ছোটবেলায় আমি তিলের খাজা বিক্রি করতাম: এরদোগান

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০ | আপডেট: ১০:৫২:পূর্বাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

আপনার ছোটবেলার প্রিয় উপন্যাস বা কবিতাটির কথা শুনতে চাই। বলুন, কবে আপনি ওটা প্রথম পড়েছিলেন এবং কিভাবে তা আপনাকে প্রভাবিত করে।
এরদোগান : আমি নিশ্চিত, প্রতিটি শি’শুই সাহিত্যের সাথে পরিচিত হয় ঘুমপাড়ানি গান ও রূপকথার মাধ্যমে। আমা’র মা (আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুন) আমাদের বড় করে তুলেছেন অ্যানাতোলিয়া ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে সুন্দর ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়ে শুনিয়ে। আমা’র ম’রহু’ম পিতার কাছে শুনেছি অ্যানাতোলিয়ার অসংখ্য সুন্দর গল্প ও রূপকথা। মনে আছে, ছোটবেলায় আমি তিলের খাজা বিক্রি করতাম। বিক্রিশেষে যা আয় হতো তা নিয়ে ছুটে যেতাম বাইয়ের দোকানে।

দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমা’র প্রজন্মে বেড়ে ওঠার সময়টি ছিল অস্থির। নানা জটিল বিতর্ক ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় পরিপূর্ণ। ওই সময়টায় নানা রকম প্রতীক, স্লোগান ও বি’ক্ষোভের প্রবল প্রতাপে ভাবধারা (আইডিয়া) হারিয়ে যেতে বসেছিল। কবর রচিত হয়েছিল বুদ্ধিমত্তার। ভিন্নমত সহ্য করার প্রবণতা তরুণদের মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বই, সাময়িকী’, সংবাদপত্র, কবিতা, উপন্যাস, গল্প এবং লেখকেরাও মূল্যায়িত হতেন তার রচনাটি কী’ উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে এবং এর গূঢ়ার্থ দিয়ে। তরুণেরা বই পড়ত, তবে কিছু জানার জন্য নয়, বরং নিজের ভাবধারার পক্ষে যু’ক্তি খোঁজার জন্য।

ওই অন্ধকার যুগে তরুণদের দৃশ্যপটের বাইরেই রাখা হতো। এমন দিনে আমি এবং আম’রা বন্ধুরা নিজেদেরকে ওই গু’মোট পরিবেশের বাইরে রাখতে সচেষ্ট হলাম। সমবয়সী অন্যদের মতো আম’রা নিজেদের চোখ-কান বন্ধ রাখতে চাইলাম না, ক্ষুদ্র আদর্শিক বৃত্তে বন্দী থাকতে চাইলাম না এবং চাইলাম না এমন লোকদের মতো হতে, যারা নতুন যেকোনো ধারণাকেই হু’মকি মনে করে। আম’রা জানতাম, দৃঢ় ভিত্তি ও স্থির নীতি ছাড়া কোনো আ’ন্দোলনই সফল হতে পারে না। আমাদের খুব জানা ছিল, ব্যাপক পড়াশোনা থাকলেই কেবল ভাববিনিময় ও বিতর্ক ফলপ্রসূ হতে পারে। তাই আম’রা পড়াশোনার ক’ষ্ট’কর পথটি বেছে বিলাম; ব্যাপক পড়াশোনা। আমাদের সর্বোচ্চ সাধ্যমতো আম’রা সেসব লেখকের বই পড়তে থাকলাম, তুর্কি ও বিশ্বসাহিত্যকে যারা পথনির্দেশ দিয়েছেন।

এখানে আমি আরো একটা কথা জানিয়ে রাখতে চাই, তা হলো : আমাদের সময়টি ছিল এমন একটি সময়, যখন কোনো বই হাতে পাওয়াটা ছিল খুবই কঠিন। এখনকার মতো তখন এত বই, এত পাঠাগার ছিল না। এখন যেমন অনেক পরিবার বই কেনার জন্য কিছু টাকা বরাদ্দ (বাজেট) রাখে, তখন এটা ছিল না। এখন যেমন কাউকে বাসে, পার্কে বা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বসে স্বাধীনভাবে বই পড়তে দেখা যায়, এমনটা তখন ভাবাই যেত না। এমন অবস্থায়ও যখন আম’রা কোনো বই হাতে পেতাম, সে বই এহাত-ওহাত ঘুরে কয়েক ডজন তরুণের পড়া হয়ে যেত। তখন ইন্টারনেট ছিল না, ফটোকপি মেশিনও নয়, তা সত্ত্বেও যেকোনো মহৎ সাহিত্যকর্ম কিংবা সুন্দর একটি কবিতা হাত থেকে হাতে একেবারে অ্যানাতোলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যেত। এই প্রজন্মের ছে’লেমে’য়ের কাছে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হতে পারে। কারণ তাদের হাতের নাগালে স্কুল, টেবিল ভরতি বই। কিন্তু আমাদের তো এসব ছিল না। আম’রা এমন একটি প্রজন্ম, যাদের কাছে বই ছিল দুষ্প্রাপ্য ও দুর্মূল্য। কাজেই আমাদের জন্য এটাই স্বাভাবিক যে, আমাদের সন্তানদের হাতে যত সহ’জে সম্ভব বই তুলে দেয়ার জন্য আম’রা সব রকম চেষ্টা করে যাবো।

ছোটবেলায় আমি যেসব গল্প ও কবিতা পড়েছি, তার থেকে একটিকে ‘প্রিয়’ হিসেবে বাছাই করতে বললে আমি কিন্তু পারব না। তারপরও বরেণ্য চিন্তাবিদ নেসিপ ফাজিল কিসাকুরেক এবং তার ‘সাকারিয়া’ কবিতাকে আমি শীর্ষে রাখব। এই মানুষটি এবং তার রচনা আমাদেরকে ইতিহাস ও বর্তমান সম্বন্ধে সচেতনতার বোধ দিয়েছে।

আমাদের জাতীয় সঙ্গীত যেমন এই জাতির পরিচয় জ্ঞাপকরূপে কাজ করে এবং যে ভিত্তির ওপর তা নির্মিত, ‘সাফাহাত’ বইটিও তেমন। এতে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের চেতনাই অনুরণিত হয়। যারা বইটি প্রথম পড়বেন, তাদের কাছে এর শব্দ ও স্তবকগুলো বুঝতে পারা কঠিন হতে পারে। কিন্তু আমা’র বিশ্বা’স, তরুণ বয়সে এরকম একটি সাহিত্যকর্মের সাথে পরিচিত হলে, এর পৃষ্ঠায় নিমজ্জিত হলে তা আমাদের তরুণদের শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবে। যে সমাজের শব্দভাণ্ডার যত ব্যাপক, সেই সমাজের সৃজনশীলতাও তত বেশি।
সবচেয়ে বড় কথা, আমি বিশ্বা’স করি, ‘সাফাহাত’ বইয়ের শব্দ ও স্তবকগুলো ইতিহাসের সাথে আমাদের বন্ধনকে দৃঢ় করবে এবং ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে আমাদের কর্মপ্রচেষ্টায় আরো ত্যাগের মনোভাব জাগ্রত করবে।

আমাদের দেশে (কিংবা বিশ্বে) পরিবর্তন এনেছে, এমন কোনো বইয়ের নাম বলতে বললে আপনি কোনো বই বা লেখকের নাম বলবেন এবং কেন?
এরদোগান : আমা’র মনে হয় আপনি নিজেও বোঝেন যে, একটি বা দু’টি নাম বলে এলে এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া প্রায় অসম্ভব। নিঃস’ন্দেহে পবিত্র কুরআন থেকে শুরু করে সব ধ’র্মগ্রন্থের চিরায়ত গুরুত্ব রয়েছে। এর বাইরে প্রত্যেক জাতির নিজস্ব অ’তিগুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান সাহিত্যকর্ম রয়েছে। এ প্রসঙ্গে মা’ওলানা রুমী ও ইউনূস এম’রের কথা বলব। তারা আমাদের এখানে, অ্যানাতোলিয়ায় বসে লিখেছেন। কিন্তু তাদের সৃষ্টি সব সীমান্ত অ’তিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। ভেঙেছে সময়ের বেড়া। তারা আপন লোকালয়ে আবদ্ধ থাকেননি, বরং আলি’ঙ্গন করেছেন সমগ্র বিশ্বকে। ভাবতে অ’বাক লাগে, তাদের রচনা, তাদের কবিতা রচিত হয়েছে কয়েক শ’ বছর আগে। অথচ তা এখনো মানবতার পথপ্রদর্শক।

আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ইতিহাস নিয়ে আমা’র সত্যিই গর্ব হয়। অবশ্য গর্বভরে উল্লেখ করার মতো আরো অনেক মহৎ সাহিত্যিক আমাদের দেশে আছেন। ইউসুফ হাস হাচিপ, আহমেত ইয়েসেবি, ফুজুলি, নেদিম, হাবি বেকতাস, কেমাল তাহির, ইয়াহিয়া কেমা’র, কেমিল মেরিক, ও গুজ আতাই, নুরেত্তিন তপকু, ওরহান পামুক এবং এ রকম আরো অনেকে মহৎ সাহিত্য রচনা করেছেন। প্রতিটি লেখক, তাদের সাহিত্যকর্ম, এমনকি প্রতিটি স্তবক বা বাক্য, তা ছোট হোক বা বড়, মানুষকে প্রভাবিত করে। বলা হয়ে থাকে, ‘মুখের কথা উড়ে যায়, লেখা কথা থেকে যায়। লিখিত সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে পাঠকের ব্যক্তিগত জীবনের একটি দিকের সাথে স’ম্পর্কিত হয়ে যায়। এবং তা-ই এনে দেয় পরিবর্তন।

এ ক্ষেত্রে আমি আরো দু-একটি নাম বলতে চাই, যাদের প্রশংসা এর আগেও অন্যত্র করেছি। তারা হলেন ফা’লিহ রিফাকি আতাই ও ফারহেত্তিন পাসা। মেদিনে প্রতিরক্ষা নিয়ে তাদের রচনা, আমি মনে করি, পড়া শুধু রাজনীতিকেরই পড়া উচিত তা নয়, বরং সব বয়সের মানুষেরই পড়া কর্তব্য। এগুলো পড়া এবং পড়ানো এ জন্যই প্রয়োজন যে, তাহলে আম’রা উপলব্ধি করতে পারব যে, আম’রা বর্তমান অবস্থায় কিভাবে এলাম।

আপনি কি এমন কোনো সাহিত্যকর্মের কথা জানেন, যা মানবজাতির কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণ করেছে বেশি?
এরদোগান : আপনি তো জানেন, সাহিত্যের তুর্কি শব্দ হচ্ছে ‘এদেবিয়াত’, যা এসেছে ‘এদেব’ থেকে। এর অর্থ সমাজের শৃঙ্খলা ও পদ্ধতি অনুধাবন এবং সে অনুযায়ী কাজ করা (সদাচার)। আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে দেখা যায়, সাহিত্য ও আদবকেতা প্রায়ই হাত ধ’রাধরি করে অথবা সমান্তরালে পথ চলেছে। আমি বিশ্বা’স করতে পারি না, যা জন্মগতভাবে বিনম্র, তা থেকে ক্ষতিকর কিছু আসতে পারে। ‘এদের’ বা শৃঙ্খলা হচ্ছে আঠার মতো, যা বইয়ের পৃষ্ঠাগুলোকে একসাথে আ’ট’কে রাখে। এই বাঁধনটা টুটে গেলে বইটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। যতক্ষণ তা না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সব বইই উপকারী।

বইয়ের ওপর সেন্সরশিপের ব্যাপারে আপনার কি মত?
এরদোগান : সেন্সরশিপ একটা অগ্রহণযোগ্য পন্থা; শুধু সাহিত্যের বেলায় নয়, শিল্পের সব শাখায়, গণমাধ্যমে, রাজনীতিতে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও। বাকস্বাধীনতা আমাদের অধিকার। যতক্ষণ না এই অধিকার অন্যের অধিকার খর্ব করছে, তকক্ষণ এই স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করতে আম’রা কৃতসংকল্প। একটু আগেই আমি বলছিলাম আমাদের যৌবনকালে কত রকম বিঘœ আমাদের মোকাবেলা করতে হয়েছে। নানারকম নিষেধাজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতা আমাদের দেশকে, আমাদের তরুণবেলাকে, আমাদের চিন্তাধারাকে, আমাদের সাহিত্যকে এবং আমাদের মিডিয়াকে পঙ্গু করে রেখেছিল।

শুধু আমাদের যৌবনেই নয়, আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসেও এসব চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। আমি একজন রাজনীতিক। একটি কবিতা পড়ার ‘অ’প’রাধে’ আমাকে জে’ল খাটতে হয়েছে। অথচ কবিতাটি সরকারি স্কুলের বইতে পাঠ্য ছিল। এখন আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে প্রেসিডেন্ট। বাকস্বাধীনতার অর্থ ও প্রয়োজন আমি খুব ভালো’ভাবে বুঝি। কবি এ টি আয়হানের পঙক্তি আমি বহুবার বহু স্থানে বলেছি : ‘আম’রা হয়েছি বড় নিষেধের বেড়াজাল ভেঙে-ভেঙে।’ এ কারণেই আম’রা আমাদের তরুণদের এবং নতুন প্রজন্মের ওপর বিধিনিষেধ ও সেন্সরশিপের বেড়াজাল আরোপ করতে চাই না। আম’রা সহিষ্ণু হতে চাই।

আপনার সর্বশেষ পঠিত ও ভালো লাগা বই কোনটি?
এরদোগান : কাজের বিপুল বোঝা মা’থার ওপর, তার মধ্যেও আমা’র সর্বাত্মক চেষ্টা থাকে যেন আমি বইয়ের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন না হই। কাজের চাপে সবকিছু পড়া যদিও সম্ভব না হয়, তবুও আমি নতুন লেখালেখি সম্বন্ধে ধারণা পেতে এবং সেগুলো পড়তে সব রকম চেষ্টা চালাই।

আপনি কি লিখেন? না-লিখেন যদি, তবে কি আশা পোষণ করেন যে, একটি বই বা কবিতা অন্তত লিখবেন!
এরদোগান : আপনি তো জানেনই, ডায়রিতে আপন অ’ভিজ্ঞতা লিখে রাখাকেও এক ধরনের সাহিত্যিক স্বীকৃতি দেয়া হয়। এই অর্থে বলতে পারি, হ্যাঁ, আমি লিখি। যখনই একটুখানি সময় পাই, ডায়রিতে আমি নোট নিই এবং কোনো ঘটনা লিখে রাখি। হয়তো ভবিষ্যতে এটাকে স্মৃ’তিকথায় রূপ দেবো।