এইচএসসিতে অটো পাস: উচ্চশিক্ষা ও চাকরির বাজারে জটিলতা বাড়বে

প্রকাশিত: ৩:১৯ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২০ | আপডেট: ৩:১৯:পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২০

করোনার প্রাদুর্ভাবে এবা’রের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এসব শিক্ষার্থীকে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও এসএসসির ফলের গড় অনুযা’য়ী এইচএসসির ফল নির্ধারণের ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে এবার শতভাগ শিক্ষার্থীই পাস করবে। তবে পরীক্ষা ছা’ড়াই পাসের ফলে শিক্ষার্থীদের বিশ্ব’বিদ্যালয় ভর্তি ও চাকরির বাজারে জটিলতায় পড়তে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এইচএসসির পরই শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যা’য়ের লেখাপড়ায় যায়। ভবিষ্যতে তা’রা কোন পেশায় যেতে পারবে—এ পর্যায়েই তা অনেকখানি নির্ধারিত হয়ে যায়। ফলে এইচএস’সি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এবার এইচএসসি পরীক্ষা না হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগামী শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা’য় ১০০ নম্বরের মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলের জন্য মাত্র ২০ নম্বর নির্ধারণ করেছে। আগে ২০০ নম্বরে’র মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসির জন্য নির্ধারিত ছিল ৮০ নম্বর।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যারা দুই বছর ধরে পড়া’শোনা করল, তার কোনো মূল্যায়ন না রেখে চার বছর আগে একজন শিক্ষার্থী কী করেছে, তা দিয়ে মূল্যায়ন করলে প্রশ্ন থেকেই যায়। যার ব্যা’পক প্রভাব পড়বে উচ্চশিক্ষায়। কারণ অনেক শিক্ষার্থীই হয়তো এসএসসিতে কোনো কারণে খা’রাপ করেছিল, তবে এইচএস’সিতে তা পোষানোর জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষা না হওয়ায় তা আর সম্ভব হলো না। এতে সে হ’য়তো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দে’ওয়ারই সুযোগ পাবে না। চাকরি ক্ষেত্রেও ২০২০ সালের এইচএসসি ও সমমান উত্তীর্ণরা ‘টো’য়েন্টি টোয়েন্টি’ ব্যাচ বলে অভি’হিত হতে পারেন।

বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশ’রুর  বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁসসহ নানা কার’ণে বেসরকারি চাকরিদাতাদের এসএসসি ও এইচএসসির মতো পরীক্ষার প্রতি আ’গ্রহ আগে থেকেই কম। তবে সরকারি চাক’রিতে পাবলিক পরীক্ষার ফলটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। বেসরকারি চাক’রিদাতারা মূলত দেখেন সে কোন ইউনিভা’র্সিটিতে পড়ালেখা করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফল কেমন, ইন্টারভিউতে কেমন করল। এ’খন শিক্ষার্থী যদি বিকল্প মূল্যায়নের জ’ন্য ভালো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে না পারে, সেটা বড় সমস্যা।’

নাম প্রকা’শ না করে একটি বেসরকারি কম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্ম’কর্তা বলেন, ‘যেহেতু এই বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা ছাড়াই পাস করেছে, তাদের চাক’রির ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় কিছুটা বেশিই যাচা’ই করা হবে। তবে একজন শিক্ষার্থী যদি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মে’ধার স্বাক্ষর রাখতে পারে, তাহলে তা’কে হয়তো সমস্যায় পড়তে হবে না।’

উচ্চ মাধ্য’মিকে শিক্ষার্থীদের সাতটি বিষয়ে ১৩টি প্রশ্নপ’ত্রে পরীক্ষা দিতে হয়, যে বিষয়গুলোর প্রাপ্ত ফলাফল পরবর্তী সময়ে নম্বর’ত্রে তোলা হয়।

বায়ো’লজি, গণিত, পদার্থ, রসায়ন বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর আ’লাদা পত্র রয়েছে এইচএসসিতে; তবে এসএসসিতে তা নেই। আর জেএসসিতে এসএসসির চেয়ে’ও বিষয় কম।

গত শনিবার রা’জধানীতে এডুকেশন রিফর্ম ইনিশিয়েটিভ (ইআরআই) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘অটো পাস দি’য়ে আমরা জাতি’কে ধ্বংস করে দিচ্ছি। রাজনীতির ক্ষেত্রে বা পরীক্ষার হলে কোথাও কোনোভাবেই অটো পা’স কাম্য নয়। আমরা একটা কল্যা’ণকর রাষ্ট্র চাচ্ছি। এখানে পরীক্ষা দিয়েই এগোতে হবে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা কেন নেওয়া যা’বে না? করোনা হবে? স্বা’স্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন উপায়ে পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে।’

জানা যায়, ২০১৯ সা’লের এইচএসসি ও সমমানে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৩৬ হা’জার ৬২৯ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছিল ৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৭২ জন। গতবার ফেল করেছিল তিন লা’খ ৪৮ হাজার ৪৫৭ জন শিক্ষা’র্থী। যাদের মধ্যে এক বিষয়ে অনুত্তীর্ণ এক লাখ ৬০ হাজার ৯২৯ জন, দু’ই বিষয়ে অনুত্তীর্ণ ৫৪ হা’জার ২২৪ জন এবং সব বিষয়ে অনু’ত্তীর্ণ ৫১ হাজার ৩৪৮ জন এবার পরীক্ষার্থী রয়েছে। যারা এবার আ’র কোনো পরীক্ষায় অং’শ না নিলেও উচ্চ মাধ্যমিকের সনদ পাবে। ফলে মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন তুলে’ছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্টরা বল’ছেন, গত বছর এইচএসসিতে জিপিএ ৫ ছিল মাত্র ৪৭ হাজার। ‘কিন্তু জেএসসি ও এসএসসির ফলাফলের ভিত্তিতে এইচএসসির মূল্যায়ন হলে জিপিএ ৫ প্রা’প্তির সংখ্যাও দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। এতে বিশ্ব’বিদ্যালয়ে ভর্তিতে জটিলতা তৈরি হবে। এ ছাড়া যারা এইচএসসিতে এসে বিভা’গ পরিবর্তন করেছে, তা’দের মূল্যায়ন নিয়েও জটিলতা তৈরি হবে। কারণ তাদের এসএসসি ও এইচএসসির বেশির ভাগ বি’ষয়ের সঙ্গেই মিল নে’ই।

জাতিসংঘের হি’সাব অনুযায়ী, চলতি বছর ১৫ জু’লাই পর্যন্ত ধনী ও মধ্যম রাষ্ট্রের ৪০ শতাংশ এবং গরিব রাষ্ট্রের ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা’দের সুপারিশে পরীক্ষা বাতিল বা অ’টো পাসের বিষয়ে কোনো কিছু বলা হয়নি। আমাদের পা’র্শ্ববর্তী দেশগুলোও এ ধরনের বড় পরী’ক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়নি। আমাদের দেশের এইচএসসি পরীক্ষা যখন বাতিল করা হয়, সেই সময়েই ইংলিশ মিডি’য়ামের ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলের প’রীক্ষা গ্রহণের অনুমতি ঠিকই দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

বিদেশে পড়তে ইচ্ছুক শি’ক্ষার্থীদেরও এবারের এইচএসসির ফ’লাফল ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এইচএসসি পরীক্ষার ফ’লকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। কিন্তু পরী’ক্ষা ছাড়া এইচএসসির ফল এ’বার তারা কতটা মূ’ল্যায়ন করবে তা নিয়ে সন্দিহান সং’শ্লিষ্টরা।