আজ ঝালকাঠি মুক্ত দিবস ‘রাজাকারদের বন্ধী করেই ঝালকাঠি কারাগারের কার্যক্রম শুরু করা হয়’ -মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন

প্রকাশিত: ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৮, ২০১৯ | আপডেট: ৯:২৮:পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ৮, ২০১৯

ঝালকাঠি কারাগারটি ১৯৭০ সালে নির্মাণ করা হয়। কারা কর্তৃপরে কাছে হস্তান্তরের আগেই স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়। ৮ ডিসেম্বর ঝালকাঠি হানাদার মুক্ত হলে রাজাকার ধরে আটকে রাখার মাধ্যমেই এই কারাগারের কার্যক্রম শুরু করা হয়। ঝালকাঠির প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য, সদর উপজেলার বাসন্ডা ইউনিয়নের স্বাধীনতা পরবর্তিকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোঃ মকবুল হোসেন এ কথা বলেন। তার সাথে কথা বললে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান,‘একটি সামরিক বাহিনীর সদস্য হিসেবে তখন ঢাকায় ছিলাম। ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে বাসন্ডা ইউনিয়নের চামটায় গ্রামের বাড়িতে আসি। এপ্রিল মাসে মুক্তিযুদ্ধের খবর শুনে পার্শ¦বর্তি লেশপ্রতাপ গ্রামের সুবেদার হাবিবুর রহমান মালেক’র সাথে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে মুক্তিযুদ্ধে নেয়ার কথা বলেন। ২৬ বছর বয়সে তখন আমি বিবাহিত এবং ১ কন্যা সন্তানেরও জনক হওয়ায় স্ত্রীকে বললাম শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে যাবো। তিনি আমার কথায় রাজি হলে বাচ্চা ও স্ত্রীকে শ্বশুর বাড়ি রেখে যুদ্ধে যাবার সময় ৭মাস বয়সী কন্যা লিলুকে ৩বার দেখে চুমু খেয়ে বিদায় নেয়ার সময় মনে হলো শ্বশুর-শ্বাশুরী কিছু একটা ধারণা করতে পেরেছে। তাই আর সময় না দিয়েই রওনা করি। মালেক সুবেদারের সাথে প্রথমে স্বরূপকাঠির আতা এলাকায় এবং পরে শিকারপুরের ভরাকোঠা এলাকায় গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেই। পরে নজরুল সুবেদারের নেতৃত্বে আমাদের কয়েকজনকে বরগুনার তালতলী ফাতরার বনে পাঠানো হয়। সেখানের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প প্রধান ক্যাপ্টেন মেহেদীর নেতৃত্বে ২মাস গেরিলা যুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে অংশ নেই। কয়েকজন রাজাকারকে সারি বেধে গুলি দেয়ার সময় আমাদের এলাকার এক সওদাগর (গুড় ব্যবসায়ী)কে নৌকায় করে যেতে দেখি। ১ মাস ১৭দিনে পরিবারের কারো সাথে কোন যোগাযোগ না থাকায় তাকে ডেকে কথা বলতে চাইলে তিনি কাঁপতে থাকেন। তাকে নির্ভয় দিয়ে কথা বলে পরিচয় দিলে তিনি স্থির হন। তার মাধ্যমে এলাকার খোঁজ খবর নেই। তার কাছে মেয়েটার জন্য ২টি জামা ও কিছু চকলেট কিনে পাঠাই। ক্যাপ্টেন মেহেদীর নেতৃত্বে ১২ নভেম্বর ৭টি নৌকায় করে ঝালকাঠি সদর উপজেলার চাচৈরে আসার সময় নদী পারাপারকালে পাকহানাদাররা ব্রাশ ফায়ার করে। আমি সহ ৩টি নৌকার মুক্তিযোদ্ধারা উপরে উঠলেও নদীতে থাকা ৪টি নৌকার মুক্তিযোদ্ধারা সেখানেই শহীদ হন। আমরা পিছনে না তাকিয়ে ১২ নভেম্বর রাতে চাচৈরে পৌছে ১৩ নভেম্বর সকালে পাকহানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেই। হানাদাররা আমাদের রণকৌশলের কাছে হার মেনে পরাজিত হয়। এরপর সাব সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমরের ডাকে ২৩ নভেম্বর রাজাপুরে হানাদারদের সাথে যুদ্ধ করে রাজাপুরকে হানাদার মুক্ত করি। বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাজিত হয়ে নৌ-পথে ব্রাশ ফায়ার করতে করতে পিছু হটতে থাকে। আমরাও পিছনে পিছনে ধাওয়া করতে থাকি। হানাদাররা আগুন জ্বালিয়ে দেয় ঝালকাঠি শহরে। আমরা তখন রাজাপুর অংশে থাকা অবস্থায় আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পাই। ৮ডিসেম্বর সকালে পাকবাহিনী ঝালকাঠি থেকে পালিয়ে যাবার সময় কয়েকজন রাজাকারকে লঞ্চঘাটে নামিয়ে দিয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঝালকাঠি লঞ্চঘাটে আমরাও নেমে রাজাকারদের হাতেনাতে আটক করি। এরমধ্যে বড় বড় গোফের টিক্কা খান নামের রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধারা ও স্থানীয় জনতা টেনে গোফ ছিড়ে ফেলে এবং চোখ উঠিয়ে দেয়। আটক করা রাজাকারদের ঝালকাঠি নবনির্মিত কারাগারে আটকে রাখা হয়।’ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণের মূল বিষয়বস্তু হিসেবে তিনি বলেন, আমার দেশে আমার ঘরে থেকে আমার নিজের খেয়ে অন্যের কাছে কেন মাথানত করে থাকবো ? এ প্রশ্নের দাঁতভাঙা জবাব দেয়াই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মূল কারণ। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বর্তমানে বেশ ভালো এবং সুখেই আছেন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, মহান স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’র ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে ৪বার স্বাাত করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা মোঃ মকবুল হোসেন সদর উপজেলার বাসন্ডা ইউনিয়ন পরিষদের ২ বার সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়াও তার সাথে আলাপচারিতায় বহু প্রতিভার গল্প শোনান তিনি।
ঝালকাঠি কারা সূত্রে জানাগেছে, ১৯৬৮ সালে ঝালকাঠি উপ কারাগার নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৯৭০ সালে তা শেষ হয়। ১৯৮৯ সালের ১১ জুলাই তা জেলা কারাগারে রূপান্তরিত হয়।