সাপের বিষ যেন ‘তরল ডায়মন্ড’

জি এম নিউজ জি এম নিউজ

বাংলার প্রতিচ্ছবি

প্রকাশিত: ৬:১০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০১৯ | আপডেট: ৬:১০:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৪, ২০১৯

উচ্চ মূল্যের কারণে সাপের বিষকে তরল ডায়মন্ড বলা হয়। কারণ এক গ্রাম সোনার বর্তমান বাজারদর চার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা সেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের দেশীয় সাপ থেকে প্রক্রিয়াজাত করা এক গ্রাম ভাইপার রাসেলের বিষের মূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা। এছাড়া কালাচ বা কালচিতি সাপের বিষের মূল্য তিন থেকে চার লাখ টাকা, খয়া গোখরার ৫০ হাজার টাকা, বিভিন্ন সামুদ্রিক সাপের বিষের মূল্য প্রায় চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা।

বাংলাদেশে ১৬টির অধিক প্রজাতির বিষধর সাপ আছে, যাদের বিষ অ’ত্যন্ত মূল্যবান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সাপের বিষ কেন এত দামি? এর প্রধান দুটি কারণ হচ্ছে- মানুষের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করতে সাপের বিষ ব্যবহার হয়। সাপেকা’টা রোগীদের জন্য সাপের বিষ দিয়েই যেমন এন্টিভেনম তৈরি হয় তেমনি ক্যান্সার, হার্টের রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের জন্য সাপের বিষ ব্যবহার করে তৈরি হয় অনেক দামি ওষুধ।

বিশ্ব প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ মানুষ সাপের কামড়ে অ’সুস্থ হয়। এর মধ্যে প্রায় দেড় লাখ মা’রা যান। সাপেকা’টা রোগীদের জন্য ব্যবহৃত ভ্যাকসিন এন্টিভেনম খুবই দামি। একটি এন্টিভেনমের মূল্য প্রায় ১৫০০ ডলার। যদিও প্রতিটি দেশের সরকার ভর্তুকি দিয়ে তা সাধারণের কাছে সরবরাহ করে।

snake

কিং কোবরা

বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশ এ ভ্যাকসিন তৈরি করে না। বাইরে থেকে আম’দানি করতে হয়। এছাড়া সাপের বিষ দিয়ে তৈরি ওষুধও চড়া দামে আমাদের আম’দানি করতে হয়।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে- বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মা’দকাসক্তদের কাছে দিনদিন সাপের বিষের চাহিদা বাড়ছে। মূলত যাদের আসক্তি একেবারে চরমে, সাধারণ মা’দকে যাদের নে’শা হয় না তারা কড়া নে’শার জন্য সাপের বিষ ব্যবহার করেন। এছাড়া উন্নত মা’দকে ব্যবহৃত হচ্ছে সাপের বিষ।

অনেক দেশের মানুষ সাপের বিষের ফোঁটা জিভের ডগায় দিয়ে নে’শা করেন। চীনে এমন কিছু অঞ্চল আছে যেখানকার মানুষ চিরযৌবন লাভের আশায় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের সাপের বিষ নিয়মিত গ্রহণ করেন। তারা সাপের বিষের নিয়মিত গ্রাহকও।

snake-3

সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করা হচ্ছে

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাপের বিষের ব্যবসা অ’ত্যন্ত লাভজনক। দেশে বৈধ উপায়ে সাপের খামা’র তৈরির অনুমতি না থাকায় বৈধ উপায়ে সাপের বিষ রফতানিরও সুযোগ নেই। এ কারণে অ’বৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকার সাপের বিষ পাচার হচ্ছে দেশের বাইরে। বাংলাদেশসহ এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বিষধর সাপ হচ্ছে কিং কোবরা। এর বিষ রসায়ন গবেষণাগারে একটি মূল্যবান উপাদান। কোবরার বিষ অনেক রোগের প্রতিষেধক তৈরিতে গবেষণাগারে বিক্রিয়ার প্রভাবক ও অনুঘট’ক হিসেবে কাজ করে।

কোবরার বিষ নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় ব্যবহৃত প্রভাবক ও অনুঘট’ক তৈরিতে কাজ করে। এ কারণে উন্নত বিশ্বের যেসব দেশ নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার মাধ্যমে রাসায়নিক উপাদান তৈরি করে সেসব দেশে কোবরার বিষ মহামূল্যবান। এছাড়া কোবরার বিষ বায়োকেমিক্যাল (বায়ু জীবাণুযুক্ত অ’স্ত্র) অ’স্ত্র তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে। এ কারণে উন্নত বিশ্বে এ বিষের ব্যাপক চাহিদা।

সাপের বিষসহ চামড়া ও মাংসের আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য প্রায় পাঁচ হাজার মিলিয়ন মা’র্কিন ডলার। হাজার মিলিয়ন ডলারের এই বাজারে বৈধভাবে প্রবেশ করতে পারছে না বাংলাদেশ। কারণ বাংলাদেশে বৈধভাবে সাপের খামা’রের কোনো অনুমতি দেয়া হয় না। এ কারণে বিষ, মাংস বা চামড়া বিশ্ববাজারে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন সম্ভব হচ্ছে না।

snake

উ’দ্ধার করা সাপের বিষ

বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে সাপের খামা’র দিয়ে সফল হয়েছে। কিন্তু তাদের চেয়ে আমাদের উন্নত পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও সাপের খামা’রের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশে উৎপাদিত সাপের বিষ, চামড়া ও মাংসের মান বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক উন্নত। এ বিষয়ে সরকার সুদৃষ্টি দিলে হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

তবে বর্তমানে শিক্ষিত অনেক যুবক নিজ উদ্যোগে খামার করছেন। তারা বলছেন, আমাদের দেশের কোবরা (গোখরা) অত্যন্ত বিষধর। এ সাপের বিষ খামারের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করলে বছরে কোটি টাকার রাজস্ব অর্জন করতে পারে সরকার। এটির জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক ট্রেনিং সেন্টার, গবেষণা সেল, প্রশাসনিক সেল ও ইকোলজিক্যাল সেল গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষিত যুবকদের খামার তৈরির অনুমতি দিতে হবে।

তবে সরকার অনুমতি না দিলেও থেমে নেই সাপ ও সাপের বিষের পাচার। এর পুরোটাই হচ্ছে অবৈধ পথে। ফলে বৈধভাবে সম্ভাবনাময় এ শিল্পের খামার যেমন গড়ে উঠছে না তেমনি সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। প্রতিনিয়ত শত কোটি টাকার সাপের বিষ পাচার হচ্ছে দেশের বাইরে৷

বিগত বছরগুলোতে কয়েকশ কোটি টাকার সাপের বিষ চোরাকারবারিদের হাত থেকে উদ্ধার করেছে র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একটি চক্র পাচারের রুট হিসেবে বাংলাদেশকেও ব্যবহার করছে। গত ১০ বছরে সাপের প্রায় পাঁচশ কোটি টাকার বিষসহ বেশ কয়েকজন চোরাকারবারিকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

snake-5

উ’দ্ধার করা সাপের বিষ

গত বছর (২০১৭ সালে) রাজধানী থেকে ১২ পাউন্ড সাপের বিষ জ’ব্দ করে পু’লিশ। যার আনুমানিক মূল ছিল ৬৮ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৬ সালের ২ আগস্ট বিজিবি চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রায় ১২ কোটি টাকা মূল্যের সাপের বিষসহ মোহাম্ম’দ সোহেল নামে (৪০) এক ব্যক্তিকে আ’ট’ক করে। ওই বছর ৭ মা’র্চ র‌্যা*­ব-১০ রাজধানীর লালবাগে অ’ভিযান চালিয়ে ১২ পাউন্ড সাপের বিষ উ’দ্ধার করে। এর বাজারমূল্য আনুমানিক ৫০ কোটি টাকা। র‌্যা*­ব-৯ ২০১৫ সালের ২৪ জুলাই সিলেটের কানাইঘাট উপজে’লার রাউত গ্রাম থেকে ১২ পাউন্ড গোখরার বিষ উ’দ্ধার করে, যার মূল্য ছিল আনুমানিক ৪৬ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জয়পুরহাটের একটি আবাসিক হোটেল থেকে ১২ পাউন্ড কোবরার বিষ উ’দ্ধার করে র‌্যা*­ব-৫, যার মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা।

২০১৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর উত্তরা থেকে ছয় বোতল সাপের বিষ উ’দ্ধার করে পু’লিশ, যার মূল্য প্রায় ১২ কোটি টাকা। ২০১০ সালে মতিঝিল থেকে র‌্যা*­ব দুই আউন্স সাপের বিষ উ’দ্ধার করে। ২০০৯ সালের আগস্টে কারওয়ান বাজারের একটি আবাসিক হোটেল থেকে ১২ আউন্স সাপের বিষ উ’দ্ধার করে র‌্যা*­ব। ২০০৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পাবনার ফরিদপুর উপজে’লা থেকে ১২ পাউন্ড সাপের বিষ উ’দ্ধার করে র‌্যা*­ব-১২।

২০১৬ সালে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা মূল্যের সাপের বিষ উ’দ্ধার করা হয় পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি থেকে। জলপাইগুড়ি বনবিভাগ তখন সংবাদমাধ্যমকে জানায়, আমাদের কাছে খবর ছিল যে, বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করছে সাপের বিষ। এমন খবরের ভিত্তিতে নজরদারি করে বিষের বড় এ চালান জ’ব্দ করা হয়।

snake-6

সাপের বিষসহ আ’ট’ক এক চো’রাকারবারি

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানান, শুধু সাপের বিষ নয়, এর মাংস ও চামড়া পাচার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সাপ পাচারের সঙ্গে জ’ড়িত বেশির ভাগই বেদে সম্প্রদায়। দেশে প্রতিনিয়ত সাপ ধরছে বেদেরা কিন্তু এ সাপ যাচ্ছে কোথায়? অ’ভিযোগ আছে, সাপুড়েদের কাছে কিছু সাপ বিক্রির পর উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের বাইরে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপের অ’বৈধ বাণিজ্য বন্ধে শিগগিরই সরকারিভাবে এর উৎপাদন ও রফতানির অনুমোদন দিতে হবে। তাহলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে সাপের বিষ রফতানি করে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। এতে বন্ধ হবে অ’বৈধ পাচার বাণিজ্য।

সাপের বিষ নিয়ে বহুদিন ধরে গবেষণা করছেন রাবির জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. আবু রেজা। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘খামা’রের অনুমতি দিলে সাপের চো’রাচালান যেমন বন্ধ হবে তেমনি রক্ষা পাবে পরিবেশ। যেহেতু এখানে বড় অংকের একটা লেনদেন আছে তাই চো’রাকারবারিদের নজর এদিকে থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। তবে বৈধ পথ খুলে গেলে তা থেমে যাবে।’

দেশে বিভিন্ন সময় কোটি কোটি টাকার সাপের বিষের চালান ধরেছে র‌্যা*­ব। র‌্যা*­ব- ৯ এর অ’তিরিক্ত পু’লিশ সুপার মনিরুজ্জামান এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, বিষসহ সাপ পাচার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। আমাদের জীববৈচিত্র্য রক্ষার ব্যাপারে র‌্যা*­ব সবসময় সজাগ আছে এবং সর্বোচ্চ নজরদারিও রাখছে। বিভিন্ন সময় সাপের বিষসহ বন্যপ্রা’ণী চো’রাকারবারিদের ধরছে র‌্যা*­ব।

snake-6

র‌্যা*­বের হাতে জ’ব্দ হওয়া সাপের বিষ

পাচার বন্ধে সাপের খামা’রের অনুমতি দেয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খামা’রের অনুমতি দেয়া উচিত কিনা- তা সরকার বিবেচনা করবে। তবে অনুমতি থাকলে অ’বৈধ পথে চো’রাচালান কমে যাবে।’

সাপের খামা’রের অনুমোদন এবং চো’রাচালান প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বন্যপ্রা’ণী অ’প’রাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিটের পরিচালক মিহির কুমা’র দো জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকারী নীতিমালায় বৈধ রফতানির সুযোগ থাকলে অবশ্যই চো’রাচালানিদের দৌরাত্ম্য কমবে।’

‘শুধু সাপ বা সাপের বিষ নয় যেকোনো বন্যপ্রা’ণীর অ’বৈধ পাচারের বিপক্ষে কাজ করছে বন্যপ্রা’ণী অ’প’রাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট। ইতোমধ্যে বনবিভাগ সাপের খামা’রের ব্যাপারে কাজ শুরু করছে। এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনা চলছে’- বলেন মিহির কুমা’র দো।