এমসি কলেজের সেই ছাত্রাবাসে দখল, সংঘর্ষ, গণধর্ষণে ‘জড়িত ছাত্রলীগ’

প্রকাশিত: ২:২৫ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০ | আপডেট: ২:২৫:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০

গৃহবধূ গণধ*র্ষ ণের ঘটনায় খবরের শিরোনামে সিলেট মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজের ছাত্রাবাস।ছাত্রাবাসটি কাদের নিয়ন্ত্রণে এবং করো’নাকালীন বন্ধ থাকার পরও কেন সেখানে ছাত্ররা অবস্থান করছিল এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানামহলে।

জানা গেছে, করো’না পরিস্থিতিতে গত ২৫ মা’র্চ থেকে ছাত্রাবাস বন্ধ রয়েছে। এরপরও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বেশকিছু ছাত্রলীগ পরিচয়ধারী শিক্ষার্থী বন্ধের সময়েও ছাত্রাবাসে বসবাস করে আসছিল। তাদের সঙ্গ দিতে বহিরাগতরাও এসে থাকত।

ছাত্রাবাস এলাকার আশপাশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জানিয়েছেন, করো’নায় কলেজ বন্ধ থাকলেও ছাত্রাবাসে শিক্ষার্থীদের দেখা গেছে। প্রতি রাতেই ছাত্রাবাসের ভেতর থেকে হৈ-হুল্লোড়ের আওয়াজ শোনা যেত।

এ বিষয়ে টিলাগড় এলাকার এক যুবলীগ নেতা বলেন, প্রতি রাতে ছাত্রাবাস থেকে জো’রে চি’ৎকার-চেঁচামেচির শব্দ ভেসে আসত। আওয়াজ শুনে লোকেরা উৎসুক হয়ে ভেতরে প্রবেশ করে দেখেছেন, এসব ছাত্ররা ম’দ-জুয়ার আসরে বসেছে। সেখানে অ’স্ত্রের মজুতও ছিল।

তিনি বলেন, শুক্রবার রাতেও এরকম চি’ৎকার আর শোরগোলের শব্দ শুনি আম’রা। নিয়মিত কা’ণ্ড ভেবে প্রথমে কেউ তেমন পাত্তা দেয়নি। আম’রা সবাই মনে করেছিলাম, প্রতি রাতের মতো আজও হয়ত ম’দ-জুয়ার আসর বসেছে। পরে নারীকণ্ঠের চি’ৎকার শুনে অনেকেই এগিয়ে গিয়ে ওই গণধ*র্ষ ণ ঘটনার সাক্ষী হন।

গণধ*র্ষ ণ ঘটনায় ছাত্রলীগের কেউ জ’ড়িত নয় বলে সংগঠনটি থেকে দাবি করা হলেও ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ছাত্রাবাসটি ছাত্রলীগের দখলেই ছিল বলে জানিয়েছেন এমসি কলেজের শিক্ষার্থীরা।পত্রিকার আর্কাইভও বলছে একই কথা।

পেছনের ইতিহাস বলছে, এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের দখল নিয়ে ছাত্রলীগ কর্মীরা নিজেদের মধ্যেই বিরোধে জড়িয়েছেন কয়েকবার। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সং’ঘর্ষের ঘটনায় ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সং’ঘর্ষে ছাত্রাবাসে ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। তখন কিছুদিন ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। ২০১৯ সালের ৬ আগস্ট রাতে ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের কক্ষ দখল নিয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মা’রামা’রির ঘটনায়ও বেশ কিছুদিন ছাত্রাবাস বন্ধ ছিল।

শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের বক্তব্য মতে, গত ৬ বছরে ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগ ছাড়া আর কোনো দলের আধিপত্য দেখা যায়নি।পু’লিশ ও স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে ছাত্রাবাসের ওই ৭ নম্বর ব্লকে গৃহবধূ ধ’র্ষিত হন। এটি ২০১২ সাল থেকে ছাত্রলীগের দখল করা কক্ষ হিসেবে পরিচিত। ওই কক্ষে ছাত্রলীগের একটি পক্ষের ৬-৭ কর্মী থাকেন। তারাই এ ঘটনার সঙ্গে জ’ড়িত।

মা’মলার এজাহার অনুযায়ী, গণধ*র্ষ ণে অ’ভিযু’ক্ত প্রধান আ’সামি সাইফুর রহমান (২৮) এমসি কলেজের ছাত্রলীগ নেতা। এছাড়া এমসি কলেজের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনিও (২৫) ছাত্রলীগ নেতা। অ’ভিযু’ক্ত মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), রবিউল ইস’লাম (২৫), অর্জুন লস্কর (২৫) ও তারেকুল ইস’লাম তারেক (২৮) ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে পরিচিত।

এদের মধ্যে রবিউল ও তারেক (২৮) বহিরাগত ছাত্রলীগ কর্মী।অ’ভিযু’ক্তরা ছাত্রলীগের কেউ নয় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুক্রবার সন্ধ্যার পর গণধ*র্ষ ণের ঘটনার খবর পেয়ে টিলাগড় এলাকার একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা ও কয়েকজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছিলেন। তারা ঘটনা ধাপাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন। আপস মীমাংসারও চেষ্টা চালান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, সন্ধ্যার পর ধ*র্ষ ণের ঘটনা ঘটলেও ভিকটিমকে উ’দ্ধার করে হাসপাতা’লে নেয়া হয়নি। রাত ১২টার পর তাকে হাসপাতা’লে ভর্তি করা হয়েছে। মাঝখানে এই লম্বা সময় ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ধর্ষকদের বাঁ’চাতে প্রভাব খাটিয়েছেন।

যে কারণে প্রশ্ন উঠেছে, ধর্ষকরা ছাত্রলীগের কেউ না হলে তাদের বাঁ’চাতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা ম’রিয়া হয়ে যাবে কেন?

এ বিষয়ে সিলেট নগরীর আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, নানা বিতর্কের কারণে সিলেট জে’লা, মহানগর, এমসি কলেজসহ অনেক ইউনিটেই ছাত্রলীগের কোনো কমিটি নেই। এখন যে যার মতো ‘ছাত্রলীগ নেতা’ পরিচয় দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অনেকে নানা অ’পকর্ম করছে।

এ ঘটনার তীব্র নিন্দা করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শা’স্তির দাবি জানিয়েছেন সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন। তিনি বলেন, কোনো দুর্বৃত্ত, অ’পকর্মকারী বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মী হতে পারে না।

প্রসঙ্গত, গত ৮ বছরে ৩টি ক’লঙ্কের সাক্ষী হয়েছে এমসি কলেজ। ২০১২ সালের ৮ জুলাই সন্ধ্যায় ছাত্রশি’বির ও ছাত্রলীগের সং’ঘর্ষের জেরে আ’লোচিত ছাত্রাবাসে আ’গুন দেয়া হয়। এতে ৪২টি কক্ষ ভস্মীভূত হয়।

২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে খাদিজা আক্তার নার্গিসকে প্রকাশ্যে কু‌‌’পিয়ে গুরুতর আ’হত করেন শাবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বদরুল আলম। এ ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সর্বশেষ ঘটনার পৈশাচিকতা আগের ঘটনাগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করছেন অনেকে।