প্রভাবশালী সিন্ডিকেটে চলছে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে লঞ্চ চলাচল

নাজমুল হক নাজমুল হক

ব্যাবস্থাপনা সম্পাদক

প্রকাশিত: ৮:২১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২০ | আপডেট: ৮:২৫:অপরাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০২০

মাদারীপুর প্রতিনিধিঃ

প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের শক্তিতে চলছে কাঁঠালবাড়ী ঘাটে লঞ্চ চলাচল। তাদের অবৈধ কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিলেই ধর্মঘট ডেকে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে দুর্ভোগ আর সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব করতে অবৈধ সিন্ডিকেটের পক্ষেই সায় দিতে হয় স্থানীয় প্রশাসকে। তাদের বলয় থেকে সরে আসতে পারেনি খোদ বিআইডব্লিউটিএ ও নৌ-মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও। দেশের অন্যতম নৌরুট শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী ঘাটে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অত্যাচার থেকে মুক্তি চায় সাধারণ লঞ্চ মালিকরাও।
অনুসন্ধান করে জানা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সাথে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগের অন্যতম শীর্ষ নৌপথ হচ্ছে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী ঘাট। যার পূর্বে ছিল কাওড়াকান্দি-মাওয়া নৌরুট। তখন এই নৌরুটটির দূরত্ব প্রায় ১৭ কিলোমিটার। এই নৌপথে পারাপারের জন্য ৮৭টি লঞ্চ, দেড় শতাধিক স্পিডবোট ও ১৭টি ফেরি ছিল। লঞ্চ ও ফেরিতে নৌযানের কার্যক্ষমতা ভেদে পদ্মা পার হতে সময় লেগে যেতো দেড় ঘণ্টা। বৈরী আবহাওয়ায় কখনো কখনো দুই ঘণ্টাও লেগে যেতো পদ্মা পার হতে। আর শুস্ক মৌসুমে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় ও বিভিন্ন পয়েন্টে চর জেগে ওঠায় প্রায়ই ফেরি আটকে ঘন্টার পর ঘন্টা দূর্ভোগ পোহাতো যাত্রীরা। যাত্রী ভোগান্তি লাঘবে এই দীর্ঘ নৌপথের দূরত্ব কমিয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে কাঁঠালবাড়ী-শিমুলিয়া নৌপথ চালু হয়। কাওড়াকান্দি ঘাটে তখন লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন বর্তমান শিবচর উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিএম আতাহার বেপারী ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির। এদের আশ্রয়-প্রশ্রয় তখনও গোটা লঞ্চ ঘাট নিয়ন্ত্রণে ছিল।
নির্ভরযোগ্য তথ্য মতে, কাওড়াকান্দি থেকে ঘাট সরিয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে পদ্মা সেতুর এপ্রোচ সড়ক হয়ে ৬ কিলোমিটার দূরে শিবচর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ঘাটে স্থানান্তরিত হয়। সেখানের টার্মিনাল, পল্টুন, আন্তঃসংযোগ সড়ক নির্মানযজ্ঞ সব কিছুই ঘাটের স্থানীয় কিছু নেতাদের হাতের ইশিরায় চলে। এছাড়া কাঁঠালবাড়ী ঘাট চালু হওয়ার পরে এসব নেতারা লঞ্চ মালিকদের গুছিয়ে ঘাটের নেতৃ স্থানীয় হয়ে উঠে। ফলে তাদের হাতেই কাঁঠালবাড়ী ঘাটের লঞ্চ চলাচল ও নিয়ন্ত্রণ থাকে। এদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির লঞ্চ ঘাটের সব আয়-ব্যয়, অর্থ সংগ্রহ, বিতরণ, প্রশাসন ম্যানেজসহ সব কিছুই তার নেতৃত্বে চলে। লঞ্চ মালিকরাও তাদের ঝক্কি ঝামেলা এড়াতে মনিরুজ্জামানের এসব কর্মকান্ড মেনে নেয়। ফলে তাদের বলয় থেকে মুক্ত হয়নি লঞ্চ ঘাট।
লঞ্চ মালিক সমিতির লঞ্চ মালিক ইমান উদ্দিন খান বলেন, ‘ঘাটের সব কিছুই মনির নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের কোন ক্ষমতা নেই। তাদের উপরই আমরা নির্ভরশীল। তারা যা বলে, আমরা তাই করি। তাদের নির্দেশ ছাড়া কিছু করার ক্ষমতা আমাদের নেই।’ আরেক লঞ্চ মালিক তোতা মিয়া জানান, ‘লঞ্চ মালিক নেতারা যা করে, আমরাও তাই করি। তাদের কথা বাহিরে কিছু হয় না।’
দায়িত্বশীল গোপন তথ্য মতে, লঞ্চ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনিরের পৈত্রিক ভিটা বরিশাল হলেও ১৯৮৬ সালে তৎকালিন বকুল হাওলাদার নামে এক লঞ্চ মালিক ও রাজনৈতিক নেতার মাধ্যমে ঘাটের দেখা-শোনার দায়িত্ব পান। পরে ৯০’এর দশকে ‘শিবচর’ নামে একটি লঞ্চের মালিক হয়। এরপর আর তাকে পিছু তাকাতে হয়নি। একে একে তেলের পাম্প, শহরে আলিসান বাড়ীসহ কয়েক কোটি টাকার সম্পদ করেছেন তিনি। কাওড়াকান্দি ঘাট থাকাবস্থায় বিএম আতাহার বেপারী আর মনিরুজ্জামান মনির মিলেই ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নেয়। বিএম আতাহার বেপারী কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমানে শিবচর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি একটি রাজনৈতিক দলের অন্যতম নীতি নির্ধারকও। ঘাটের লঞ্চ ছাড়া ও বন্ধ তাদের ইশিরায় চলে।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটরাও আইনগত কোন পদক্ষেপ নিলে সেখানেও প্রভাবশালীদের বাঁধা আসে। ২০১৮ সালে তৎকালিন শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইমরান একটি লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করলে এক লঞ্চ মালিকের সাথে বাক-বিতান্ডা হলে লঞ্চ বন্ধ করে দেয়। পরে সেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অপসারনের দাবিতে লঞ্চ বন্ধ করে ধর্মঘট করে লঞ্চ মালিক নেতারা। পরে বাধ্য হয়ে লঞ্চ ঘাটে কর্তৃত্ব ও আইনের প্রয়োগ করতে পারেনি সেই ইউএনও।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআইডব্লিউটিএ-এর কাঁঠালবাড়ী ঘাটে কর্মরত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যা করতে চাই, তা পারি না। কারণ ঘাটের লঞ্চ মালিকরা প্রভাবশালী। তাদের মতের বিরুদ্ধে গেলে লঞ্চ হুট-হাট লঞ্চ বন্ধ করে দেয়। তখন দুর্ভোগ আর ভোগান্তির কথা চিন্তা করে আর বাড়াই না। মূলত লঞ্চ মালিক সমিতির দুই-তিন জন প্রভাবশালী নেতাদের জন্যেই ঘাটের এই দুরাবস্থা। ঈদ শেষে ঢাকাফেরার পথে লঞ্চে যাত্রী বেশি দিতে বাধ্য হই। আমাদের আসলে কিছুই করার নেই।’
বরিশাল থেকে ঢাকাগামী এক যাত্রী বলেন, ‘লঞ্চ ঘাটে এলে ঘাটের লোকজন এতো দুর ব্যবহার করে, যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। যাত্রী কম নেয়ার কথা বললে চড়-ফাপ্পর পর্যন্ত দেয়। তাদের হাতে আমরা জিম্মি। প্রশাসনও কিছু বলে না।’
অভিযোগের ব্যাপারে ঘাটের সভাপতি ও শিবচর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিএম আহাতার বেপারী বলেন, ‘আমি কোন অভিযোগ দেখি না। ঘাট আমাদের এলাকার, জায়গা আমাদের তাই আমরাই লঞ্চ ঘাটের নেতৃত্ব দেই। কোন অন্যায় তো করি না। মানুষের উপকারে আসে সেই কাজই করি। ১৯৮৬ সাল থেকে আমি আর মনির মিলে ঘাট চালাই। ঘাটের ভালো-মন্দ আমাদের চেয়ে আর কে বেশি দেখতে পারে। আমাদের চেয়ে কেউ ভালো হলো তাকে তোমরা সাংবাদিকরা দায়িত্ব দাও।’
অভিযোগের বিষয় সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘আমি সাংবাদিকদের সাথে এসব বিষয় কথা বলতে চাই না। ঘাটে আসেন, সব কিছু বুঝিয়ে দিবো। প্রয়োজনে ভিডিও করে দিবো। এসব বিষয় কথা বলতে চাই না।’
এবিষয়ে মাদারীপুর জেলা প্রশাসক ড. মহিমা খাতুন বলেন, ‘আমরা কাউকে ছাড় দি‌বো না। নির্বাহী ম্যা‌জি‌স্ট্রেট ঘা‌টে থাকে।’

জিএম/নাজমুল