ছবি মুক্তির প্রক্রিয়া কী হবে এখন?

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৭:৫৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০১৭ | আপডেট: ৭:৫৭:অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০১৭
ছবি মুক্তির প্রক্রিয়া কী হবে এখন?

চলচ্চিত্রপাড়া এখন দুই ভাগে বিভক্ত। এফডিসির অভ্যন্তরীণ ১৮টি সংগঠন এক হয়ে ‘চলচ্চিত্র পরিবার’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। অন্যদিকে একই অঙ্গনের বেশ কয়েকজন প্রযোজক পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলী মিলে ‘চলচ্চিত্র ফোরাম’ নামে আরও একটি সংগঠন তৈরি করে। দুটি সংগঠনেরই উদ্দেশ্য চলচ্চিত্র শিল্পের অগ্রগতি ও উন্নয়ন। আদপে কি তাই? ছবি নির্মাণ কিংবা মুক্তির ক্ষেত্রে এত দিনকার যে রেওয়াজ ও নিয়ম ছিল, চলচ্চিত্র ফোরাম কি সেই একই নিয়ম মেনে চলবে? নাকি নতুন কোনো উপায়ে তারা ছবি মুক্তি দেবে? বিস্তারিত লিখেছেন এফ আই দীপু
[ছবি মুক্তির প্রক্রিয়া কী হবে এখন?]
অনেকের মতে, চলচ্চিত্র পাড়ায় এখন কিছুটা স্বস্তির হাওয়া বইছে। এ হাওয়াটা খুব যে স্বস্তির হাওয়া তা কিন্তু নয়। বলা যায়, ক’দিন আগেও যে মামলা, হামলা, ঝামেলা, নিষেধাজ্ঞা, বয়কট ও একে অন্যের প্রতি কাদা ছোড়াছুড়ি দেখা গেছে, সেটি আর এখন হয়তো নেই। তবে রয়েছে স্নায়ু যুদ্ধ। এ স্নায়ু যুদ্ধের মূলে রয়েছে নতুন ফোরাম গঠন। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আরও কয়েকটি সংগঠন আসারও অপেক্ষায় রয়েছে।

এ সংগঠন নিয়েই এখন তারকা ও সিনেমার কলাকুশলীদের মধ্যে চলছে দ্বন্দ্ব। যে দ্বন্দ্ব ঢাকাই ছবিকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে সেটি বলতে পারছেন না কেউ। মূলত দুটি সংগঠনকে ঘিরেই যত আলোচনা-সমালোচনা। এতদিন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়ায় ছবির নাম নিবন্ধন, শুটিং, সেন্সর কিংবা মুক্তি দেয়া হতো। যে নিয়মটি চলচ্চিত্র পরিবারেরই দখলে রয়েছে।

নতুন করে ফোরাম তৈরি হওয়ায় এখন ছবি নির্মাণপূর্ব অনুমতি, নাম নিবন্ধন ও মুক্তির আগে অনুমতি নিয়ে বেশ জটিলতাই তৈরি হবে। কারণ যে যাই বলুক ক’দিন আগে গঠিত হওয়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ফোরাম কিন্তু শিল্পী, কলাকুশলীদের রেষারেষি আর বয়কট, নিষেধাজ্ঞা সংস্কৃতির জন্যই তৈরি হয়েছে। তা না হলে এমন একটি ফোরাম গঠনের প্রয়োজনীয়তা খুব একটা ছিল না।

শিল্পী সমিতি আর পরিচালক সমিতি যখন ঠুনকো কারণ দেখিয়ে তারকা শিল্পী ও পরিচালকদের বয়কট করছিল তখন বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। নিজেদের অপছন্দের লোকদের বিপক্ষে দাঁড়াতে শিল্পী সমিতি ও পরিচালক সমিতির সঙ্গে এফডিসিকেন্দ্রিক আরও ১৬টি সংগঠন জোট বেঁধে ‘চলচ্চিত্র পরিবার’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করাল। তখনই চলচ্চিত্রের ভুক্তভোগী কিংবা বয়কট, নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে থাকা শিল্পী, কলাকুশলীরা নিজেদের বাঁচাতে নতুন করে জোট বাঁধলেন। চলচ্চিত্রের অনেক গণ্যমান্যদের একাংশ মিলে গঠন করলেন ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ফোরাম’।

তবে ফোরাম প্রতিষ্ঠাকারীরা দাবি করছেন, এটি হচ্ছে চলচ্চিত্র শিল্পীদের সর্বজনীন সংগঠন। এটি চলচ্চিত্রের প্রডাকশন বয় থেকে শুরু করে সবার ভালোমন্দের দিক নিয়েই ভাববে। অন্যান্য সংগঠনের সদস্যরাও এতে সদস্য হতে পারবেন। অর্থাৎ শিল্পী সমিতি, পরিচালক সমিতি, সহকারী পরিচালক সমিতির মতো সব সংগঠনই এর ছায়াতলে থাকবে। একদিক থেকে যুক্তি দাঁড় করালে এটিই বর্তমানে চলচ্চিত্র শিল্পীদের সবচেয়ে বড় সংগঠন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ সংগঠন কিংবা ফোরামের ক্ষমতা কতটুকু? ছবি নির্মাণের প্রাথমিক অনুমতি অর্থাৎ এফডিসিতে নাম নিবন্ধন ও এফডিসির ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করতে এ সংগঠনের অনুমতিই যথেষ্ট? নাকি অন্য কোনো সংগঠনের অনুমতির প্রয়োজন হবে? বর্তমান নিয়মানুযায়ী কোনো নির্মাতা নতুন ছবি নির্মাণ করতে চাইলে প্রথমে পরিচালক সমিতির কাছ থেকে নাম নিবন্ধন করার প্রয়োজন পড়ে।

পরিচালক সমিতি থেকে নামের ছাড়পত্র পাওয়ার পর এফডিসি প্রশাসনে নিবন্ধন করতে হয়। এফডিসির অনুমতিপত্র হাতে নিয়েই ছবির শুটিং শুরু করা হয়। সেই সঙ্গে এফডিসির যাবতীয় সুবিধাদিও পান নির্মাতা। আবার শুটিং, এডিটিং, ডাবিং শেষে ছবিটি সেন্সরে জমা দিতে পরিচালক সমিতির একটা ক্লিয়ারেন্সের প্রয়োজন হয়। এ ক্লিয়ারেন্স বা ছাড়পত্র না হলে সেন্সর বোর্ডে ছবিটি প্রদর্শন করা হয় না। যদিও এটি সরকারি কোনো নিয়ম নয় বলেই জানা গেছে।

পরিচালক সমিতির এ ক্ষমতা থাকার কারণেই কিছুদিন আগে ঠুনকো কারণ দেখিয়ে একাধিক নির্মাতাকে বয়কট করে। অন্যদিকে দেখা গেছে, যাদের এ বয়কট ঠেকানোর ক্ষমতা রয়েছে তারা ছবি নির্মাণ করছেন এখনও। কিন্তু যাদের ক্ষমতা একটু কম বা নেই, তারা সমিতির নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ছবি নির্মাণ করতে পারছেন না। কারণ নির্মাণে নামলেই এফডিসির এমডি বরাবর চিঠি দিয়ে সে ছবির শুটিং বন্ধ করে দেয়া হতে পারে, এই ভয় তাদের মধ্যে বিরাজমান। তবে যদি বিকল্প উপায় হিসেবে এফডিসির বাইরে ছবির শুটিং করে ছবিটি শেষ করা হয় তা হলে সেন্সরে জমা দেয়ার সময় পরিচালক সমিতির অনুমতির জন্য আটকে যাবে ছবিটি। যেমন বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা থাকায় নির্মাতা গাজী মাহবুব তার নতুন ছবি ‘ভালোবাসা ২৪.৭’-এর শুটিং করতে পারছেন না। অন্যদিকে তিনি চলচ্চিত্র ফোরামের সদস্য হিসেবে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এ ক্ষেত্রে জটিলতা আরও বেড়ে গেছে।

একদিকে পরিচালক সমিতি কর্তৃক নিষিদ্ধ, অন্যদিকে বিপরীতমুখী একটি সংগঠনের সদস্য হওয়া, এ দুই কারণে কী তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনা থেকে বিরত থাকবেন? কিংবা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ছবি নির্মাণ করলে তার ছবিটির ভবিষ্যৎ কী হবে? এ ক্ষেত্রে ফোরামের নেতারা কী ভাবছেন? এমন প্রশ্ন করা হলে চলচ্চিত্র ফোরামের সভাপতি নাসিরউদ্দিন দিলু বলেন, ‘ফোরাম হচ্ছে বটগাছের মতো। সবাইকে ছায়া দেবে। পরিচালক সমিতি হচ্ছে পরিচালকদের সংগঠন। তাদের গঠনতন্ত্র তাদের কাছে। সে বিষয়ে ফোরাম নাক গলাবে কেন? এ সমিতিতে আগে থেকে যে নিয়মে পরিচালকরা ছবির নিবন্ধন করে আসছে সে নিয়মেই করবে। এটা তো ফোরামের দেখার বিষয় নয়। তবে পরিচালক সমিতির কোনো সদস্য যদি সমস্যায় পড়ে বা সমিতির নিয়মের কারণে তার ছবি নির্মাণে সমস্যা হয় সে বিষয়টি যদি আমাদের কাছে লিখিতভাবে জানায়, ফোরাম আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি মিটমাট করার চেষ্টা করবে। এটা শুধু পরিচালক সমিতির ক্ষেত্রেই নয়, সব সংগঠনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।’

ফোরামের নেতাদের কেউ কেউ বর্তমানে ছবি নির্মাণ করছেন। যেসব ছবি নিয়ে পরিচালক সমিতি কিংবা চলচ্চিত্র পরিবারের ক্ষোভও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে শাকিব খান ও বিদ্যা সিনহা মিম অভিনীত উত্তম আকাশ পরিচালিত ‘আমি নেতা হব’ এবং জাজের প্রযোজনায় কলকাতার রাজা চন্দ পরিচালিত ‘বেপরোয়া’ ছবির নাম উল্লেখ করা যায়। এর মধ্যে ‘আমি নেতা হব’ ছবিটির শুটিং যখন শুরু করা হয়েছিল তখন শাকিব খান চলচ্চিত্র পরিবার কর্তৃক ‘বয়কট’ ছিলেন এবং তাকে নিয়ে যারা ছবি বানাবেন বা তার সঙ্গে যারা কাজ করবেন তাদেরও বয়কট করার হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন পরিবারের নেতারা। কিন্তু এই বয়কটের তোয়াক্কা না করে উত্তম আকাশ শাকিবকে নিয়ে ছবি নির্মাণ শুরু করেন। অথচ তাকে বয়কট করার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি পরিবার। এর মধ্যে অবশ্য পরিবারের সঙ্গে শাকিববিষয়ক ঝামেলা মিটে যায়।

তথাপিও প্রশ্ন থেকে যায়, ‘আমি নেতা হব’ ছবিটি সেন্সরে জমা দেয়ার আগে পরিচালক সমিতি ছাড়পত্র প্রদান করবে কিনা? যদি না করে তা হলে ছবিটি কোন প্রক্রিয়ায় সেন্সর করানো হবে? একই প্রশ্ন ‘বেপরোয়া’ ছবির জন্যও। কিংবা ফোরামের সদস্যরা এখন কী প্রক্রিয়ায় ছবি নির্মাণ করছেন বা করবেন? নামের প্রাথমিক ছাড়পত্রের জন্য পরিচালক সমিতিতে যাবেন কিনা? এ রকম অনেক প্রশ্ন ফোরাম এবং পরিবার নিয়ে উত্থাপিত হয়। অথচ এ প্রশ্নগুলোর উত্তর কিংবা এ সমস্যা সমাধানের কোনো আলোচনা বা উপায় এখনও পর্যন্ত করা হয়নি বা বের হয়নি। এমন প্রশ্নের উত্তরে কী ভাবছেন পরিবারের নেতারা।

এ প্রসঙ্গে পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘পরিচালক সমিতি হচ্ছে চলচ্চিত্র পরিচালকদের একটা ইউনিটি। এ সমিতি চলচ্চিত্র পরিবারের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছে। এ সমিতির আলাদা একটা গঠনতন্ত্র রয়েছে। যারা এর সদস্য তাদের গঠনতন্ত্র মানতেই হয়। এ গঠনতন্ত্রের বাইরে গিয়ে কেউ ছবি বানানো বা মুক্তি দিতে পারে না। এর বাইরে কেউ এখনও যায়নি। আশা করি যাবে না। পরিবার বা ফোরামের নিয়ম নয়। এটা পরিচালক সমিতির নিয়ম। এফডিসি কর্তৃক স্বীকৃত এটি। অনেক সংগঠন হতে পারে। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদও হতে পারে। কিন্তু পরিচালক সমিতির এ নিয়মই থাকবে। সদস্যরা এ নিয়মই মেনে চলবে।’

তবে যে পরিচালকরা সমিতির সদস্য নন, তারা কী প্রক্রিয়ায় ছবি বানাবে? এ প্রশ্নের জবাবে গুলজার বলেন, ‘ছবি যেই বানাক ছবির প্রাথমিক নিবন্ধন তো পরিচালক সমিতি থেকেই নিতে হবে। এরপর এফডিসি। কারণ সবকিছু একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে না গেলে হবে না। ’

ছবি মুক্তি নিয়ে চলচ্চিত্র পরিবার কিংবা ফোরামের জটিলতা প্রসঙ্গে সেন্সর বোর্ড সচিব মুন্সী জালাল উদ্দিন বলেন, ‘এতদিন যে নিয়মে সেন্সর বোর্ডে ছবি প্রদর্শিত হয়ে আসছে সেটিই আপাতত আছে। এখানে কোনো সংগঠনের প্রভাব নেই। তবে প্রতিটি সমিতি বা সংগঠনের গঠনতন্ত্র রয়েছে। সে গঠনতন্ত্র মোতাবেক সদস্যরা না চললে সেন্সর বোর্ডকে সেই সংগঠন লিখিত অভিযোগ জানালে আমরা বিষয়টি আমলে নিই।’

এদিকে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, দুই সংগঠনের বিরোধের কারণে এফডিসি প্রশাসনে ছবি নিবন্ধনের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। গত কয়েকমাসে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি ছবি নির্মাণের জন্য অনুমতি চাওয়া হয়েছে। যেহেতু এফডিসি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, তাই এ প্রতিষ্ঠানেরও কাজকর্ম কিংবা উন্নয়ন নিয়ে সরকারকে জবাবদিহি করতে হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। আগের নিয়ম বলবৎ রেখেই কী এফডিসি তাদের কার্যক্রম চালাবে, নাকি সবার জন্য সবকিছু উন্মুক্ত পরিবেশ বজায় রাখবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।