সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সংলাপের আহ্বান বিএনপির

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১১:৪১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০১৮ | আপডেট: ১১:৪১:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৩, ২০১৮

বাস্তবতা মেনে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জনগণের স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকারের কোন বিধান নেই বলে জানান তিনি। ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ছিল অনৈতিক, অসাংবিধানিক।

শনিবার চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের বিএনপির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফখরুল এসব কথা বলেন।

গতকাল প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষদিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কী ভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আমাদের সংবিধানে সম্পূর্ণভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বতোভাবে নির্বাচন কমিশনারকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য নির্বাচনকে ঘিরে বিদ্যমান সংকটকে আরো ঘনীভূত করে তুলেছে মন্তব্য করে মির্জা ফখরুল বলেন, সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী যদি সংসদ বহাল রেখে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা হলে সেই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। কারণ সংসদ বহাল থাকা অবস্থায় নির্বাচনকালীন সরকারও হবে বিদ্যমান সরকারেরই অনুরুপ। সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার কেবল রুটিন ওয়ার্ক করবে- এমন কিছু উল্লেখ নেই- বলেন তিনি।

সংবিধানের ১৫তম ও ১৬ তম সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শাসনকে পাকাপোক্ত করার একটি ব্যবস্থাই করা হয়েছে মাত্র বলে মন্তব্য করেন তিনি। ফখরুল বলেন, সংবিধান ও গণতন্ত্র সবসময় সমার্থক বা সমান্তরাল হয় না। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি আন্তরিকভাবে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে নতুন কিছু ভেবে থাকেন তা হলে তার উচিত হবে এ নিয়ে সকল স্টেক-হোল্ডারদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেয়া। আমাদের দল মনে করে একটি আন্তরিক ও হৃদ্যতপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে ২০১৮’র নির্বাচন সম্পর্কে অর্থবহ সমাধানে আসা সম্ভব। নির্বাচনকালীন সরকারের রুপরেখা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আমাদের দলের একটি চিন্তা-ভাবনা আছে। একটি সুন্দর পরিবেশে সংলাপটি অনুষ্ঠিত হলে জাতির মনে যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আমরা আস্থা রাখতে চাই- বলেন ফখরুল।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ জাতিকে হতাশ, বিস্ময়-বিমূঢ় এবং উদ্বিগ্ন করে তুলেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, এই ভাষণে বিদ্যমান জাতীয় সঙ্কট নিরসনে স্পষ্ট কোন রুপরেখা নেই। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে তিনি যা বলেছেন তা খুবই অস্পষ্ট, ধোঁয়াশাপূর্ণ, এবং বিভ্রান্তিকর। জাতি আশা করেছিল তার প্রধানমন্ত্রিত্বের এই মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার এক বছর আগেই তিনি যে ভাষণ দেবেন সে ভাষণে থাকবে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা, জাতীয় সংকট নিরসনে একটি স্পষ্ট রুপরেখা এবং জনগণের উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য থাকবে বিভ্রান্তির বেড়াজালমুক্ত কর্ম পদক্ষেপ। পাকিস্তানের স্বৈর সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান তার শাসনের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উন্নয়ন দশক পালন করেছিলেন উল্লেখ করেন তিনি।
ফখরুল বলেন, গণতন্ত্রহীন তথাকথিত উন্নয়ন জনগণ গ্রহণ করেনি। পরিণতিতে তার মত ‘লৌহমানব’কে ক্ষমতা থেকে সমস্ত পাকিস্তানব্যাপী গণঅভ্রত্থানের মুখে বিদায় নিতে হয়েছিল। বর্তমান সরকারও ‘উন্নয়নমেলা ’ করছে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস পাকিস্তানি আমলের স্বৈরশাসক ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার জন্য যে ধরনের চমকের আশ্রয় নিয়েছিলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও সেই একই পথে হাঁটছে।

প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে তার শাসনামলে উন্নয়নের বয়ান পেশ করেছেন মন্তব্য করে বিএনপির এই মহাসচিব বলেন, ‘জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাদের দাবির সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানও একমত হতে পারেনি। জানুয়ারি ২০১৭ এর বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসেপেক্টাস থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৩ শতাংশের বেশি হবে না। অথচ অর্থমন্ত্রী দাবি করেছিলেন এই প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে হবে না। অন্যদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭.২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে। অথচ সরকার এ অর্থবছরে ৭.৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। এ ভাবে প্রায় প্রতি বছরই প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত সরকারী প্রাক্কলেনের সংগে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো দ্বিমত পোষন করে আসছে। আমাদের প্রশ্ন হলো, জনগণ কোন তথ্য বিশ্বাস করবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে অন্যান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের একটি সহসম্পর্ক থাকার কথা। কিন্তু আমদানি রপ্তানি, বৈদেশিক র্যা মিট্যান্স, ঋণ প্রবাহ প্রভৃতির সংগে সরকারের প্রবৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রাক্কলনের সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিসংখ্যানের তেলেসমাতি করে সরকার বরাবরই জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। প্রধানমন্ত্রীও তাই করলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, মেগা-প্রকল্পগুলো নিয়ে গণমাধ্যম ইতোমধ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করছে। এ সব প্রকল্পের ব্যয় ভারত, চীন ও ইউরোপের দেশগুলোর তুলনায় দুই থেকে তিন গুন বেশি। সঠিক সময়ে প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়িত না হওয়ায় একাধিকবার প্রকল্প-ব্যয় উধ্বমুখী সংশোধন করতে হচ্ছে । ফলে এ সব প্রকল্প থেকে কাংখিত কল্যান সুদূরপরাহত হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হল এই সরকারের দাবীকৃত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যাচ্ছে কোথায়- প্রশ্ন রাখেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় ‘আগুন সন্ত্রসে’ নিহতদের কথা বলেছেন উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ঐ সন্ত্রাস আসলে কে করেছে? এটা জানার আগ্রহ আমাদেরও।