দেশের প্রথম ভিক্ষুকমুক্ত সেই ইউনিয়নে নবজাতককে দেয়া হয় নতুন পোশাক

প্রকাশিত: ১১:০৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ১, ২০২১ | আপডেট: ১১:০৭:অপরাহ্ণ, মার্চ ১, ২০২১

নলছিটি উপজেলার বারইকরণ গ্রামের আঃ জলিল হাওলাদারের কন্য খাদিজা আক্তারকে ভোলা জেলার তজুমুদ্দিন উপজেলার বিদেশ প্রবাসী মো. রিয়াজের কাছে পাত্রস্থ করা হয়। বিবাহের ২বছর অতিবাহিত হতেই মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়ের কাছে সঠিক পরিচর্যার জন্য অবস্থান নেন খাদিজা আক্তার। ২০২০সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভোররাতে তার প্রসব বেদনা শুরু হয়। যতই ভোর হতে থাকে ততই বাড়তে থাকে প্রসব বেদনা। সকাল ৭টার দিকে খোজ নেয়া হয় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। অল্পসময়ের মধ্যেই খাদিজাকে নেয়া হয় সেখানে। সকাল ৮টায় নরমাল ডেলিভারীর মাধ্যমে দুনিয়ার আলো দেখতে চোখ মেলে একটি পুত্র সন্তান। খবর পেয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান বাচ্চু নবজাতকের জন্য একটি বেবি সেট নিয়ে হাজির হন কেন্দ্রে। নতুন শিশুর জন্য বেবি সেট উপহার হিসেবে তুলে দেন অভিভাবকের হাতে।
একইভাবে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারী ওই এলাকার আব্দুল করিমের স্ত্রী মোহনা বেগম ওই ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে নরমাল ডেলিভারীর মাধ্যমে সাহিদ নামে একটি ফুটফুটে ছেলেকে জন্ম দেন। গত বছরের ১০এপ্রিল জন্ম নেয়া নবজাতকের জন্য ইউপি চেয়ারম্যান ওই দম্পতির হাতেও তুলে দেন নতুন বেবি সেট। শুধু এ দুটি দম্পতিকেই নয়, ইেউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যতজন নরমাল ডেলিভারী করিয়ে থাকেন তাদের প্রত্যেক নবজাতকের জন্যই ইউপি চেয়ারম্যান বাচ্চু দিয়ে থাকেন একটি নতুন বেবি সেট। এখানে মাতৃত্বকালীন রোগীদের নরমাল ডেলিভারী সেবা দেয়ার জন্য ২৪ঘণ্টাই খোলা থাকে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এছাড়াও সেখানে দেয়া হচ্ছে ইউনিয়ন বাসীকে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সেবা। এটি বিশ্বের উন্নত কোন দেশের ইউনিয়ন পরিষদের গল্প নয়। ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার কুলকাঠি ইউনিয়নে এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান বাচ্চু।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৩মার্চ (শুক্রবার দুপুরে) কুলকাঠি ইউনিয়ন পরিষদ মাঠে এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী এবং বর্তমান ১৪দলের মুখপাত্র ও সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু এমপি ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার কুলকাঠিকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের প্রথম ভিক্ষুকমুক্ত ইউনিয়ন ঘোষণা করেন। একইসঙ্গে এ ইউনিয়নকে যৌতুক ও বাল্যবিবাহমুক্ত বলেও ঘোষণা দেন তিনি। এসময় ইউনিয়নে বাছাইকৃত প্রকৃত ১৮জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের জন্য প্রত্যেককে ১লাখ টাকার অনুদানের চেক হস্তান্তর করা হয়।
ইউপি চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান বাচ্চু জানান, ইউনিয়নের ১৫ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা কার্পেটিং, ৫শতাধিক হোম সোলার প্যানেল ও ২শতাধিক স্ট্রিট লাইট স্থাপন, কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রমকে গতিশীল, সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনিতে শতভাগ ভাতা প্রদান, সঠিক নিয়মে ভিজিডি ও ১০টাকা মূল্যের চাল বিতরণ, ইউপি সদস্যদের জন্য “সমৃদ্ধি কেন্দ্র ঘর” নামে প্রতিটি ওয়ার্ডে ইউপি সদস্য কার্যালয়, শতভাগ বিদ্যুতায়ন, ২শতাধিক কালভার্ট-ব্রিজ স্থাপন, ৬৫০টি গভীর নলক‚প স্থাপন, পঞ্চগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে এমপিওভুক্তকরণ, ইউনিয়নবাসীর জন্য ঈদগাহ নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারে আধুনিক মানসম্মত টয়লেট স্থাপন, প্রতিবছর হাজারেরও বেশি দুস্থদের কম্বল বিতরণ, কৃতি শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন বৃত্তি প্রদান, দরিদ্র রোগীদের উন্নত চিকিৎসায় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়া রোধে বৈকালীন স্কুল স্থাপন, বিনামূল্যে চক্ষু অপারেশন ও চিকিৎসা সেবা, শতভাগ স্যানিটেশনে ল্যাট্রিন প্রদান, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার আধুনিকায়ন ও গতিশীল কার্যক্রম, ইউনিয়নের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু কর্ণার, খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও জমির উর্বরতার জন্য ১৫কিলোমিটার খাল খনন, অর্ধলক্ষফুট রাস্তা ইটের সলিং, পবিত্র হজ্বব্রত পালনকারীদের সংবর্ধনা ও সম্মাননা প্রদান, মাদক ও বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে যুব কমিটি গঠন, প্রতিটি ওয়ার্ডে গ্রাম উন্নয়ন কমিটি, এনএসপির আওতায় ৭৭জনকে শিক্ষিত বেকার যুবদের কর্মসংস্থান, ২শতাধিক শিক্ষিত বেকারকে সরকারী-বেসরকারী কর্মসংস্থান প্রদান, ইউনিয়নের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।। জমির সেবা দিতে আধুনিক ভ‚মি অফিস স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও ধর্মীয় এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানে অনুদান অব্যাহত রয়েছে।
ব্যক্তিগতভাবে তিনি দুঃস্থ মানব উন্নয়ন সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক, নলছিটি উপজেলা বিআরডিবি’র সভাপতি, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং নলছিটি প্রেসক্লাবের সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। দক্ষ যুব সংগঠক হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে জাতীয় যুব পুরুস্কার গ্রহণ করেন। ১০বছর ধরে চেয়ারম্যান পদে কার্যকালে জেলায় শ্রেষ্ঠ ইউপি চেয়ারম্যান ৪বার এবং নলছিটি উপজেলায় ৭বার শ্রেষ্ঠত্বের কৃতিত্ব অর্জন করায় রাষ্ট্রীয়ভাবে তিনি ৪টি দেশ সফরের সুযোগ লাভ করেন।
ঝালকাঠি জেলার মধ্যে অনুকরণীয় আধুনিক ইউনিয়নে কুলকাঠিকে রূপান্তর করায় ইউপি সদস্যসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।