রোহিঙ্গা নারীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার বর্মি সেনাদের

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৭:৫৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০১৭ | আপডেট: ৮:০৮:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০১৭
রোহিঙ্গা নারীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার বর্মি সেনাদের

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদন
রোহিঙ্গা নারীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার বর্মি সেনাদের

 

মিয়ানমারের সেনা, পুলিশ, নাসাকা বাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা ধর্ষণ করে চলছে রোহিঙ্গা নারী ও যুবতীদের। অনেক সুন্দরী মেয়েকে সেনাক্যাম্পে আটকে রেখে উপর্যুপরি ধর্ষণ করা হয়। ক্যাম্পে গণধর্ষণে ইতোমধ্যে মারা গেছেন অনেকেই। ১৯৯০ সাল থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী বহু রোহিঙ্গা নারীকে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। এ ছাড়া রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ এমনকি শিশুদের কাছ থেকেও ফোর্সড লেবার বা বাধ্যতামূলক শ্রম আদায় করে সেনা ও নাসাকা বাহিনী। প্রতি পরিবারে সপ্তাহে কমপক্ষে একজনকে বাধ্যতামূলক শ্রম দিতে হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে কেউ আপত্তি করলেই নেমে আসে নির্যাতন। নির্যাতন ছাড়াও প্রতিশোধ হিসেবে ঘরে নারী ও যুবতী থাকলে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ধর্ষণের জন্য।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইয়েল ল’ স্কুলের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে এই তথ্য। ২০১৫ সালে এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও বর্তমানে রোহিঙ্গাদের প্রতি মিয়ানমার সেনাদের গণহত্যা ও গণধর্ষণের প্রেক্ষাপটে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনটি ফের আলোচনায় এসেছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রতি গণহত্যার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। এ ছাড়া ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের অবর্ণনীয় দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়।

রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্তমানে চলমান গণহত্যা ও গণধর্ষণ থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া অনেক নারী-পুরুষ জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর গণধর্ষণের কথা। তারাও জানিয়েছেন রোহিঙ্গাদের নির্মূল অভিযানের সময় নির্বিচার ধর্ষণ ছাড়াও অনেক সুন্দরী মেয়েকে ধরে নিয়ে ক্যাম্পে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করা হয়।

সেনা, পুলিশ, নাসাকা বাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা শুধু যে রোহিঙ্গা নির্মূল অভিযানের সময় ধর্ষণ করে তা নয়। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন ও আশ্রয়শিবিরে থাকা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন ধর্ষণ চলে সর্বক্ষণ। রাখাইন রাজ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি সেনাক্যাম্প।

প্রতি গ্রামে দিনে-রাতে চলে সেনা, পুলিশ ও নাসাকা বাহিনীর টহল। তারা প্রায়ই হানা দেয় রোহিঙ্গাদের বাসা বাড়িতে। বিশেষ করে রাত নামলে তারা হানা দেয় যুবতী নারী রয়েছে এমন অনেক ঘরে। তাদের টেনে ঘরের বাইরে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। আর যাদের চোহারা ভালো তাদের কাউকে কাউকে নিয়ে আটকে রাখা হয় ক্যাম্পে।

ফোর্সড লেবার
ইয়েল ল স্কুলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নাসাকা বাহিনী ও মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক শ্রম আদায় করে। বাধ্যতামূলক শ্রমের মধ্যে রয়েছে কুলিগিরি, নির্মাণ, কৃষিকাজ ও ক্যাম্পে নাইটগার্ড। বাধ্যতামূলক শ্রম এড়াতে হলে প্রতি সপ্তাহে ফি দেয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে সে ফি দেয়ার সামর্থ্য নেই রোহিঙ্গাদের। ফলে তাদের বাধ্যতামূলক শ্রমই দিতে হয়। এতে আপত্তি করলে তাদের ওপর নির্যাতন করা হয় এবং তাতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। পুলিশ, সেনা, গোয়েন্দা, কাস্টমস অফিসার, দাঙ্গা পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত নাসাকা বাহিনী। সেনা ও নাসাকা বাহিনী ১০ বছরের শিশুদের কাছ থেকেও বাধ্যতামূলক শ্রম আদায় করে। আইরিশ সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস লিখেছেÑ প্রতি মাসে কমপক্ষে এক থেকে দুই দিন প্রত্যেক রোহিঙ্গা পরিবার থেকে একজনকে কুলিগিরি করতে হয়। ২০০৯ সালে সরকার আদেশ জারি করে প্রত্যেক পরিবার থেকে সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন করে একজন পুরুষ পাঠাতে হবে নাইট গার্ডের দায়িত্ব পালনের জন্য।

২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট থিয়েন সিয়েন সংসদের প্রতি আহ্বান জানান বাধ্যতামূূূলক শ্রম নিষিদ্ধ করার জন্য। এরপর মিয়ানমার ২০১৫ সাল নাগাদ বাধ্যতামূলক শ্রম বন্ধের লক্ষ্যে ২১০২ সালে সমঝোতা স্বাক্ষর করে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাথে। ২০১৩ সালে আইএলওর এক প্রতিবেদনে বলা হয় সেনা ও নাসাকা বাহিনী বাধ্যতামূলক শ্রম থাকার কথা অস্বীকার করলেও রাখাইন ও কাচিন রাজ্যে এটি অব্যাহত রয়েছে।

ইয়েল ল স্কুলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে রাখাইনে ফোর্সড লেবার শুধু অব্যাহত রয়েছে তা নয় বরং পরিকল্পিতভাবে এটা করাচ্ছে সেনা ও নাসাকা বাহিনী। সেন্ট্রি, রাস্তা নির্মাণ ও ক্যাম্পের বিভিন্ন কাজে বিনা পারিশ্রমিকে ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। উত্তর রাখাইনে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৬ হাজারের বেশি নারী-পুরুষ ও দুই হাজারের বেশি শিশুকে দিয়ে ফোর্সড লেবার করানো হয়। মালয়েশিয়া পালিয়ে আশ্রয় নেয়া এক রোহিঙ্গা জানান, আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন সেনা ও পুলিশ আমাকে নিয়ে যেত ফোর্সড লেবারের জন্য।

এটা এখনো চলছে সেখানে। ৯৮ ভাগ ফোর্সড লেবার করায় মিয়ানমার সেনাবাহিনী। ২০১৫ সালের জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার পরিষদের মিয়ানমারের ওপর পিরিয়াডিক রিভিউ প্রতিবেদনেও মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে ২০১২ সালে ফোর্সড লেবার বন্ধে সমঝোতা চুক্তির পরও রাখাইনে হাজার হাজার নারী, পুরুষ ও শিশুদের দিয়ে ফোর্সড লেবার করিয়েয়েছ সেনা ও নাসাকা বাহিনী।

যৌনদাসী
ইয়েল ল স্কুলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মিয়ানমার সেনা, পুলিশ, নাসাকা বাহিনী এবং স্থানীয় বৌদ্ধ সন্ত্রাসী সবাই মিলে ধর্ষণ করে চলছে রোহিঙ্গা নারী ও যুবতীদের। যখন ঘরের পুরুষদের বাধ্যতামূলক শ্রম দিতে নিয়ে যাওয়া হয় তখন ঘরের নারীদের ওপর ধর্ষণ চালায় তারা। তা ছাড়া আবার নারীদেরও যখন বাধ্যতামূলক শ্রমের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় তখনো তাদের ধর্ষণ করে সেনা ও নাসাকা বাহিনী। একজন রোহিঙ্গা নারী জানায় সে যখন বাধ্যতামূলক শ্রমিক হিসেবে ক্যাম্পে গার্ডের দায়িত্ব পালন করে তখন তার সন্তানের সামনেই তাকে ধর্ষণ করা হয়। কেউ বাধ্যতামূলক শ্রম দিতে অস্বীকার করলেই তাদের পরিবারের নারীদের ধর্ষণ করা হয়।

১৯৯০ সাল থেকে মিয়ানমার সেনা রোহিঙ্গা মুসলমান নারীদের যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। রোহিঙ্গা সুন্দরী অনেক যুবতীদের সেনাক্যাম্পে ধরে নিয়ে দিনের পর দিন ধর্ষণ করা হয়। অনেকে মারা যায় ক্যাম্পে সেনাদের গণধর্ষণের ফলে। অনেক রোহিঙ্গা নারী মিয়ানমার সেনা ও নাসাকা বাহিনী কর্তৃক ধর্ষণ এড়াতে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। যৌন নির্যাতনের শিকার অনেক নারী জানিয়েছেন তাদের শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয় না তারা, পেটায়ও।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনে আরো বলা হয় ১৯৯০ সাল থেকে মডেল টাউন প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে মিয়ানমার সেনাসরকার। রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করা গ্রামে বিভিন্ন এলাকার বৌদ্ধদের এমনকি জেলখানার দাগী আসামিদের মুক্তি দিয়ে সেখানে বসবাসের সুযোগ করে দেয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত এভাবে মোট ৪০ টিরও বেশি মডেল টাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।
বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শুধু রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করে নয় অনেক রোহিঙ্গা মুসলিম এলাকায় বিভিন্ন এলাকার বৌদ্ধ ও জেলখানার দাগী আসামিদের মুক্তি দিয়ে বসবাসের ব্যবস্থা করে মুসলমানদের সংখ্যালঘিষ্ঠ জাতিতে পরিণত করার জন্য।

২০১১ সালে নাসাকা বাহিনী আড়াই হাজার রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করে অনুমতি ছাড়া ঘর মেরামতের অভিযোগে। রোহিঙ্গাদের জমির স্থায়ী মালিকানাও দেয়া হয় না বলে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দণি-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটসের মানবাধিকার কর্মীরা তিন বছর ধরে মিয়ানমারের রাখাইনে নৃশংসতার তথ্য সংগ্রহ করে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণসহ বিভিন্ন উপায়ে। এ জন্য তারা মিয়ানমারের রাখাইন এবং থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায় সফর করেন যেখানে অনেক নির্যাতিত রোহিঙ্গারা রয়েছেন। তাদের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ তারা তুলে দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির ইয়েল ল স্কুলের কাছে। তাদের কাছে ফোর্টিফাই রাইটস জানতে চায়Ñ রাখাইনে রোহিঙ্গাদের প্রতি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে কি না।

ফোর্টিফাই রাইটস তাদের সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ ছাড়াও আলজাজিরা টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন, জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন সংস্থার ডকুমেন্টারি প্রতিবেদন, মিয়ানমার সরকারের কিছু গোপন নথিও সরবরাহ করে ইয়েল ল স্কুলের কাছে। ইয়েল ল স্কুলের প্রফেসর জেমস সিল্কের নেতৃত্বে চারজনের একটি টিম আট মাস এসব তথ্য পর্যালোচনা করে জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশনের আলোকে। এরপর ৬৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে তারা উল্লেখ করে- মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের প্রতি গণহত্যার ঘটনা ঘটছে যা খুবই স্পষ্ট। ২০১৫ সালে অক্টোবর মাসে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইয়েল ল স্কুল। ইয়েল ল স্কুল হলো ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ।