরাক। ইরাকে বিবাহিত ৫৩.১৫ শতাংশ নারী স্বামী ও শাশুড়ির সঙ্গে থাকেন। দ্বিতীয় স্থানে পাকিস্তান। পাকিস্তানে এটা ৪১.২ শতাংশ।

গবেষকেরা বলছেন, পরিবারে একসঙ্গে থাকা শাশুড়ি ছেলের বউয়ের ব্যাপারে মনোযোগ বেশি দেন, বউয়ের ওপর নজর রাখেন। এতে ছেলের সঙ্গে বউয়ের মেলামেশার সম্ভাবনা কমে। সেটা হয়তো সন্তান কম হওয়ার একটি কারণ।

পরিবারের সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতাও একটি কারণ হতে পারে। এখানে গবেষকেরা অন্য দুটো গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করেছেন। তিন প্রজন্মের পরিবারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, দাদি-নানির চেয়ে সুযোগ-সুবিধা নাতি-নাতনি কম পায়। অন্য গবেষণা বলছে, শিশু ও দাদি একই সঙ্গে বাস করলে শিশুর মৃত্যুঝুঁকি দ্বিগুণ হয়।

স্বামীর সামাজিক অবস্থানও সন্তান সংখ্যার ওপর প্রভাব ফেলে। বেকার স্বামীদের অনেক সময় স্ত্রীর বাপের বাড়িতে থাকতে হয়, যেখানে শাশুড়িও থাকেন। পুরুষ যদি সামাজিকভাবে নিচু অবস্থানে থাকেন, তা হলে সন্তান সংখ্যা কম হয়।

  • প্রথম আলো