বাবার লাশ ঘরে রেখে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ রাজাপুরের নিলুফা

প্রকাশিত: ৩:০৯ অপরাহ্ণ, জুন ২, ২০২০ | আপডেট: ৩:০৯:অপরাহ্ণ, জুন ২, ২০২০

গত ৩ ফেব্র“য়ারী ২০২০ এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। তার ৮ মাস পূর্বে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে মা মারা যান। এরপর এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন ১৭ ফেব্র“য়ারী দুপুর আড়াইটায় মারা যান বাবা মোফাজ্জেল হোসেন । ১৮ ফেব্র“য়ারী সকাল সাড়ে ১০টায় ছিলো তার জানাজা। কিন্তু ওইদিনই মৃত. মোফাজ্জেল হোসেন’র কন্যা নিলুফা ইয়াসমিনের ছিলো ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা। বাবার লাশ ঘরে রেখে সকাল সোয়া ৯টার দিকে কেঁদে কেঁদে ঘর থেকে বের হয়ে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন নিলুফা। বাবা হারানোর বেদনা ও শোকে পরীক্ষার হলে চোখের পানিতে ভিজে যায় নিলুফা ইয়াসমিনের খাতা। তারপরেও অদম্য মেধার কারণে ৩১ মে ঘোষিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে জিপিএ ৩.৭৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। প্রকাশিত রেজাল্ট পেয়ে নিলুফা পরীক্ষার ফলাফলে খুশীর সাথে পিতা-মাতা হারানোর বেদনায় চোখের যেন বাধ ভেঙে যায়। কেঁদে কেঁদে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দেন নিলুফা। রাজাপুর উপজেলার শুক্তাগড় মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে সাধারন বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন নিলুফা ইয়াসমিন।
নিলুফা জানান, দরিদ্র পরিবারে জন্ম হওয়াতে কোন প্রাইভেট পড়তে পারিনি। কোন নোট-গাইড কিনেও পড়তে না পারায় ঘরে বসে নিজে যা পারছি তাই পড়াশুনা করেছি। এসএসসি পরীক্ষার পূর্বে টেস্ট পরীক্ষার আগে মা মারা যান। পরীক্ষা চলাকালীন বাবাকে হারাতে হয়। বড় ভাইয়ের উপার্জনে এখন চলছে আমাদের ৬ জন সদস্যের সংসার। এইচএসসি পড়তে অর্থাভাবে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন বলেও জানান নিলুফা।
নিলুফার বড় ভাই দিনমজুর সোলায়মান জানান,‘অনেক কষ্টে ছোট বোন পড়াশুনা করেছে। তাকে ভালোভাবে নির্দেশনা বা প্রাইভেট শিক্ষক দিয়ে পড়াতে পারিনি। গত বছরের (২০১৯ সালের) জুলাই মাসে অসুস্থতাবস্থায় মা মারা যান। ঘরে পিতা অসুস্থ্য ছিলেন । সংসারের রান্না এবং অসুস্থ পিতার সেবা করেই নিজের পড়াশুনা চালাতো নিলুফা। পরীক্ষার মধ্যে বাবা মারা যান। বাবার লাশ ঘরে রেখে কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে পরীক্ষা দেয়। তারপরেও সে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে উত্তীর্ণ হয়েছে।’
সোলায়মান আরো জানান, নিলুফা পরের ক্লাসেও (এইচএসসি) পড়তে চাচ্ছে। তাকে পড়ানোর ইচ্ছা আমারও (সোলায়মানের) আছে। কিন্তু ভর্তি, বই কেনা, ড্রেস বানানো নিয়ে অনেক টাকার প্রয়োজন হবে। আমি গরীব মানুষ। দিন আনি দিন খাই। এ অবস্থায় এতো টাকা কোথায় পাবো। তারপরেও যত কস্টই হোক না কেন, ছোট বোনের ইচ্ছা পূরণ করে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে সার্বিক চেষ্টা চালিয়ে যাবো।
অপরদিকে একই গ্রামের বাসিন্দা এসএসসি পরীক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তারের দাদু মৌলভী মোঃ আনোয়ার হোসেন ১৭ ফেব্র“য়ারী মারা যান। ১৮ ফেব্র“য়ারী ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার পরীক্ষায় দাদুর লাশ ঘরে রেখেই পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন। পরবর্তি ৩টি পরীক্ষাই পূর্বের পড়ার পুনরাবৃত্তি করতে না পেরেও পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয় সুমাইয়াকে। এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে জিপিএ ৩.৬৭ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। কাউখালী সরকারী বালিকা বিদ্যালয় থেকে সাধারন বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন সুমাইয়া।
সুমাইয়ার পিতা মাওলানা ওমর ফারুক জানান,‘আমার বাবা মৌলভী আনোয়ার হোসেন ব্রেইন স্ট্রোক জনিত কারণে ১৬ ফেব্র“য়ারী সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার ঢাকায় প্রেরণ করে। ঢাকার আগারগাঁওয়ে নিউরো সায়েন্স হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শেষে ধানমন্ডি বাংলাদেশ মেডিকেলের আইসিইউতে ১৭ ফেব্র“য়ারী দুপুর আড়াইটায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃতদেহ রাজাপুরের নারিকেল বাড়িয়ায় নেয়া হয় রাত ১১টায়। ১৮ ফেব্র“য়ারী সকাল ১০টায় নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।
১৮ ফেব্র“য়ারী সুমাইয়ার ছিলো ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার পরীক্ষা। দাদুর লাশ ঘরে রেখে কাঁদতে কাঁদতে পরীক্ষায় অংশ নেয় সুমাইয়া। জিপিএ ৩.৬৭ পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে ভালো মানুষ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মাওলানা ওমর ফারুক।