দিনাজপুরের প্রথম করোনা জয়ী ডাক্তার তানভীর তালুকদার আইশোলেনের কিছু কথা

এন.আই.মিলন এন.আই.মিলন

দিনাজপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৭:৪৭ অপরাহ্ণ, মে ২৮, ২০২০ | আপডেট: ৭:৪৯:অপরাহ্ণ, মে ২৮, ২০২০

এন.আই.মিলন, দিনাজপুর প্রতিনিধি- দিনাজপুর জেলার প্রথম করোনা আক্রান্ত যুদ্ধাহত ১ যোদ্ধা বীরগঞ্জের ডাক্তার তানভীর তালুকদার আইশোলেশন থেকে বের হয়ে জনসাধারনের প্রতি করোনা সংক্রান্ত কিছু কথা জানালেন।

বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্স এর ডাক্তার ও পাল্টাপুর উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসক ডাঃ মোঃ আব্দুল্লাহ আল তানভীর তালুকদার করোনা রুগীদের সেবা করতে করতে তিনি নিজেই দিনাজপুর জেলার প্রথম করোনা আক্রান্ত ডাক্তার। দীঘদিন আইশোলেশন থেকে বের হলে বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. মোঃ আনোয়ার উল্যাহ, ডাঃ সমরেশ সহ সহকর্মিরা তাকে মিষ্টি দিয়ে অভিনন্দন জানায়।

আইশোলেশন থেকে বের হয়ে বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ইউ.এইচ.এফ.পি.ও ডা. মোঃ আনোয়ার উল্যাহ সহ যারা শিক্ষা দিয়েছেন, সহকর্মি ও যারা তার নিয়োমিতো খোজখবর রেখেছেন তাদেরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে করোনা সংক্রান্ত কিছু তথ্য ও আবেদন জনসাধারনের প্রতি জানায়।

গত ০৯ মে তার নিজের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলে পরের দিন ১০মে তার রেজাল্ট পজিটিভ আসে। পরবর্তীতে তিনি যাদের সংস্পর্শে এসেছিলেন স্ত্রী, কন্যা, মা, বাবা, ভাই, বোন, চাচা, চাচী তাদের সবার নমুনা পরীক্ষা করানোর ফলে সকলের রেজাল্ট নেগেটিভ আসে। এছাড়াও উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সের কর্মরত করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ টিমের সঙ্গী হিসাবে যারা কাজ করেছে তাদের সকলের নমুনা পরীক্ষা করানোর ফলে রেজাল্ট নেগেটিভ আসে।

আইসোলেশনে চার দেয়ালে থাকা অবস্থায় স্বাস্থ্য প্রশাসক টিএইচএ ডাঃ আনোয়ার উল্যাহ স্যারের কেয়ারিং মনোভাব এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আমার মনোবল অনেকগুন বৃদ্ধি করেছে। তাই বলতে দ্বিধা নাই যে আমার স্বাস্থ্য প্রশাসক জনাব ডাক্তার মো আনোয়ার উল্যাহ স্যার আমার কাছে আমার পিতার ভিন্ন রূপ। তাছাড়া দিনাজপুর সিভিল সার্জন অফিস ও বীরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন আমার সবসময় খোজখবর নিচ্ছেন। আর আমার মেডিকেলের কলিগগণ আমার পাশে ছায়ার মতন ছিলেন এবং আছেন।

তিনি বলেন, আমি চিকিৎসক, আমি গর্বিত এই জন্যে যে, আমি করোনার সম্মুখ ১জন যোদ্ধা। আমি আমার সম্মানিত উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সের পরিচালক ইউ.এইচ.এফ.পি.ও মহোদয় ডা. মোঃ আনোয়ার উল্যাহ স্যারের নির্দ্দেশে বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্স এর মেডিকেল অফিসার রোগ নিয়ন্ত্রণ হিসাবে কর্মরত থাকা অবস্থায় দিনাজপুর জেলায় করোনার জন্য নিবেদিত প্রাণ ডেডিকেটেড চিকিৎসক টিমের ১ জন গর্বিত সদস্য হয়ে বীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর ইমার্জেন্সি করোনা মোকাবিলা টিমের সদস্য সচিব নির্বাচিত হয়েছি। আমার দায়িত্ব ছিলো সন্দেহজনক করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহে সংগ্রকারী টিমকে সম্মুখ থেকে নেতৃত্ব দান করা, বীরগঞ্জ উপজেলায় বাইরে থেকে বীরগঞ্জে আসা লোকজনের হোম কোয়ারেনটিন নিশ্চিত করা ও প্রতিদিন তাদের খোজখবর রাখার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।

বীরগঞ্জ উপজেলার জনসাধারনের করোনার ভয়াল থাবা হতে রক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত এমন ভাবে কাজ চালিয়ে যেতে যেতে লক্ষোই করিনী যে কোন একসময় আমি নিজে করোনা আক্রান্ত হলাম। তবুও আমার পরিবার পরিজনের কথা না ভেবে বীরগঞ্জ উপজেলা বাসীকে বিপদে ফেলে পালাইনি। যায় যাক প্রাণ, তবুও করি নাই জীবনের ভয়।

করোনায় হয়েছি ক্ষত- তবুও ভাবি আমি যে ডাক্তার নিজের খারাপ সময়টাতেও আইশোলেশনে থেকেও ভাবি আপনাদেরকে নিয়ে, তাইতো নিজে করোনা আক্রান্ত অবস্থাতেও পাশের আইশোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অপর করোনা রোগীর চিকিৎসাসহ সার্বিক দেখভাল করছি। এছাড়াও প্রতিনিয়োত ফোনে টেলিমেডিসিন সেবা দিয়ে যাচ্ছি করোনা রুগী ও আপনাদের।

কিন্তু খারাপ লাগে, যে বীরগঞ্জ বাসীকে এতো আপন ভেবে মহামারী করোনা হতে রক্ষর জন্য যে স্বাস্থ কর্মীরা যাদের পাশে থাকছে, তারাই যখন আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের পরিবারগুলোকে বাঁকা চোখে ঘৃণার দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকায়।

শুনেছি সভ্য দেশে স্বাস্থসেবীদের অনেক সম্মানের সাথে বাসায় বরণ করে, স্বাস্থ্যকর্মীদের সকল কাজে প্রতিবেশীরা সাহায্য করে, যাতে স্বাস্থ্যকর্মী হাসপাতালের কাজে মনোনিবেশ করতে পারে। আর আমার দেশে আপনাদের কাছে অতটা আশা করছি না, শুধু আশা একটাই যাতে আমার সকল স্বাস্থ্যকর্মী হাসপাতালে দিনের কাজ শেষে নিজ বাসায় নির্বঘেœ বিশ্রাম নিতে পারে, শান্তি মতো একটু খেতে পারে, আপনাদের কারনে তারা যেনো সুস্থ থাকতে পারে সেটাতো আপনাদেরই লক্ষ রাখা উচিৎ।

বীরগঞ্জ বাসী ভাই, আপনারা কি কোন গায়েরী খবর পেয়েছেন যে আপনাদের করোনা হবে না। যদি কোনদিন আপনার করোনা হয় তাহলে তো আপনাকেও চিকিৎসক সহ ঐ স্বাস্থ্যকর্মীটির কাছেই যেতে হবে, তাদের পরিচর্যা আপনার প্রয়োজন হবে, তখন কি করবেন?

শুধুমাত্র আপনাদেরকে নিরাপদ রাখবে বলে বীরগঞ্জ হাসপাতালের প্রতিটি ডাক্তার থেকে সুইপার পর্যন্ত সকলেই নিরলস ভাবে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দিনরাত করোনার মোকাবিলা করছে। অথচ আপনাদের অনেকেই নাকি আমাদের স্বাস্থ্যকর্মী ও তাদের পরিবার পরিজনের সাথে অমানবিক আচরন করছেন, যা আমাদের বোধগম্য হচ্ছে না।

আপনাদের বিবেকের কাছে আমার প্রশ্ন, যদি আপনাদের কাজ করতে করতে আমরা সমাজের জন্য কালিমা, তবে বলে দিন, আমরা ডাক্তাররা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মত চলে যাব। আমি নিজেও আপনাদের জন্যে কাজ করতে করতে করোনায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ, তারপরেও আমি ও আমরা নিজের জীবন ও সংসার, পরিবার পরিজনের কথা না ভেবে আপানাদেরকে ভয়াভহ করোনার হাত থেকে রক্ষার জন্য অবিরাম চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি, সেটা কি আমার বা আমাদের অপরাধ। আপনারা করোনার অমানবিক বিপদে পড়লে আমাদের একটু স্বরণ করিয়েন, সব ভুলে আমি ও আমরা ছুটে যাব নির্দ্বিধায় আপনাদের পাশে। কারন আমরা যে আপনাদের ডাক্তার, গর্বিত ডাক্তার। মনে রাখুন সব ভেদাভেদ ভুলে জাতির এই দুঃসময়ে সকলকে এক হয়ে কাজ করে করোনা যুদ্ধে জয়ী হতে হবে।