ঝালকাঠির সেই জমজ শিশুদের ফিরে পেতে মায়ের আর্তনাদ

প্রকাশিত: ১০:০৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১ | আপডেট: ১০:০৯:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

“সন্তানদের মাতৃহারা করতে না, মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করতে না, ওদের প্রতি কোন ধরনের বিরক্ত হয়েও না, শুধু মাত্র আরাফ-আয়ানের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে এমনভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। এসপি অফিসের সামনে রেখে আড়ালে দাড়িয়ে তদারকিও করছিলাম ওদের অবস্থা কি হয়, পুলিশ বিভাগ কি ব্যবস্থা নেয় তাও দেখতেছিলাম। কিন্তু শেষ পরিণতি এমন হলো, আমার সন্তানরা জীবনেও ওর দাদিকে দেখেনি। এমনকি বাচ্চা হবার পরে তিনি একটি বাচ্চাকে বিক্রিও করতে চেয়েছিলেন। যতই কষ্ট হোক আমি সন্তান হাতছাড়া করবো না। তার কথা না রাখায় স্বামীর সাথে পারিবারিক কলহ আরো বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে আমাকে ডিভোর্স দিলে আমি তাদের পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাই। এখন দাদি কিভাবে আমার সন্তানদের রাখছে? লালন পালন করছে নাকি সেই আগের চিন্তাধারার মতোই আবার বিক্রি করে দিছে সেই চিন্তায় গত ১সপ্তাহ যাবত চোখের পাতা বুজাতে পারছি না।” কান্না জড়িত কণ্ঠে আর্তনাদ করে এমনটাই বললেন শিশু আরাফ ও আয়ানের মা সুমাইয়া আক্তার। তিনি তার দুধের অবুঝ শিশুদের যে কোনভাবে কাছে পেতে সংশ্লিষ্টদের করুণা কামনা করেন।
জানাগেছে, আরাফ ও আয়ান নামের ১৬ মাসের জমজ দুই ছেলে সন্তানকে ঝালকাঠি পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে রেখে প্রতিবাদ জানান এক পুলিশ সদস্যের স্ত্রী। পরে শিশু দুটিকে ঝালকাঠি থানার নারী ও শিশু হেল্প ডেস্কে নিয়ে রাখা হয়। দুই শিশুকে নিয়ে বিপাকে পড়ে থানা পুলিশ। স্বামী ভরণপোষণ ও চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন না করায় গত ১৯ সেপ্টেম্বর (রবিবার) বিকেলে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে রেখে চলে যান শিশু দুটির মা সুমাইয়া আক্তার।
শিশুদের মা সুমাইয়া আক্তার জানান, শিশু দুটির বাবা ইমরান হোসেন কাঁঠালিয়া থানায় পুলিশ কনস্টেবল পদে কর্মরত আছেন। সে বর্তমানে এক মাসের প্রশিক্ষণের জন্য জামালপুরে অবস্থান করছেন। তাঁর বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার মালুহার গ্রামে। ২০১৯ সালের মে মাসে বিয়ে হয় কনস্টেবল ইমরানের। দাম্পত্য কলহের জেরে এ বছরের মার্চ মাসে স্ত্রীকে তালাক নোটিশ পাঠান ইমরান। তালাক নোটিশ পেয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুক মামলা করেন তিনি। ইমরান তালাক নোটিশ পাঠানোর আরও আগ থেকে তাঁর এবং সন্তানদের কোন ভরণপোষণ দিচ্ছিলোনা বলে দাবি করেন শিশু দুটির মা সুমাইয়া।
পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে চায়ের দোকানী প্রত্যক্ষদর্শী মাহফুজ মিয়া বলেন, বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে একজন নারী তাঁর দুই শিশু সন্তানকে এসপি অফিসের চেক পোষ্টের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের সামনে রেখে যান। যাবার সময় সে বলে যায়, তোমাদের সন্তান তোমাদের কাছেই থাক। এরপরে পুলিশ সুপারের নির্দেশে সদর থানায় নেয়া হয়। দীর্ঘ সময় মা কাছে না থাকায় শিশু দুটির কান্নায় থানার পারিবেশ ভারি হয়ে উঠে। নারী ও শিশু হেল্প ডেস্কের এক নারী কনস্টেবল শিশু দুটিকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ সময় শিশু দুটির শরীরে জ্বর থাকায় তাপমত্রা ছিল অনেক বেশি।
সুমাইয়া আক্তার আরো জানান, গত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় শিশু আরাফ ও আয়ানকে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর (রবিবার) সকালে চিকিৎসকরা শিশু দুটির বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে বলেন। এতে প্রায় ৬ হাজার টাকার প্রয়োজন ছিল। বিষয়টি কনস্টেবল ইমরানকে জানানো হলেও তিনি টাকা দিতে অপরগতা প্রকাশ করেন। তাই বাধ্য হয়ে শিশু দুটিকে নিয়ে পুলিশ সুপার ফাতিহা ইয়াসমিনের সাক্ষাতে জন্য যাই। কিন্তু প্রধান গেটের সামনে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ইমরান মিয়া ও মো. সুমন নামে দুই পুলিশ সদস্য ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। তাই প্রতিবাদ স্বরুপ বাধ্য হয়ে শিশু সন্তানদের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে রেখে আড়ালে দাড়িয়ে দেখছিলাম। ওদের লালন পালন করতে আমার কোন আপত্তি বা কষ্ট নেই, কিন্তু খরচ চালানোর মত আমার সামর্থ্য আমার নেই ।
কনস্টেবল ইমরান মোবাইলে জানান, প্রতি মাসে শিশু দুটির ভরণপোষণের জন্য তিন হাজার টাকা সুমাইয়ার ব্যাংক হিসেবে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী তাঁদের খোঁজ খবর নেই। কিন্তু মা হয়ে সে কিভাবে সন্তানদের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে ফেলে গেল ?
ঝালকাঠি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্ত মো. খলিলুর রহমান বলেন, সদর থানা থেকে ইমরানকে বিষয়টি জানানো হলে তার মা (শিশুর দাদি) রাত ১০টার দিকে শিশু দুটিকে নিয়ে যান। জমজ দুই শিশুকে রাতেই ওদের দাদির জিম্মায় দেয়া হয়েছে। এখন শিশুর মা বাচ্চা নিতে চাইলে আদালতের মাধ্যমে নিতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email