এই মাহথির সেই মাহথির

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৬:০৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৮, ২০১৮ | আপডেট: ৬:০৭:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৮, ২০১৮

রাশিদ রিয়াজ : মালয়েশিয়ার দুই কিংবদন্তি নেতা মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিম চিরশত্রু থেকে কি বন্ধুতে পরিণত হলেন? রাজনীতিতে চিরশত্রু বলে কিছু নেই, চিরবন্ধু বলেও কিছু নেই। কিন্তু মালয়েশিয়ার ভবিষ্যতের জন্যে এই দুই নেতার একে অপরকে গ্রহণের মধ্যে যে ত্যাগ ও স্বীকারোক্তির বহি:প্রকাশ ঘটেছে তা হয়ত পৃথিবীর রাজনীতির ইতিহাসে স্থান করে নেবে। ৯০ এর দশকে হাতে হাত রেখে রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন উভয়ে। রাজনীতির পথ খুবই সর্পিল ও ভঙ্গুর। অবিশ্বাস ও সন্দেহ এর পরতে পরতে। এক পর্যায়ে মাহথির মোহাম্মদ আনোয়ার ইব্রাহিমের শত্রু বনে যান। তার ব্যাপক জনপ্রিয়তায় প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে আনোয়ারের বিরুদ্ধে প্রধান ভূমিকা ছিল মাহাথিরেরই।

ইসলামপন্থী আনোয়ার থেকে দূরে থাকতে এবং নিজের পশ্চিমামুখী রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখতে নিজের ক্ষমতার প্রচ- অপব্যবহার করেন মাহাথির। সমকামিতার অভিযোগ এনে আনোয়ারকে জেলে দেওয়া হয়। সৎ ও অত্যন্ত ধার্মিক হিসেবে পরিচিত আনোয়ারের বিরুদ্ধে এধরনের হাস্যকর অভিযোগ আনার কারণে সমালোচিত হয় তৎকালীন সরকার। মাহাথির মোহাম্মদের সরকারে নির্যাতনে বহু বছর জেল খাটার পর মুক্তি পেয়ে আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন আনোয়ার ইব্রাহিম।
২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের দল। ওই নির্বাচনে অনেকটা চমক দেখিয়ে প্রধান বিরোধীদল হয় আনোয়ার ইব্রাহিমের রাজনৈতিক দল। ঘাবড়ে যান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। আবারো আনোয়ার ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে তোলা হয় সমকামিতার অভিযোগ! এবারও জেলে আটকে রেখে বিচার নাটক শুরু হয়। এখনো আনোয়ার জেল খাটছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাকে দেয়া দ-ের সমালোচনা করেছে বিচারপ্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকার কারণে।

কিন্তু নাজিব রাজাকের সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় এখন আন্দোলন চলছে। এমন অবস্থায় আগামী নির্বাচনে তাকে মোকাবেলার জন্য বিরোধীদলগুলো জোট গঠন করেছে। সেই জোটের প্রধান নেতা হচ্ছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। তাতে যোগ দিয়েছে মাহাথিরের দলও। সর্বশেষ ৯৬ বছর বয়সে মাহথির মোহাম্মদকে আগামী নির্বাচেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্যে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

রোববার আনোয়ারের নেতৃত্বাধীন জোট পাকাতান হারাপান নির্বাচনের জন্য তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে। এতে মাহাথিরকে প্রধানমন্ত্রী ও আনোয়ার ইব্রাহিমের স্ত্রী ওয়ান আজিজাহকে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদের জন্য মনোনয়ন দিয়েছে জোট।

মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে এমন ঘোষণা ছিল অপ্রত্যাশিত। কারণ, প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী মনোনয়নের মূল ক্ষমতা আনোয়ার ইব্রাহিমের হাতে। কার্যত মালয়েশিয়ার রাজনীতি আনোয়ারকে ঘিরে আবর্তিত হতে শুরু করেছে। তাকে বিনা অপরাধে তাকে জেল খাটানো মাহাথিরকে তিনি কিভাবে তার জোটের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে মেনে নিতে পারেন! কিন্তু আনোয়ার তা-ই করলেন। দেশ ও দলের স্বার্থে নিজের অতীত কষ্টের কথা ভুলে মাহাথিরকেই প্রার্থী হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

রোববার এই ঘোষণার পর আবেগাপ্লুত হয়ে যান উন্নয়নের জন্য মালয়েশিয়ার কিংবদন্তি এই নেতা। নাম ঘোষণার পর উপস্থিত দর্শকদের অভিবাদন গ্রহণের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এসময় পাশে থাকা তার স্ত্রী সিতি হাসমান কেঁদে ফেলেন। টেবিল থেকে টিস্যু নিয়ে চোখ মুছতে থাকেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে সিতির পাশে গিয়ে বসেন আনোয়ার ইব্রাহিমের স্ত্রী আজিজাহ। সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে তিনিও কেঁদে ফেলেন। হলরুমের অনেকের চোখ তখন ভিজে উঠেছে। এক পর্যায়ে নিজে ধরে রাখতে পারেননি মাহাথির মোহাম্মদও। টলমল চোখ নিয়ে চেয়ারে বসে পড়ে কান্না লুকানোর চেষ্টা করেন তিনি।

কিছুক্ষণ পরে বক্তব্য দেয়ার জন্য মঞ্চে ওঠেন মাহাথির। প্রথমে বলেন, ‘আমি আনোয়ারের কাছে ঋণী। তার অনুভূতি আমি অনুভব করতে পারছি। যখন আমার সরকারের সময়ে তাকে সুনগাই বুলো কারাগারে পাঠানো হয়েছিল তখন ওর কেমন লেগেছে আমি অনুভব করতে পারছি। গত ২০ বছরে তার পরিবার অনেক ভোগান্তির শিকার হয়েছে। আমি তাদের অনুভূতিটাও বুঝতে পারছি। আমাকে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত তার জন্য খুব সহজ ছিল না।’

মাহথির আরো বলেন, ‘আমরা এখন একের অন্যের সাথে হাত মিলিয়েছি। কিন্তু তার পক্ষে আমাকে মেনে নেয়া সহজ নয়। কারণ আমি তখন নেতৃত্বের অংশ ছিলাম। এ কারণে আজকের সিদ্ধান্ত নিতে আমরা অনেক সময় নিয়েছি। তবে শেষ পর্যন্ত আনোয়ার মালয়েশিয়ার জন্যে সংগ্রামকেই প্রাধান্য দিয়েছে। আমি তার কাছে ঋণী’। এ পর্যায়ে হলরুম কতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। এরপর জোটের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়, নির্বাচনে জিততে পারলে তাদের সরকারের প্রথম কাজ হবে আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্য সাধারণ ক্ষমার ব্যবস্থা করা। এবং এর মাধ্যমে আনোয়ার ইব্রাহিমের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ খুলে দেয়া। আমাদের সময়.কম