মারমুখী ছাত্রলীগ, অশান্ত ক্যাম্পাস

প্রতিবাদ, হামলা বিক্ষোভ-অবরোধ # ২৯ জানুয়ারি ধর্মঘটের ডাক প্রগতিশীল ছাত্রজোটের # উপাচার্য কার্যালয় ঘেরাও ছাত্রলীগের

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০১৮ | আপডেট: ১২:৩৮:পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০১৮

ছাত্রলীগের বাইরে দীর্ঘদিন ধরে ক্রিয়াশীল কোনো সংগঠন না থাকায় অনেকটা নির্জীব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হঠাৎ করেই উত্তাল হয়ে উঠেছে। এর রেশ ধরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের অন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়ের কিছু দিন পরেই ক্যাম্পাস ছাড়ে দেশের অন্যতম ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল। এর পর তারা ক্যাম্পাসমুখো হয়নি। ফলে ক্যাম্পাসজুড়েই একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগের। গত দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালে ঢাবি ছাত্র আবুবকর হত্যাকা-ের বাইরে বড় কোনো সংঘর্ষ বা হামলার ঘটনাও ঘটেনি। রাজধানীর সাত সরকারি কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে প্রতিদিনের কর্মসূচি ঘিরে কিন্তু হঠাৎই শান্ত ক্যাম্পাসে লেগেছে বদলের হাওয়া। এ নিয়ে ঘটেছে সংঘর্ষের ঘটনাও। ফলে গত কয়েক দিন ধর্মঘট, বিক্ষোভ, অবরোধ ও ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হয়েছে বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার রেশ ধরে বিভিন্ন স্থানে বাম ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

গত ১১ জানুয়ারি ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী’র ব্যানারে রাজধানীর সাতটি কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে নামে কিছু শিক্ষার্থী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্রলীগ নেতারাই এ আন্দোলনের গোড়াপত্তন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের ফেসবুক গ্রুপ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার’ এ অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগদানের আহ্বান জানানো হয়। সাত কলেজবিরোধী বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে সাত কলেজবিরোধী এসব পোস্ট দেয় গ্রুপের অ্যাডমিন প্যানেল। অ্যাডমিন প্যানেলের প্রায় সবাই ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের নেতা ও কর্মী। আন্দোলনের এক পর্যায়ে দাবি আদায়ে ১৫ জানুয়ারি বিকালে উপাচার্যের অফিসের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে ছাত্রলীগের বিভিন্ন হল শাখার নেতাকর্মী আন্দোলনকারীদের হুমকি-ধমকি দেন। এক পর্যায়ে তারা ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করে ও আন্দোলনের সমন্বয়কারী মশিউর রহমানকে উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রক্টরের সামনে মারধর করে। পরে মশিউরকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এর প্রতিবাদে ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ’ এ ব্যানারে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে ‘হামলা’ ও ‘ছাত্রী নিপীড়নে’ জড়িত ছাত্রলীগের আট নেতাকর্মীকে বহিষ্কার, ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবিতে ১৭ তারিখে প্রক্টরকে অবরুদ্ধ করে রাখে প্রায় সাত ঘণ্টা। এ সময় আন্দোলকারীরা তালাবদ্ধ কলাভবনের কলাপসিবল গেট ভেঙে প্রক্টরের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ভাঙচুরের অভিযোগে ৫০ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। গত মঙ্গলবার দাবি আদায়ে আবারও উপাচার্য কার্যালয় ঘেরাও করে আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থী ও বাম ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মী। কিন্তু ঘটনার এক পর্যায়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েক ছাত্রীকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের বক্তব্যের জবাবে সংবাদ সম্মেলন করে নির্যাতনবিরোধী শিক্ষার্থীরা। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে নির্যাতনবিরোধী শিক্ষার্থী ব্যানারে আন্দোলনের সমন্বয়ক মাসুদ আল মাহাদীর নেতৃত্বে এ সংবাদ সম্মেলন হয়।

সংবাদ সম্মেলনে পাঁচ দফা দাবি দেওয়া হয়। দাবিগুলো হলো অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও যৌন নিপীড়নকারী ছাত্রলীগ নেতা সোহান, সানীসহ জড়িতদের বহিষ্কার, অধিভুক্ত ৭ কলেজের সংকট দ্রুত নিরসন, নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা উদ্দেশ্যমূলক মামলা প্রত্যাহার, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ প্রক্টরের পদত্যাগ ও ২৩ জানুয়ারি ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী হামলার বিচার।

সংবাদ সম্মেলনে মাসুদ আল মাহাদী বলেন, পাকিস্তান আমলে মোনায়েম খানের এনএসআই ডেকে আনার মতো ছাত্রলীগকে ডেকে নিয়ে এলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ছাত্রলীগ আমাদের ওপর দফায় দফায় হামলা করল। এ হামলার ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে নাটক সাজানো হলো, আমরা নাকি হামলা করেছি। যারা আমাদের মেরেছে তারাই পরবর্তী সময়ে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে নাটক সাজিয়েছে। নাটকগুলো পরে উন্মোচিত হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী সামান্থা শারমিন। এ সময় তিনি প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ডাকা ২৯ জানুয়ারির ছাত্র ধর্মঘটে সমর্থন জানান।

এদিকে মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর গতকাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেটেও বামপন্থি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। এতে অন্তত ২২ জন আহত হয়। এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ধীষণ প্রদীপ চাকমা জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে হামলা চালানোর ঘটনার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে আজকে কয়েকটি বামপন্থি সংগঠনের বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি ছিল। মিছিল লাইব্রেরি ভবনের সামনে পৌঁছানোর পর ছাত্রলীগের কর্মীরা চড়াও হন। এতে জোটের ১০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে আছেন ফজলে রাব্বি, সৈয়দ আইরিন সুলতানা, সায়মা আকতার নিশু, রিজু এবং মির্জা ফখরুল।

  • এদিকে সিলেট এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রফ্রন্ট একটি মিছিল বের করলে হামলা করে ছাত্রলীগ। এতে ১২ কর্মী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কলেজ ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক সাদিয়া তাসনিম নওশীন।

এদিকে ঘটনা নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আসছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের পক্ষ থেকেও। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিদর্শনের সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় ছাত্রলীগ যদি কোনো অন্যায় করে থাকে, তা হলে ছাত্রলীগকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। যারা ফটক ভেঙে ভিসির কার্যালয়ে ঢুকেছেন, তাদেরও শাস্তি হওয়া উচিত।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটেছে, তা আওয়ামী লীগের চরিত্র। এটা ছাত্রলীগের নতুন কিছু নয়, তারা বহুবার শিক্ষকদের মেরেছে, ছাত্রদের মেরেছে।

এদিকে উপাচার্যের প্রশাসনিক ভবনে সংঘটিত ‘অনাকাক্সিক্ষত’ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। তারা মনে করে, মঙ্গলবারের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়কে অশান্ত করতে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের অপপ্রয়াস। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সাদা দলের পক্ষ থেকেও বিবৃতি দেওয়া হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মঙ্গলবারের ঘটনাকে সহিংস উল্লেখ করে উদ্বেগ জানিয়েছেন তারা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনের দায়িত্ব কোনো ছাত্রসংগঠনের নয় বলেও মনে করে সংগঠনটি।

ক্যাম্পাসের সার্বিক অবস্থা নিয়ে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে শান্ত রাখতে আমরা সর্বোচ্চ সহনশীল আচরণ করেছি। উপাচার্যকে উদ্ধার করতে গেলে আমার ওপরও আঘাত করা হয়েছে। রক্তাক্ত হয়েছি। এরপরও নেতাকর্মীদের ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কাউকে আঘাত বা হামলার সুযোগ দেওয়া হয়নি। উল্টো আমাদের নেতাকর্মীর ওপরই হামলা করা হয়েছে। আমরা এর শাস্তি দাবি করছি।

  • ২৯ জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘটের ডাক প্রগতিশীল ছাত্রজোটের

এদিকে উপাচার্যের কার্যালয়ে ‘নিপীড়নবিরোধী’ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে ২৯ জানুয়ারি সারা দেশে ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। এর আগে ২৬ জানুয়ারি বিকাল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজু ভাস্কর্যের সামনে সংহতি সমাবেশ করবে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর এই জোট। ২৮ জানুয়ারি সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে তারা। গতকাল বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে প্রগতিশীল ছাত্র জোটের সমন্বয়ক ইমরান হাবিব রুমন এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এ সময় তিনি আশঙ্কা করে বলেন, আদালত ছয় মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন করার রায় দিয়েছে। সেই নির্বাচন বানচাল করার উদ্দেশ্যেই ছাত্রলীগ হামলা চালিয়েছে। সংবাদ সম্মেলন শেষে নির্যাতনবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ ব্যানারে প্রক্টরের পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবিতে এবং চার দফা দাবিতে প্রগতিশীল ছাত্রজোট মধুর ক্যান্টিন থেকে আলাদা বিক্ষোভ মিছিল করে।

  • সচেতন শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল

গত মঙ্গলবার উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করায় তার সম্মানহানি হয়েছে, তাকে অপদস্থ করা হয়েছে উল্লেখ করে সচেতন শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ঢাবি ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রলীগ। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিক্ষোভ মিছিলে উপাচার্যকে লাঞ্ছনাকারী শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। মিছিল নিয়ে তারা উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে এসে অবস্থান নেয়। মিছিলে ছাত্রলীগের বিভিন্ন হল ইউনিটের নেতারা নেতৃত্ব দেন। এর আগে সকাল সাড়ে দশটায় তারা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করে। বিক্ষোভ মিছিলে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন, ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসানসহ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের নেতারা সংহতি জানান।

  • আমাদের সময়