একজন প্রকৃতিপ্রেমীর কথা

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০১৭ | আপডেট: ১২:২৭:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০১৭
একজন প্রকৃতিপ্রেমীর কথা

প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের একান্ত আপন দ্বিজেনদা, চিরসবুজ চিরশিশু মানুষটি এখন আর আমাদের মাঝে নেই। দ্বিজেনদা আমাদের ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন এ কথা আমরা কেউ স্বপ্নেও ভাবিনি।
প্রকৃতিপ্রেমীদের নেতা দ্বিজেনদা তার চারপাশের সবার মন উচ্ছল প্রাণপ্রাচুর্যে এমন করে মাতিয়ে রাখতেন বলে তার বয়সের কথা কখনো আমাদের মাথায় আসেনি। এ বছর, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কথা। রমনা চত্বরে মাধবী ঝাড়ের নিচে প্রকৃতিপ্রেমী সংগঠন তরুপল্লবের মাধবীবরণ অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে প্রকৃতিপ্রেমীরা ঢ্যাপের খইয়ের সঙ্গে বাতাসার স্বাদ নিতে নিতে গল্প করছিলাম। আমাদের পাশে মাধবীঝাড় থেকে খানিক দূরে খোকসার কাটা ডাল খোলা জায়গায় ঘাসের ওপর ছড়িয়ে পড়ে আছে। কাটা ডালের পাতাগুলো রোদের আঁচে নেতিয়ে পড়েছে। অল্পবয়সী এক প্রকৃতিপ্রেমী খোকসার নেতিয়ে পড়া পাতাগুলোর দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘তরতাজা খোকসাটাকে কে যেন মেরে রোদে ফেলে রেখেছে। আগাছা সাফ করার নামে এমন কাজ হামেশা হতে দেখি। আচ্ছা দাদা, বলুন তো আগাছা কাকে বলে?’ আমি দ্বিজেনদার পাশে বসেছিলাম। ছেলেটির প্রশ্নের জবাবে দ্বিজেনদা কিছু বলার আগে আগ বাড়িয়ে বললাম, ‘মানুষ নামের দ্বিপদ প্রাণী নিজেদের সুবিধামতো গাছা-আগাছার মধ্যে ভেদরেখা টেনে নিয়ে আগাছার একটি সংজ্ঞা মনের মধ্যে লালন করে থাকে। সংজ্ঞাটি হচ্ছে, মানুষ নামের প্রাণী যেসব গাছপালাকে চিবাইয়া, চুষিয়া, চাটিয়া, গিলিয়া অথবা টাকায় রূপান্তরিত করিয়া খাইতে পারে না তাহাকে আগাছা বলে। আপনি জানেন, অনেক পাখি ভালোবেসে খোকসার ফল খায়। যে পাখি খোকসার ফল ভালোবেসে খায় তার কাছে কি খোকসা আগাছা?’ আমার কথা শুনে দ্বিজেনদা প্রাণ খুলে হাসতে হাসতে বললেন, ‘আপনি ঠিক বলেছেন। মানুষের খাই খাই স্বভাব মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির দূরত্ব সৃষ্টির মূল কারণ। মানুষ যে গাছের ফল নিজে খেতে পারবে শুধু সেই গাছটিকে বাঁচিয়ে রাখবে। যে গাছ সরাসরি মানুষের ভোগের জোগান দিতে পারবে না তার প্রতি মানুষ নির্মম। মানুষ ভুলে যায় সে প্রকৃতির অংশ এবং পৃথিবীর ওপর প্রকৃতির আরও অংশীদার আছে। প্রাকৃতিক সম্পদের অন্য ভাগিদার প্রাণিকুল কী খেয়ে বাঁচবে সে ব্যাপারে মানুষ মাথা ঘামাতে নারাজ। ’ সব শুনে পাশে বসা নবীন প্রকৃতিপ্রেমী বিষণ্ন চোখে দূরের আকাশের দিকে তাকাতে আমি দ্বিজেনদার দিকে চেয়ে বললাম, ‘দাদা, ওই যে, যেখানে খোলা আকাশ দেখছেন, ওখানে একটা মহুয়া গাছ ছিল তার কথা কি আপনার মনে আছে?’ আমার প্রশ্ন শোনার পরে দ্বিজেনদার বয়স আর ৮৮ বছরে আটকে থাকল না। দাদা আট বছর বয়সী বালকের মতো সজীব প্রাণবন্ত আবেগে বললেন, ‘মনে থাকবে না? কী বিশাল কী সুন্দর মহুয়া গাছটা। গরমের বাও পেলে ওর গা ঝুরি ঝুরি সাদা ফুলে ভরে উঠত। পুরো রমনা পার্ক ও একাই ঘ্রাণে মাতোয়ারা করে দিত। ’ তারপর মহুয়ার শান বাঁধানো গোড়ার দিকে আঙ্গুল তুলে বললেন, ‘ভাববেন না। ওখানে আবার একটি মহুয়ার চারা লাগিয়ে দিয়েছি। ও বড় হলে রমনা চত্বর আবার মহুয়ার গন্ধে ম-ম করবে। ’ চেয়ে দেখলাম কচি সবুজ একটি মহুয়ার চারা শান বাঁধানো চত্বরের মাঝে বাতাসে দোল খাচ্ছে। আজ ভাবছি, ছোট্ট মহুয়ার চারা যেদিন বড় হয়ে ফুল ফুটিয়ে রমনাকে ফের ম-ম গন্ধে মাতিয়ে তুলবে সেদিন দ্বিজেনদা অনন্ত থেকে সেই আনন্দের ভাগিদার হবেন। দ্বিজেনদার সঙ্গে সেই আমার শেষ দেখা। তবে আরেক দিন দাদার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ফোনে কথা হয়েছে। এ বছর এপ্রিলে আমি হংকং যাওয়ার আগে প্রকৃতিপ্রেমী মোকাররম হোসেনকে ফোন করলাম। হংকং যাচ্ছি শুনে তিনি বললেন, এবার অবশ্যই হংকংয়ের কাউলুন পার্কটা দেখে আসবেন। ওখানে এখনো কিছু পুরনো গাছ আছে। আপনার ভালো লাগবে। সময়ের খুব ঘাটতির ভিতরে মোকাররমের কথা রাখতে এক ফাঁকে কাউলুন পার্ক দেখে এলাম। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তরুপল্লবের মুখপত্র ‘প্রকৃতিপত্র’-এর জুন সংখ্যায় লিখলাম, ‘নিষ্ঠুর নগরে চায়না বটের বেঁচে থাকা’। যেদিন প্রকৃতিপত্র প্রকাশিত হয়ে দ্বিজেনদার হাতে গেছে সেদিনই তিনি আমার লেখাটি পড়ে মোকাররমের কাছ থেকে আমার ফোন নম্বর নিয়ে আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি আমার লেখার বিষয়বস্তুর প্রশংসা করলেন। বললেন, আজকের দুনিয়ায় এশিয়ান শহরগুলোয় প্রকৃতি বিপন্ন এটা বললে খুব অল্প বলা হয়। শহরের মানুষ ভুলে গেছে মানুষের ওপর নির্ভর করে গাছপালা বেঁচে থাকে না। মানুষ গাছপালাকে মেরে না ফেললে গাছপালা নিজ শক্তিতে নিজের মতো করে বেঁচে থাকতে জানে। মানুষ কেমন নির্বোধ। এরা জানে না আশপাশে গাছপালা না থাকলে মানুষ বাঁচতে পারে না। স্কয়ার ফিটের হিসাবে তৈরি ইট-সিমেন্টের ঘর বাড়াতে গিয়ে নগরবাসী প্রতিনিয়ত গাছপালা খুন করে চলেছে। তার কাছে মনে হয়েছে, এশিয়ার বেশির ভাগ শহর ভয়ঙ্কর বৃক্ষখুনিদের হাতে বন্দী হয়ে গেছে। এই খুনিরা সবুজের মায়া দেখে ভয় পায়। এ প্রসঙ্গে দাদা তার মনের একটি আক্ষেপ খুলে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মতিঝিলে যেটি এখন শাপলা চত্বর দ্বিজেনদা ওই জায়গায় একটি বটগাছ লাগানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। কর্তৃপক্ষকে বলেছিলেন, মতিঝিল ঢাকার প্রাণকেন্দ্র। এখানে অগুনতি দালানকোঠা, রাজ্যের গাড়ির ভিড় আর হাজারো মানুষের আনাগোনা। এমন অবস্থায় মতিঝিলের বাতাস শিগগিরই বিষিয়ে উঠবে। অমন ব্যস্ত জায়গায় একটা বটগাছ লাগালে গাছটি একদিন বড় হয়ে ছায়া দেবে, পাকা রাস্তা এবং দালানকোঠার গা থেকে তাপ শুষে নেবে, মানুষকে অক্সিজেন সাপ্লাই করবে। একটি মাত্র বটগাছ পুরো মতিঝিলে প্রাণ ছড়াবে। কিন্তু দ্বিজেনদার কথা কেউ শোনেনি। দ্বিজেনদার ভাষা ছিল গাছপালার মতো শান্ত সহনশীল। তিনি তার স্বভাবসুলভ ভাষায় বললেন, ‘কর্তৃপক্ষের কেউ আমার কথার গুরুত্ব বুঝতে পারেনি। ’ দাদার কথা শুনে আমার মনের মধ্যে রাজ্যের রাগ ফেনিয়ে উঠল। আমি বললাম, ‘দাদা, বিশ্বাস করুন, কর্তৃপক্ষ আপনার কথা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে। ওরা সব বুঝেও না বোঝার ভান করেছে। ওরা জানে, একটা বটের চারার বাজার মূল্য ১০ টাকাও হবে না। আপনাকে অনুমতি দেওয়া হলে আপনি নিখরচায় মতিঝিলের গোল চত্বরে নিজ হাতে একটি চারা লাগিয়ে দিয়ে আসতেন। কিন্তু রড-সিমেন্ট-বালুর মিশেল দিয়ে একটি শাপলা ফুলের মূর্তি বানাতে কত টাকা নাড়াচাড়া হয়েছে তার খবর কি আপনি জানেন? রড-সিমেন্ট দিয়ে শাপলা বানানোর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত হাত বদলের মওকায় এ হাত সে হাতে কত টাকা ছড়িয়ে পড়েছে তার হদিস কি আপনি রাখতে পারবেন? নগরবাসী মানুষ কিংবা অন্য প্রাণীর কল্যাণের কথা ভাবলে আপনার পরামর্শ অমূল্য। তবে কর্তৃপক্ষ নামের জগদ্দল পাথরের ধাপে ধাপে বসে থাকা মানুষগুলোর কাছে আপনার কথা মূল্যহীন। কারণ ওরা টাকার গন্ধ শুঁকে বেঁচে থাকে। ওরা ভাবে, টাকার মালিক হতে পারলে আমরা এয়ার কন্ডিশনার থেকে নিঃশ্বাস নেব। এয়ার কন্ডিশনার অক্সিজেন পয়দা করার মেশিন। ওদের বিপরীতে আমরা যারা বাতাসে টাকা নয় অক্সিজেন খুঁজে মরি তারা বিষম বিপাকে আছি। কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় আমরা বুদ্ধিহীন। চার রাস্তার মাথায় গোল চত্বরে রড-সিমেন্ট দিয়ে শাপলা বানানোর আদি মর্ম আমরা বুদ্ধিহীনেরা কখনো বুঝব না। ’ আমার কথা শুনে দাদা প্রাণ খুলে হাসলেন। বললেন, ‘রাগ করবেন না। এখন কর্তৃপক্ষ অবুঝ হয়ে বসে আছে। যেদিন ওদের নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হবে, সেদিন বটের মূল্য ঠিকই বুঝবে। দেখবেন, সিমেন্টের শাপলার পাশে ওরা একটা বটের চারা লাগিয়ে দিয়ে তাকে স্বাধীনভাবে বাড়তে দেবে। ’ আমি জানি না দ্বিজেনদার প্রত্যাশা কোনো দিন পূরণ হবে কিনা! এরপর ঢাকা শহরের আনাচে-কানাচে কোথায় কোন গাছ ছিল, কারা সেগুলোকে দিনে দিনে খুন করেছে সেসব কথা দাদা আপন মনে বলে গেলেন। একসময় দ্বিজেনদার ফোনে চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় লাইন কেটে গেল। এরপর দাদার সঙ্গে আর কথা হয়নি। দ্বিজেনদার সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয়ের অনেক আগে গাছের পরিচয় নিয়ে দাদার সঙ্গে আমার পরোক্ষ পরিচয়ের ঘটনা না বললে এই অসামান্য স্মৃতির বর্ণনা অপূর্ণ রয়ে যাবে। অনেক বছর আগে আমার ছোট ছেলে যখন নটর ডেম কলেজের ছাত্র সে সময় পুত্রের দুষ্টুমির দায়ে জবাবদিহি করার জন্য আমি মাঝে মাঝে নটর ডেম কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সশরীরে হাজিরা দেওয়ার তলব পেতাম। কলেজের প্রশাসনিক ভবনের দোতলার প্রশস্ত বারান্দার কোনায় লম্বা বেঞ্চে তলবি অভিভাবকদের বসার স্থায়ী বন্দোবস্ত। পুরনো ছাদের হলুদরঙা দালানের কোনায় নাগেশ্বর গাছ। নাগেশ্বর গাছের কিছু ডাল ফুলের ভারে বেঞ্চের পাশে চওড়া রেলিংয়ের গায়ে এলিয়ে পড়েছে। গাছের ডালে হালকা গোলাপি ফুলের বাহার। একদিন শিক্ষকের দরবারে হাজির হওয়ার জন্য যখন বেঞ্চের কোনায় বসে অপেক্ষা করছি তখন একজন মহিলা পাঁচ-ছয় বছর বয়সী একটি ছেলে নিয়ে ওখানে এলেন। অল্পবয়সী ছেলেটি দুরন্তপনায় চ্যাম্পিয়ন। সে বারান্দায় হাজির হয়ে দপদপিয়ে পা ফেলে সোজা নাগেশ্বরের ঝুলে পড়া ডালের পাশে চলে এলো। ফুলগুলোর দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে আচমকা আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এটা কী ফুল?’ আমি বললাম এটি নাগেশ্বর। ছেলেটি নুয়ে পড়া ডাল থেকে একটা ফুল ছিঁড়ে নেওয়ার ফাঁকে আমার মাথায় চাটি মেরে জিজ্ঞাসা করল, ‘এটা যে নাগেশ্বর সেটা তুমি কেমন করে জানলে?’ আমি বুঝলাম ছেলেটি দুরন্তের বাড়া হালকা মস্তান এবং সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত। ভেবে দেখলাম, অমন খুদে মস্তানের প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সেজন্য বারান্দার রেলিংয়ের ওপর ঝুঁকে গাছের গায়ে আঙ্গুল তাক করে দেখিয়ে বললাম, ‘ওই দেখো, গাছের গায়ে টিনের পাতে লেখা আছে এটা নাগেশ্বর গাছ। ’ আমার প্রশ্নের জবাবে ছেলেটি কপালে গেরো তুলে জিজ্ঞাসা করল, ‘গাছের গায়ে নাগেশ্বর নাম কে ঝুলিয়েছে?’ সেদিন আমি খুদে মস্তানের প্রশ্নের জবাব জানতাম না বলে চুপ করে ছিলাম। এখন জানি, নটর ডেম কলেজের ছাত্রদের গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার তাগিদ থেকে একসময় এই কলেজের বোটানির শিক্ষক প্রকৃতিবন্ধু দ্বিজেন শর্মা কাজটি সযত্নে করেছিলেন। দ্বিজেনদা যত্ন করে কাজটি করেছিলেন বলে আমি এবং সেই দুরন্ত শিশুটি সেদিন জেনেছিলাম, অমন বাহারি ফুলের গাছটির নাম নাগেশ্বর।

লেখক : কথাসাহিত্যিক।