কুমারী পূজায় নারীর বন্দনা

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৩:১৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০১৯ | আপডেট: ৩:১৪:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৬, ২০১৯

রামায়ণ যুগের অবতার শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কা অধিপতি রাবণ বধের পর নবমী তিথীতে দুর্গার পূজা করেছিলেন ১০৮টি নীলপদ্মে। দুর্গোৎসবের মহানবমীতে ষোড়শ উপাচারের সঙ্গে ১০৮টি নীলপদ্মে পূজিত হবেন দেবী দুর্গা। এদিকে শঙ্খের ধ্বনি, কাঁসর ঘণ্টা, ঢাকের বাদ্য আর উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে মাতৃরূপিণী কুমারী পূজার মধ্য দিয়ে রবিবার দুপুরে পালিত হয়েছে দুর্গাপূজার মহা অষ্টমী।

 

নীল অপরাজিতা ফুল ও যজ্ঞের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে নবমী বিহিত পূজা। নবমী পূজায় যজ্ঞের মাধ্যমে দেবী দুর্গার কাছে আহুতি দেয়া হয়। ১০৮টি বেল পাতা, আম কাঠ, ঘি দিয়ে এই যজ্ঞ করা হয়। ধর্মের গ্লানি আর অধর্ম রোধ, সাধুদের রক্ষা, অসুরের বধ আর ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিবছর দুগর্তিনাশিনী দেবী দুর্গা ভক্তদের মাঝে আবির্ভূত হন। শুভ বিজয়ার মাধ্যমে জাগতিক প্রাণীকে শোনান সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী। সনাতন ধর্মমতে, নবমী পূজার মাধ্যমে মানবকূলে সম্পদ লাভ হয়।

সাভারে দুপুর ১২টার বিহিতপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শারদীয় দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমী। সারা দিন পূজামণ্ডপগুলোতে ছিল উপচেপড়া ভিড়। প্রতিটি মন্দিরেই কয়েক দফা করে পুষ্পাঞ্জলি দেয়া হয়। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা মহা অষ্টমীতে নবরূপে ধরায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন। স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে অধিষ্ঠিত দেবীকে নানা উপাচারে আরাধনা করে সব অনাচার আর সংকট মোচন এবং বিশ্ববাসীর শান্তি প্রার্থনা করেন ভক্তরা। দুপুর ১২টা ১ মিনিটের মহাঅষ্টমীর বিহিত পূজা শুরু হয়। ভোর রাত ৫টা ৩৯ মিনিট থেকে সকাল ৬টা ২৭ মিনিটের মধ্যে মহাঅষ্টমী ও মহানবমীর তিথির সংযোগ সময়ে সন্ধিপূজার মধ্য দিয়ে শেষ হয় ‘মহা অষ্টমী’।

 

জয় শ্রী শ্রী কুমারী মাতা কি জয়! জয় শ্রী শ্রী দুর্গা মা কি জয়! এমনই জয়ধ্বনি আর বিনম্র শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে পালিত হলো মহা অষ্টমীর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কুমারী পূজা। পূজায় কুমারী রূপী দেবী দুর্গার জীবন্ত প্রতিমার কাছে অশুভ শক্তির বিনাশ আর শুভ শক্তির সূচনা কামনা করেছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।

 

এবারের কুমারীর নাম দেবলিনা চক্রবতী। বিউটি রানী চক্রবর্তী মেয়ে দেবলিনা সাভার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩য় শ্রেণির ছাত্রী। ঘড়ির সময় ঠিক ১২টায় ‘দুর্গা মা-ই কি, জয়’ ধ্বনিতে পূজা শুরু করেন পূজার পূজা পরিচালনা করেন প্রধান পরিচালক।
তার সঙ্গে ‘তন্ত্রধারক’ ছিলেন স্বামী স্থিরানন্দ। এর আগে সকালে দেবলিনাকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয় এবং ফুলের মালা, নানা অলঙ্কার ও প্রসাধনে নিপুণ সাজে সাজিয়ে তোলা হয়। কুমারী পূজায় দেবীর মঞ্চে অধিষ্ঠানের আগে মন্ত্রোচ্চারণ ও ফুল-বেলপাতার আশীর্বাদ পৌঁছে দেয়া হয় সবার কাছে।

 

কুমারী পূজার ১৬টি উপকরণ দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় এবং অগ্নি, জল, বস্ত্র, পুষ্প ও বাতাস এই ৫টি উপকরণ দিয়ে কুমারীকে পূজা করা হয়। মা কুমারীকে সিংহাসনে বসানোর আগে তার আগমন বার্তা নিয়ে ভক্তিমূলক গান পরিবেশন করা হয়। তখন পুরো এলাকার পুণ্যার্থীরা অধীর আগ্রহে তার অপেক্ষায় সময় গুনছিলেন। তাকে সিংহাসনে বসানোর সময় পুণ্যার্থীরা সমস্বরে ‘জয় দেবী কুমারী’- বলে স্লোগান দেন।

 

শঙ্খের ধ্বনি, কাঁসর ঘণ্টা, ঢাকের বাদ্য আর উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে মাতৃরূপিণী কুমারী মাকে পরিয়ে দেয়া হয় পুষ্পমাল্য। মাল্য দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন মায়ের শরীরে রাখা বিভিন্ন অলঙ্কার আরো অলঙ্কিত হয়ে ওঠে ভক্তকুলের আনন্দ-উল্লাসে। আধাঘণ্টা ধরে চলা পূজা। শেষে পুষ্পাঞ্জলি ও প্রার্থনায় অংশ নেন পুণ্যার্থীরা।

আরো পড়ুন: জন্মদিন উদযাপন আমার পছন্দ নয় : মাশরাফি

দেবলিনার মা বিউটি রানী চক্রবর্তী বলেন, আমার মেয়ে দেবীরূপে আবির্ভূত হয়েছে। বড় হয়ে আমার মেয়ে দেবীর মতোই অসুরবিনাশী কাজ করে পৃথিবীর মঙ্গল করবে। ‘নারীতে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন’ এই দার্শনিক তত্ত্বে মহা অষ্টমী তিথিতে কুমারী পূজা পালিত হয়। নারীত্বের বন্দনায় আবারও ধ্বনিত হল, ‘নারী ভোগ্যা নয়, পূজ্যা’।

 

তন্ত্রসার মতে, ১ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত বালিকারা কুমারী পূজার উপযুক্ত; তাদের অবশ্যই ঋতুমতি হওয়া চলবে না। ১৯০১ সালে ভারতীয় দার্শনিক ও ধর্মপ্রচারক স্বামী বিবেকানন্দ প্রথম কলকাতার বেলুর মঠে কুমারী পূজার মাধ্যমে এর পুনঃপ্রচলন করেন। তখন থেকে প্রতিবছর দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠে এ পূজা চলে আসছে।