ঝালকাঠিতে করোনায় নিয়োজিত এ্যাম্বুলেন্স চালকের চাকরীতে যোগদানের পর থেকেই তিক্ত অভিজ্ঞতা

প্রকাশিত: ৪:০৫ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০ | আপডেট: ৪:০৫:অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

করোনা রোগী সনাক্ত হলে ওই এলাকায় সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে আক্রান্ত ব্যক্তিসহ পরিবার ও আশপাশের এলাকাকে অবরুদ্ধ করে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। স্ত্রী, সন্তান, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজন কেউ যখন কাছে আসে না তখন মরণব্যধি করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তিদের উন্নত ও সুচিকিৎসার জন্য জীবন মরণ সন্ধিক্ষণে দায়িত্ব পালন করেন এ্যাম্বুলেন্স চালক।
এ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে চাকুরীর প্রথম পোস্টিং ঝালকাঠিতে। চলতি বছরের ১৫ফেব্রæয়ারী ঝালকাঠি সিভিল সার্জন কার্যালয়ে যোগ দেন। সেখান থেকে তাকে পোস্টিং দেয়া হয় ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে। ২৮ মার্চ ঝালকাঠির তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. শ্যামল কৃষ্ণ হাওলাদার স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে করোনা সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ আসে। সরকারী নির্দেশনা আসায় করোনার দায়িত্ব পালনে ভয় পেলেও মানবিকতার দায়িত্ববোধ থেকে নির্দেশের বিষয়ে কোন আপত্তি করেননি তিনি। এ কঠিন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চাকুরী জীবনের শুরুতেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানালেন ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের এ্যাম্বুলেন্স চালক মোঃ আনোয়ার হোসেন। তিনি মাগুরা সদর উপজেলার মহিষাডাঙ্গা গ্রামের মোঃ শাহাবুদ্দিন বিশ্বাসের পুত্র। মাগুরার একটি কামিল মাদ্রাসা থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তিনি।
এ্যাম্বুলেন্স চালক মোঃ আনোয়ার হোসেন জানান, ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে পোস্টিং দেয়ার পর থেকে নেই কোন আবাসন সুবিধা। খাবারেরও কোন ব্যবস্থা করা হয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। করোনা রোগীদের নিয়ে এ্যাম্বুলেন্সে চলাচলের কারণে বাহিরের কোন ম্যাসেও ভাড়া থাকতে পারছেন না। আরেক সহকর্মীর (এ্যাম্বুলেন্স চালক মহসিন) বাসায় থাকছেন। খাবারের ব্যবস্থা হিসেবে বাহিরের হোটেলে সুযোগ বুঝে খেয়ে নেন।
নারায়নগঞ্জ থেকে আসা পুলিশের এসআই আমিনুল ইসলামের করোনা সংক্রমণের নমুনা নিয়ে ২ এপ্রিল ঢাকা মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যাওয়া হয়। ইতিমধ্যে বরিশাল শেরই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাধ্যমে বরিশাল বিভাগের করোনা সংক্রমণের নমুনা মহাখালীতে প্রেরণের সুযোগ চালু হয়। এরপর থেকে ঝালকাঠি হতে করোনা সংক্রমনের নমুনা নিয়ে বরিশাল শেরই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দিয়ে আসতে শুরু করেন। ২ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ ৫ জন করোনা পজিটিভ ব্যক্তিকে ঝালকাঠি থেকে বরিশাল শেরই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌছে দেন তিনি। করোনা পজিটিভ থাকা মুক্তিযোদ্ধা মোয়াজ্জেম হোসেন পাটোয়ারীকে ২৩ জুন বরিশালে নিলে সেখানেই তিনি মৃত্যু বরণ করেন। ২২ জুন শহরের পশ্চিম চাঁদকাঠি এলাকার সাবেক কাউন্সিলর মোফাজ্জেল হোসেনের করোনা পজিটিভ থাকা অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে এ্যাম্বুলেন্সে করে বরিশাল শেরই বাংলা হাসপাতালে পৌছে দিলেও তিনিও সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ২জন মুক্তিযোদ্ধাসহ ্্্্এখন পর্যন্ত করোনা পজিটিভ চিহ্নিত ৫জনকে বরিশালে এ্যাম্বলেন্সে করে নেয়া হয়েছে। এছাড়াও প্রতিদিন ২ থেকে ৩বারও করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা নিয়ে বরিশালে যেতে হয়।
দুঃখ প্রকাশ করে এ্যাম্বুলেন্স চালক আনোয়ার জানান, করোনা রোগীদের নিয়ে এ্যাম্বলেন্স চালক হিসেবে জনসাধারনও ক্রমান্বয়ে আমাকে চিনতে থাকে। সামাজিক বিচরণের ক্ষেত্রেও ধীরে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আত্মীয় এবং সহকর্মীরাও আমাকে অনেকটা এড়িয়ে চলে। মঙ্গলবার রাতে হোটেলে ঢুকে খাবার খেয়ে বের হবার সময় হোটেল কর্তৃপক্ষ আমাকে আর হোটেলে না যাবার জন্য বলে দিয়েছে। খাবারের বেশি প্রয়োজন হলে হোটেলের বাহিরে দাড়িয়ে অর্ডার দিলে তারা পারসেল দেয়ার কথা বলেছে। তখন নিজেকে খুব অসহায় লাগছে।
অভিজ্ঞতার বিষয়ে আনোয়ার জানান, নতুন চাকরী, প্রতিটি দিনই তাকে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তবে মিষ্টি অভিজ্ঞতা একটিও নেই বলে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, চাকুরীর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তার পুরোটাই তিক্ত অভিজ্ঞতা। তবে এতো ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ একদিন তাকে পুরস্কৃত করবেন সেই আশায় বুক বাধেন তিনি।
সদর হাসপাতালের আরেক এ্যাম্বুলেন্স চালক মহসিনসহ অন্যান্য এ্যাম্বুলেন্স চালকরা জানান, আমরা অনেক ধরনের রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শেরই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে থাকি। কার মধ্যে কোন ভাইরাস আছে তা জানি না। দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার কারণে অপারগতাও প্রকাশ করতে পারছি না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমাদের তেমন কোন নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি দেয় না। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যা দেয় তা আবার স্টোর কিপার কমিয়ে দেয়। জীবনের ঝুকি নিয়ে প্রতিটা মুহুর্তে দায়িত্ব পালন করতে হয়।