উইমেন  ডেলিভার ইয়াং লিডার বাংলাদেশের সোহান

প্রকাশিত: ৫:৩০ পূর্বাহ্ণ, জুন ১১, ২০২০ | আপডেট: ৫:৩৫:পূর্বাহ্ণ, জুন ১১, ২০২০
কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত আইসিপিডি২৫ সম্মেলনে উইমেন ডেলিভারের প্রধান নির্বাহী কাতজা ইভারসেনের সাথে সোহানুর রহমান

পিছিয়ে রাখা নারী ও মেয়েদের জীবনে টেকসই পরিবর্তন আনতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক সংগঠন উইমেন ডেলিভারের গ্লোবাল ইয়াং লিডার নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশের যুব সংগঠক সোহানুর রহমান।

সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতামূলক একটি বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্বের ১৬৭টি দেশের ৫ হাজার ৬শ আবেদন মূল্যায়ন করে যে ৩শ জন তরুণকে এই সম্মানজনক কর্মসূচিতে নির্বাচন করা হয়েছে সোহান তাদের মধ্যে একজন। বুধবার (১০ জুন) বাংলাদেশ সময় সন্ধায় ৭টায় নিউইর্য়ক থেকে অফিসিয়াল এক ঘোষণার মাধ্যমে দুই বছরের জন্য এই তালিকা প্রকাশ করা হয়।

উইমেন ডেলিভারের তরফে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই তরুণের দল মাতৃত্ব ও শিশু স্বাস্থ্য, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, এইচ আইভি এইডস, যৌন বৈচিত্র্যময় গোষ্ঠী, শান্তি ও নিরাপত্তা, পানি ও পয়নি:স্কাশন, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, শিক্ষা, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও যুব অংশগ্রহণসহ নানা বিষয়ে তাদের নিবেদিত কাজের মাধ্যমে অগ্রগতি আনতে সক্ষম হয়েছেন। পুরাতন বৈষম্য ও নতুন সৃষ্ট বৈশি^ক সংকট সমাধানে তরুণরা যে প্রশংসনীয় অবদান রাখছে তার সাক্ষী হিসেবে এটা একদম পরিষ্কার যে, সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে হলে তরুণদের নেতৃত্ব একান্ত জরুরী। এই ইয়াং লিডার কর্মসূচি এই সংকটকালীন মুর্হূতে এবং এর পরে তরুণদের সাথে অংশিদারিত্ব বির্ণিমান করে তাদের বিকশিত নেতৃত্ব, বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর এবং জ্ঞান ও রসদ বিনিময়ের মাধ্যমে উইমেন ডেলিভার ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে।

সোহানুর রহমান বাংলাদেশ মডেল ইয়ুথ পার্লামেন্টের নির্বাহী প্রধান হিসেবে যুবদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা নিয়ে কাজ করছেন। জন্ম ঝালকাঠি জেলার নথুল্লাবাদ গ্রামে হলেও বেড়ে উঠেছেন বরিশাল শহরে। পড়েছেন ইঞ্জিনিয়ারিং।  ছিলেন বাংলাদেশ শিশু সংসদের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীও। জয়বাংলা এওয়ার্ড বিজয়ী সংগঠন ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়ক। সুইডিস কিশোরী ও পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের আন্দোলন ফ্রাইডেস ফর ফিউচার বাংলাদেশ শাখার প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও তিনি। আর এ আন্দোলনের ফলেই গতবছর ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদে প্লানেটারি ইমার্জেন্সি বিল পাশ হয়। সোহানুর ইয়ুথ এডভোকেট হিসেবে কাজ করছেন ব্রিটিশ কাউন্সিলের একটিভ সিটিজেনস, গার্লস নট ব্রাইডস, মেনএনগেজ এলাইয়েন্স, গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অন ডিজিস্টার রিডাকশনসহ জাতিসংঘের বেশ কিছু মেজর গ্রুপে। ক্লাইমেট একশন নেটওয়ার্ক সাউথ এশিয়ার বাংলাদেশ শাখার জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য সোহানুর ২০১৭ সালে গ্লোবাল ওয়াটার পার্টনারশিপ আন্তর্জাতিক জোট থেকে ইয়ুথ ফর ওয়াটার এন্ড ক্লাইমেট পুরুষ্কার অর্জন করেন।  এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক বাল্যবিবাহ বিরোধী বৈশ্বিক সভায় অংশ নিতে ২০১৫ সালে মরোক্কো, ২০১৮ সালে কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সভার যুব ফোরামে যোগ দিতে লন্ডন, ২০১৯ সালে ইথিওপিয়া, নেপাল, ভারতের কলকাতায় আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও সুন্দরবন বিষয়ক সম্মেলন এবং কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে আইসিপিডি২৫ সম্মেলনে অংশ নেন।

আপনার কাজ তো জলবায়ু নিয়ে। কতটা সহায়তা করবে এই সম্মাননা? এমন এক প্রশ্নের জবাবে সোহানুর রহমান বলেন, জলবায়ু সুবিচারের জন্য আমাদের লড়াই চললেও দীর্ঘদিন আমি কাজ করেছি শিশু অধিকার ও জেন্ডার ইস্যু বিশেষ করে বাল্যবিবাহ বন্ধে। তরূনদের অর্থপুর্ন অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সামাজিক আচার বন্ধে সচেতনার কাজ করেছি, নীতি ও আইন প্রণয়নে দেনদরবার করেছি। এখন কাজ করছি বালক ও তরুণদের কিভাবে যুক্ত করা যায়, অধিকারভিত্তিক প্রজনন স্বাস্থ্য কিভাবে নিশ্চিত করা যায় এনিয়ে। সবকিছুর মূলে ছিল তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা আর পিছিয়ে রাখা নারী ও মেয়ে শিশুদের ক্ষমতায়ন। আমাদের দেশে নারীরা এমনিতেই অনেক ধরনের বঞ্চনা ও শোষণের শিকার হন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সে ক্ষেত্রে তাঁদের সামনে বাড়তি সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়। তারপরও এর প্রভাব শিশুদেরও ভোগ করতে হয়। তারা তাদের শৈশব হারায়। অল্প বয়সে বিয়ের পিড়িতে বসতে হয় কিংবা নাম লেখাতে হয় শিশু শ্রমিকের খাতায়।  অনেক সময় মা–বাবাকেও হারাতে হয় তাদের। এতসব সমস্যার মধ্যে রয়েছে ঘুর্ণিঝড়ের তাণ্ডব আর এখন যুক্ত হয়েছে করোনা মহামারী। সব সংকটেই অরক্ষিত থাকে নারী ও মেয়ে শিশুরা। আমরা বিশ্বাস করি জেন্ডার ন্যয্যতা ছাড়া কখনোই জলবায়ু সুবিচার আদায় করা যাবেনা। তাই এই ইয়ং লিডার প্রোগ্রামের মাধ্যামে যেমনি আমাদের নারী ও মেয়ে শিশু যারা জলবায়ু সংকটের কারনে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তাদের কথা বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা সহজ হবে। অন্যদিকে জ্ঞান সঞ্চয়, ছোট আকারের সীডফান্ডিংয়ের সুযোগ পাওয়া গেলে উপকূলীয় এলাকার কাজ করার সুযোগ হবে।

উইমেন ডেলিভারের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাতজা ইভারসেন বলেন, ‘ কোভিড১৯ মহামারী বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে আমরা যদি সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, কল্যাণ ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করতে চাই তাহলে জরুরী সাড়াদান, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এবং দীর্ঘমেয়াদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে চাইলে সকল কর্মসূচিতে মেয়েদের, নারীদের এবং তরুণদের  সামনের কাতারে ও কেন্দ্রভাগে  স্থান দিতে হবে।’

মানুষ যখন কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলায় সম্মুখ সমরে এবং  বিশ্বজুড়ে চলমান বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের এই ঐতিহাসিক সময়ে ৩০০ জন তরুণ চেঞ্জমেকারের নাম ঘোষণা করছে উইমেন ডেলিভার  যারা জেন্ডার সমতা এবং যৌন, প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার আদায়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এই কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচিত তরুণ নেতারা স্কলারশিপসহ ডিজিটাল ইউনির্ভাসিটিতে পড়াশোনার সুযোগ, প্রশিক্ষণ এবং সম্পদ সংগ্রহের মাধ্যমে জেন্ডার সমতা অর্জন ও মেয়ে, নারী ও তরুণদের জীবনে স্বাস্থ্য ও অধিকার সংক্রান্ত কার্যক্রম ও কর্মসূচি গ্রহণে নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে পারবে। ২০২২ সালে উইমেন ডেলিভার শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহনের স্পন্সসরশিপ দেয়া সহ দক্ষতা উন্নয়ন, বৈশ্বিক ফোরামে এবং মিডিয়ায় কথা বলার সুযোগ করে দেয়া, ছোট ছোট উদ্যোগ ও প্রকল্পে অর্থ সহায়তা প্রদান করে তাদের কমিউনিটির উন্নয়ন করা এবং বিশ্বজুড়ে একটা নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসবে বলে জানানো হয়। ২০১০ সালে শুরু হওয়া এই পুরষ্কারভিত্তিক কর্মসূচিতে বিশ্বের ৭শ জন তরুণ ইতিপূর্বে সম্পৃক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।