কাসাব্লাঙ্কা কলিং…, শুনতে কি পাও বাংলাদেশ?

প্রকাশিত: ৮:৫৩ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৭ | আপডেট: ৮:৫৫:পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩০, ২০১৭
 তখন ২০১৫ সাল। যুব প্রতিনিধি হিসেবে জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমনের সুযোগ পেয়েছিলাম উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশ মরক্কোয়। ইউরোপের সন্নিকটে এবং পৃথিবীর মধ্যভাগ হিসেবে বিবেচিত দেশটিতেই জড়ো হয়েছিল তামাম বিশ্বের নারীঅধিকার কর্মীরা। আয়তনে বাংলাদেশের ৩ গুন হলে জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে তিন কোটি আর জিডিপিতে আফ্রিকার মধ্যে পঞ্চম। প্রায় শতভাগ মুসলিম অধ্যুষিত মরক্কোর সবচেয়ে বড় শহর কাসাব্লাঙ্কায় পা রেখেই মনে হয়েছে আটলান্টিক মহাসাগরের কোল ঘেঁষা বাদশাহী শাসনের এ দেশটিতে নারীরা অনেকটাই অগ্রগামী।

লন্ডনভিত্তিক বাল্যবিবাহবিরোধী সংগঠন গার্লস নট ব্রাইডসের আমন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সম্মেলন যোগ দিতে গিয়ে নারীদের প্রকৃত ক্ষমতায়ন কিভাবে করতে হয় তা আমাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মরক্কো। ধর্ম, দেশপ্রেম আর নারীদের মর্যাদার এক অভিনব সম্মিলন খুজে পেয়েছি এই সাহারা মরুর দেশটাতে।

কাসাব্লাঙ্কার মোহাম্মদ ফাইভ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আয়োজকদের গাড়িতে করে যখন হোটেল শেরাটন কাসাব্লাঙ্কার পানে যাচ্ছিলাম আচ্‌মকা সামনে পড়ল একটি সেতুর টোল প্লাজা। কর্মরত নারী অফিসার আমাকে দেখেই মিষ্টি হাসিসহকারে সালাম ঠুকলেন। আমার ড্রাইভার টোল মিটিয়ে আমাকে ইংরেজীতে বলছিলেন ‘মুসলিম বাদশাহ্‌র শাসন হলে হবে কি, আমরা নারীদের মর্যাদা দিতে জানি। সম্মানজনক কোন কাজেই এদেশে নারী-পুরুষ বাছ বিচার করা হয়না’।

 

আ ্ ি

সেখানে আমি অনেক নারীকেই বোরখা পড়ে পুরুষদের সাথে সমানতালে গাড়ি চালাতে দেখেছি। কিন্তু বাংলাদেশে এই চিত্র কল্পনা করা বেশ কঠিন। তবে একদিন ধর্মীয় গোঁড়ামি আর কুসংস্কার জেকে বসেছিল মরক্কোর সমাজ ব্যবস্থায়। নারী নির্যাতন, বাল্যবিবাহের মতো অনাকাঙ্খিত বিষয়গুলো যেন ছিল ডাল-ভাতের ব্যাপার। সেই বিরুপ পরিস্থিতি পুরোটাই পাল্টে গেছে।

সেখানটার সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখার জন্য অভূতপূর্ব এক সুযোগ দেয়া হয়েছে নারীদের। সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় আধার ভেঙ্গে নতুন দিনের ডাক দিচ্ছেন তারা। নারী বিপ্লবের ঢেউ উঠেছে পুরো মরক্কো জুড়ে যা আছড়ে পরছে অন্যান্য মুসলিম প্রধান দেশগুলোতেও।

sadf

 

কিভাবে সেই বিরাজমান পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটিয়ে এক নারীবান্ধব সমাজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন মরোক্কানরা সেই গল্প জানতে হলে আপনাকে ফিরে যেতে হবে ২০০৩ সালে। সেই বছর কাসাব্লাঙ্কা শহরে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছিল ইসলামী জঙ্গিরা । এতে ৪৫ জন মানুষ প্রাণ হারান। দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় এরপর থেকেই মৌলবাদকে প্রতিহত করতে নড়েচড়ে বসেছিল ইংল্যান্ডের রাজতন্ত্রের আদলে গড়া সেদেশের সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার।

এর এক বছর পর মরক্কোর বাদশাহ মোহাম্মদ সিক্স ইসলামের উদারতার বাণী প্রচারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ রুখতে নতুন এক উদ্ভাবনী উদ্যোগ হাতে নিলেন। যার অংশ হিসেবে সেইবছর থেকে প্রতিবছর ৪৫ জন নির্বাচিত নারীকে ধর্মীয় নেতা হিসেবে প্রশিক্ষিত করার পর নারীদের সচেতনতা বাড়ানোর কাজে এক একটি মসজিদে নিয়োগ করলেন। এরাই হলেন ‘মরশিদাত’, নারী বিপ্লবের মূল অণুঘটক। সবার মাঝে ইসলামের ‘আলো’ ছড়ানোই যাদের কাজ।

 

কাসাব্লাঙ্কা কলিং..., শুনতে কি পাও বাংলাদেশ?

 

এ মুহূর্তে প্রায় অর্ধসহস্র মরশিদাত মরক্কোর বিভিন্ন শহরের মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, কারাগার, এমনকি বাড়ি বাড়ি গিয়েও নারীর প্রতি ইসলামের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানাচ্ছেন সবাইকে। ইসলাম এবং নারী অধিকার সম্পর্কে ভাষণ দিতে অনেক মুসলিম দেশ থেকে আমন্ত্রণও পাচ্ছেন মরশিদাতরা। আমি তাঁদের সর্ম্পকে বিস্তারিত জানতে পারি গার্লস নট ব্রাইডসের সেই কনফারেন্সে। বাল্যবিবাহবিরোধী সম্মেলনে এসে কাসাব্লাঙ্কা ঘুরে যাব আর ‘মরশিদাত’ নারী বিপ্লবীদের কথা শুনবো না তা কি হয়!

সম্মেলনে প্রদর্শিত হয়েছিল মরশিদাতদের কর্মকান্ডের উপর নির্মিত চলচ্চিত্র ‘কাসাব্লাঙ্কা কলিং’, অর্থাৎ ‘কাসাব্লাঙ্কা ডাকছে’। ব্রিটিশ পরিচালক রোসা রোগের্স এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। এক ঢিলে দুই পাখি মারার মত সম্মেলনটিতে কাসাব্লাঙ্কায় বসে চলচ্চিত্রটি উপভোগের পাশাপাশি এর পরিচালকের মুখোমুখি হওয়ারও সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা। যার ফলে চলচ্চিত্রটির খুটিনাটি বিষয়েও আমরা জানতে পেরেছিলাম।

কাসাব্লাঙ্কা কলিং..., শুনতে কি পাও বাংলাদেশ?

 

চলচ্চিত্রটির একটি অংশে দেখানো হয়, ‘মেয়েরা টাইম বোমার মতো যে কোনো সময় বিস্ফোরিত হয়ে পরিবারের সুনাম নষ্ট করতে পারে। তাই ওদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দেয়াই ভালো’- এক গহনার দোকানে এমন কথাই শুনেছিলেন ‘মরশিদাত’ হানানে। সাথে সাথে প্রতিবাদ করতেও ভুল করেননি তিনি। হানানে সেই পুরুষদের বলেছিলেন, ‘‘এসব কথা বলবেন না। ইসলাম বাল্যবিবাহ সমর্থন করেনা।

তাছাড়া মেয়েরা এখন ঘরে-বাইরে সবখানেই কাজ করে সমাজের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে’। ইসলামে স্বীকৃত নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় হানানেদের মতো অসংখ্য মর্শিদাতদের গত এক দশকের অক্লান্ত চেষ্টায় মরক্কোয় লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে সমাজ ব্যবস্থাও। নারীরা এখন আর অপমান-অত্যাচারে চুপ করে সহ্য করেন না। এখন মুখ খুলে কথা বলেন। নারী বিদ্বেষী বক্তব্য শুনলেই নারীরাই তার প্রতিবাদ করেন। নয়নাভিরাম কাসাব্লাঙ্কা আজ আমায় ডাকছে ইশারা করে।

কিন্তু আমরা সেই ডাকে সাড়া দিয়ে নারীদের জন্য একটি উপযুক্ত নগরী উপহার দিতে পারবো কি? সেটা আমাদের সমাজ এবং সরকার ভালো বলতে পারবে। তার আগে পুরুষদের মানসিকতা যেমনি পরিবর্তণ করতে হবে, তেমনি নারীদেরও হতে হবে এক একজন মুরশিদাত। মুখ খুলতে হবে, রুখে দাড়াতে হবে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। তবেই আসবে প্রত্যাশিত পরিবর্তন।

 

লেখক: গ্লোবাল ইয়ূথ অ্যাডভোকেট, গার্লস নট ব্রাইডস এবং প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ মডেল ইয়ূথ পার্লামেন্ট। লেখকের ইমেইল: kishanibd@gmail.com