আমার গ্রাম আমার শহর : পল্লি উন্নয়নের বিশাল প্রকল্প

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১০:১৪ অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২২ | আপডেট: ১০:১৯:অপরাহ্ণ, মে ৩১, ২০২২

ম. জাভেদ ইকবাল :

দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কিন্তু এই অর্থনৈতিক উন্নয়নযজ্ঞে বৈষম্যতা এখনও এদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরাজমান। অন্য যেকোন দেশের মতো উন্নয়নের পূর্ব শর্ত হলো জনগোষ্ঠীর সকল শ্রেণির নাগরিকের অন্তর্ভূক্তি অর্থাৎ উন্নয়ন কর্মকান্ডের সুফল থেকে কেউ যেন বাদ না যায়। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকান্ড ও বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ সুবিধা অনেকাংশে শহরকেন্দ্রিক।

ফলে প্রতি বছর একটি বিশাল জনগোষ্ঠী গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন করে। এতে শহরে যেমন প্রতিনিয়ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই সাথে শহরেও প্রদত্ত নাগরিক সুযোগ সুবিধাগুলোও অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর বা অপ্রতুল হয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। যেখানে ‘আমার গ্রাম- আমার শহর’ ধারণাটি প্রবর্তিত হয়।

‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবর্তিত বহুমাত্রিক গ্রাম উন্নয়ন ধারণা যার মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে গ্রামের প্রাকৃতিক অবয়বকে অক্ষুন্ন রেখে মৌলিক নগর সুবিধাগুলো গ্রামে সম্প্রসারণের মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের পার্থক্য কমিয়ে আনাই এই কর্মসূচির যৌক্তিক চেতনা। শহরের সব নাগরিক সুবিধা গ্রামে পৌছে দিতে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরুর পরিকল্পনা করছে সরকার। দেশজুড়ে প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র গড়ে তোলার এ প্রকল্প পরিকল্পনাধীন পর্যায়ে রয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিডি) প্রণীত কর্ম-পরিকল্পনার খসড়া অনুসারে, ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ শীর্ষক এ মেগা প্রকল্পের অধীনে সড়ক যোগাযোগ, ইন্টারনেট সংযোগসহ টেলিযোগাযোগ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মতো অনেকগুলি লক্ষ্য রাখা হয়েছে। শুধুমাত্র এ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়িত কাজেই প্রাথমিকভাবে দেড় লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। বিশাল এ কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ১৫টি গ্রামকে পাইলট মডেল গ্রাম হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্তও নিয়েছে সরকার।

পাইলট মডেল গ্রাম বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতায় দেশের অন্যান্য গ্রামগুলোতে আধুনিক নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণ কাজ সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ১৫টি মডেল গ্রামের আটটি দেশের আটটি বিভাগে গড়ে তোলা হবে। এছাড়া হাওর, উপকূলীয় এলাকা, পাহাড়ী এলকা, চর এলাকা, বরেন্দ্র অঞ্চল , বিল এলাকা এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশে একটি করে বাকি সাতটি গ্রামকে মডেল গ্রাম করা হবে। বিশেষ এসব অঞ্চলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন বেশ কঠিন। আর এসব এলাকায় মডেল গ্রাম বাস্তবায়ন করা গেলে গ্রামীণ উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনেক সহজ হবে। অর্থনৈতিক কমকান্ডের বাইরে সামাজিক ও সংস্কৃতি বিষয়গুলোও মডেল গ্রামে গুরুত্ব পাবে। সরকারে ঘোষণা অনুযায়ী মডেল গ্রামে যোগাযোগ ও বাজার অবকাঠামো, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা, সুপেয় পানি, তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা ও দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সুবিধা, উন্নত পয়:নিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কমিউনিটি স্পেস ও বিনোদনের ব্যবস্থা, ব্যাংকিং সুবিধা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি, কৃষি আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধিসহ ১৭টি সেবা ও সুবিধা রাখার কথা বলা হয়েছে। গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান করা হবে। আধুনিক নাগরিক সুবিধা সম্প্রসারণে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ইতোমধ্যে ১১৬টি নতুন প্রকল্প প্রস্তাব করছে। এ কর্মযজ্ঞের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিস্তারিত সমীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে যার ভিত্তিতে আরও বেশ কিছু নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে। সমীক্ষাগুলো শেষ হলে চূড়ান্ত ব্যয় জানানো হবে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চলমান ২৩৭ প্রকল্পও ‘আমার গ্রাম আমার শহরে’র সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় ওই প্রকল্পগুলোকে এ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শহরের সুবিধা গ্রামে সম্প্রসারণে তার জন্য ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মোট ৩৬টি গবষেণা করছে এলজিইডি। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের এ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শহরের সুবিধা গ্রামে সম্প্রসারণ করা হলে এবং গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গেলে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি গ্রামে হালকা শিল্পের সম্ভাবনাও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে গ্রামের মানুষের শহরমুখীতা কমবে- বলে আশা করছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মডেল গ্রাম স্থাপনে কাজ করবে। তবে মডেল গ্রাম স্থাপনে নেতৃত্ব দেবে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনস্থ সংস্থা স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, সমবায় অধিদপ্তর, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা মডেল পাইলট গ্রাম বাস্তবায়ন কাজ শুরু করবে। এরমধ্যে অনেক সংস্থা তাদের প্রস্তুতিমূলক কাজও করে যাচ্ছে। অনেক সংস্থা এরমধ্যেই প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের মতে, ২০৪১ সালে দেশের জনসংখ্যা ২২ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। দেশের বর্তমানে ০.৫-১ শতাংশ হারে কৃষি জমি কমছে। এর বড় একটি অংশ বসতভিটায় রূপান্তরিত হচ্ছে। কৃষি জমি হ্রাসের কারণে এ হার অব্যাহত থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত এবং গ্রামের জীববৈচিত্র্য বিনষ্ট হবে। তাই জনবহুল গ্রামগুলোতে সব নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করে বহুতল ভবনের সমন্বয়ে একটি কম্প্যাক্ট টাউনশিপ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হবে। এর ফলে সড়ক বিদ্যুৎ, অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। গ্রামগুলো সহজে বন্যা মুক্ত হবে। এ ধরনের আদর্শ গ্রামে বিদ্যালয়, হাসপাতাল ক্লিনিক থাকলে সহজে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যাবে। কৃষি জমি বাঁচবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশ বাসযোগ্য থাকবে। এ কারণে গ্রামীণ গৃহায়ন বা কম্প্যাক্ট হাউজিংয়ের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, সরকারের মডেল গ্রাম প্রকল্প গ্রামীণ জনপদের মানুষের মৌলিক সরকারি সুবিধা পাওয়ার সহায়ক হতে পারে এবং এটি শহরের ওপর চাপ কমাবে।

এদিকে আমার গ্রাম আমার শহর বাস্তবায়নে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা গবেষণা বা সমীক্ষার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। করোনার কারণে বিগত দুই বছর প্রকল্পের কাজ থেমে ছিল। এলজিইডি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) বগুড়াসহ বিভিন্ন সংস্থা এ বিষয়ে কাজ করছে। এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকা শক্তি কৃষি এবং কৃষিই আমাদের আবহমান গ্রামবাংলার কৃষ্টি, মনন ও সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে মৌলিক নগরসুবিধাসমূহ গ্রামাঞ্চলে অবতারণার মাধ্যমে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রার বাংলাদেশ উন্নয়নের ভিত্তিকে স্থায়ীরূপ দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লালিত স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ তাই অত্যন্ত যুগোপযোগী বহুমাত্রিক গ্রাম উন্নয়ন উদ্যোগ।

লেখক: উপপ্রধান তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, বরিশাল।

Print Friendly, PDF & Email