কী ঘটেছিল সেদিন বঙ্গভবনে

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৮ | আপডেট: ৬:৫৯:পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৮

ডেস্ক রিপোর্ট : বাংলাদেশে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতার বিন্যাস-বদলে যা ঘটেছিল তা আজও কৌতূহলোদ্দীপক। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। সারা দিনই চলেছে নানা জল্পনা-কল্পনা। তত্কালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা দুপুরের দিকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও বাসভবন ‘বঙ্গভবন’-এ

গিয়েছিলেন। সে সময়ের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জেনারেল মইন উ আহমেদ ‘শান্তির স্বপ্নে : সময়ের স্মৃতিচারণ’ শীর্ষক একটি বই লিখেছেন। এতে তিনি বর্ণনা করেছেন তত্কালীন রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে বৈঠকে কীভাবে দেশে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টি উঠে এসেছিল। খবর বিবিসি বাংলা’র।

বইতে জেনারেল মইন লিখেছেন, ‘আমি প্রেসিডেন্টকে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি, নির্বাচন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের আলটিমেটাম এবং বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের অবস্থান, বিশেষ করে নির্বাচনের ব্যাপারে জাতিসংঘের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানালাম। জাতিসংঘ মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করা হলে যে বিপর্যয় ঘটতে পারে তা সবিস্তারে বর্ণনা করলাম। নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রেসিডেন্টকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে সচেষ্ট হলো।’ সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী। তিনি ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দেশে যে ধরনের সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে সে বিষয়টি গোয়েন্দা দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে বুঝিয়েছেন। সার্বিক বিবেচনায় সামরিক কর্মকর্তারা জরুরি অবস্থান জারির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরলেন। দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হতে পারে— এমন ধারণা পেলেও বিষয়টি নিয়ে ১১ জানুয়ারি সারা দিনই নিশ্চিত হতে পারছিল না আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা। সেদিন দুপুরে প্রভাবশালী কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের। সে বৈঠকটি হয়েছিল ঢাকাস্থ কানাডীয় হাই কমিশনারের বাসায়। সেখানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের পাশাপাশি আমেরিকার রাষ্ট্রদূত এবং ভারতের হাই কমিশনার উপস্থিত ছিলেন। সে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম।

সে বৈঠকের বর্ণনা দিতে গিয়ে শেখ ফজলুল করিম সেলিম বিবিসিকে বলেছিলেন, বিভিন্ন কথার একপর্যায়ে তারা বলল, ‘এভাবে তো দেশ চলতে পারে না। এর কম হলে তো বিশৃঙ্খলা-অরাজকতা বাড়বে। আপনারা দুই দল যদি সমঝোতায় না আসেন তাহলে অন্যরকম ঘটনা ঘটতে পারে।’ উনাদের কথায় মনে হলো কী যেন একটা ঘটছে। কারণ তারা পজেটিভ কিছু বললেন না। একদিকে রাস্তায় আওয়ামী লীগের আন্দোলন এবং অন্যদিকে বঙ্গভবনে সেনা কর্মকর্তাদের তত্পরতা চলছে। একই সঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকরা। অন্তরালে কী ঘটতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে অনেকটা অন্ধকারে ছিল সদ্য ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়া দল বিএনপি। দলটি তখন ২২ জানুয়ারির নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ১০ জানুয়ারি গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লায় নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন। তখন তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির সিনিয়র নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। খন্দকার মোশাররফ বলেছিলেন, ‘কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত জনসভা হয়েছিল। আমরা রাত ১টার সময় ঢাকায় ফিরে আসি। ১১ তারিখ বিকালের দিকে জানতে পারলাম যে সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা বঙ্গভবনে গিয়েছেন এবং সেখানে কিছু একটা হচ্ছে। জাতিসংঘের কিছু একটা চিঠি নিয়ে সেনাপ্রধান এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে জরুরি আইন ঘোষণা করাচ্ছেন।’ সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন সেটি নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে তীব্র বিরোধের কারণে অনেকটা সময় ধরে সহিংস পরিবেশ ছিল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগে থেকেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট রাস্তায় আন্দোলন করছিল। একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়ে বসলেন।

জেনারেল মইন তার লেখা বইতে জরুরি অবস্থা জারির পেছনে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেছেন। ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের জন্য শপথ নিলেন ইয়াজউদ্দিন আহমেদ।

জেনারেল মইনের বইতে বর্ণনা ছিল এ রকম : ‘একসময় ক্ষমতাধর কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি আমার সাথে দেখা করে জানাল, সব দলের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে নির্বাচনে সেনাবাহিনী সহায়তা করলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহারের জন্য তারা জাতিসংঘকে অনুরোধ করবে। প্রচ্ছন্ন এ হুমকির পরিণতি অনুধাবন করতে আমার অসুবিধা হলো না। জাতিসংঘের কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রক এসব দেশের অনুরোধ ও মতামত যে জাতিসংঘ অগ্রাহ্য করতে পারবে না তা বলাই বাহুল্য। আমি এর পরিণাম চিন্তা করে শিউরে উঠলাম। তারপরেও আমার একমাত্র চিন্তা ছিল কীভাবে সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা যায়।’” সে সময় ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন ড. শোয়েব আহমেদ। ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে যখন সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনিশ্চিত হযে পড়ল তখন ‘ভিন্ন কিছু’ আঁচ করছিলেন তিনি। সেদিন সব উপদেষ্টাকে বঙ্গভবনে যাওয়ার জন্য অনুরোধ পাঠিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। ড. শোয়েব আহমেদ বঙ্গভবনে গিয়ে জানতে পারেন যে তিন বাহিনীর প্রধান রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠক করছেন। তখন উপদেষ্টা পরিষদের সবাই জানতে পারলেন যে রাষ্ট্রপতি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করবেন। কিন্তু বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তখনো তাদের জানানো হয়নি।

শোয়েব আহমেদ বলেন, একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি আমাদের সঙ্গে চা-চক্রে মিলিত হলেন। সেখানে তিনি জানালেন যে পরিস্থিতির জটিলতার কারণেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভেঙে দিতে হচ্ছে। আমরা সবাই পদত্যাগ করে চলে এলাম।

সে রাতেই শুরু হয়েছিল আরেকটি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া। প্রথমে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসকে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলো। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। তখন ড. ফখরুদ্দীন আহমদ প্রস্তাব পেয়ে এগিয়ে এলেন। সেনাপ্রধান জেনারেল মইনসহ বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা সে প্রক্রিয়া চালিয়েছিলেন।

ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন সে সরকারে অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। তিনি বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘আমার কাছে লোক পাঠানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল যে, আপনি আসেন। বলা হয়েছিল যে এটা কেউ জানবে না। সে হিসেবে আমি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গেলাম। সেখানে দেখলাম সামরিক বাহিনীর বড় বড় কর্মকর্তা ১৫-২০ জনের মতো উপস্থিত। মইনুল হোসেন ধারণা করেছিলেন, হয়তো সামরিক শাসন জারি হতে যাচ্ছে। তখন জেনারেল মইন উ আহমেদ সবার সামনে দেশের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলেন এবং মইনুল হোসেনকে নতুন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারে যোগ দিতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বললেন, সরাসরি সরকারে যোগ না দিয়ে তিনি নতুন সরকারের পেছনে থেকে সহায়তা করবেন। যুক্তি হিসেবে মইনুল হোসেন সরকার পরিচালনায় তার অনভিজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তখন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য তাকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছিলেন। ১/১১ পূর্ব বাংলাদেশে রাজনৈতিক যে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, জেনারেল মইন তার বইতে সে সময়ে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি বলে বর্ণনা করেছেন। মইনুল হোসেন বলেন, ‘আমাকে ৪৮ ঘণ্টা পরে ফোন করা হলো। এর মধ্যে আমি জানলাম যে ড. ফখরুদ্দীনকে প্রধান উপদেষ্টা করা হবে। তখন আমি ভাবলাম যে ফখরুদ্দীন যদি থাকেন তাহলে ঠিক আছে। যাওয়া যেতে পারে। আমি ফখরুদ্দীন সাহেবের সঙ্গে কথাও বললাম। উনি বললেন যে তুমি যদি আস তো ভালোই হয়। এভাবেই আমি রাজি হয়েছি।’

ড. ফখরুদ্দীন আহমদের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় পার্টি প্রধান এইচএম এরশাদ ও মহাজোটের অন্য নেতারা।

সে সরকার আওয়ামী লীগের আন্দোলনের ফসল বলে উল্লেখ করেছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু সে সরকার একপর্যায়ে বিএনপির পাশাপাশি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকে গ্রেফতার করে। শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, শুরুতে ভালো কথা বলা হলেও পরে সে সরকারের উদ্দেশ্য পাল্টে গিয়েছিল।

একপর্যায়ে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়ার জন্য তখনকার সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় অনেক ব্যবসায়ীকেও আটক করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের ওপর ছিল কড়া নজরদারি। একটি সাধারণ নির্বাচনের জন্য সেনাসমর্থিত সরকারের ওপর চাপও বাড়ছিল। অবশেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সব দলের অংশগ্রহণে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দুই বছর পর দেশে ফিরে এলো গণতান্ত্রিক পরিবেশ। বাংলাদেশ প্রতিদিন